গণঅধিকারে নিষ্ক্রিয় রেজা কিবরিয়া, সক্রিয় ‘তৃতীয় পক্ষ’

গণঅধিকার পরিষদের সাংগঠনিক পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে। দলটির দুটি পক্ষ সমঝোতা আসার বৈঠকে বসেছে বলে জানা গেছে। তবে ফেসবুকে নুরুল হক নুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার পর থেকে নিষ্ক্রিয় রেজা কিবরিয়া।

সদস্যসচিব নুরুল হক নুর সঙ্গে রেজা কিবরিয়ার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ওঠার পর গণঅধিকারে বিভক্তি দেখা দেয়। এরপর দেশের বাইরে চলে যান রেজা কিবরিয়া। এ সময় দলটিতে ‌‘তৃতীয় পক্ষ’ হিসেবে নিজেদের অবস্থান জানান দেন কয়েকজন নেতা। রেজা কিবরিয়ার অনুপস্থিতিতে বুধবার তাদের সঙ্গে নুরুল হক নুরের সমঝোতার উদ্যোগ নেয়া হয়।

এ ছাড়া গত কয়েকদিনে নুর নিজের পক্ষের নেতাকর্মীদের এক জোট করতে সমর্থ্য হয়েছেন। তৃতীয় পক্ষেও এর আগে ৪৫ নেতা নিজেদের অবস্থান জানান দেন। এর ফলে গণঅধিকারে সামগ্রিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন রেজা কিবরিয়া।

দলটির সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সোমবার ফেসবুকে রেজা কিবরিয়া ও নুরুল হক নুর পরস্পরকে অভিযুক্ত করে পোস্ট দেন। এরপর থেকে গণঅধিকার পরিষদে বিভক্তি দেখা দেয়। রেজা কিবরিয়া অর্থপাচার, ইসরায়েলি এজেন্টের সঙ্গে বৈঠক, সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগ তোলেন নুরের বিরুদ্ধে। অপরদিকে নুর অভিযোগ তোলেন, রেজা কিবরিয়া দলকে না জানিয়ে ইনসাফ কমিটির কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। ইনসাফ কমিটি বিএনপি ভাঙার তৎপরতায় যুক্ত বলে নুর দাবি করেন। এ ছাড়া রেজা কিবরিয়া দলের কর্মসূচিতে অনিয়মিত এবং নেতাকর্মীদের চেনেন না বলেও অভিযোগ নুরের।

পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পর নুরুল হক নুর মঙ্গলবার রাতে এক বৈঠকে রাশেদ খাঁনকে দলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক করেন। পরদিন মঙ্গলবার গণঅধিকার পরিষদ থেকে নুরুল হক নুর ও রাশেদ খাঁনকে অব্যাহতি দিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠান রেজা কিবরিয়া।

বিদেশে অবস্থান করে পাঠানো এ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে রেজা কিবরিয়া হাসান আল মামুনকে ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব মনোনিত করেন।

ওইদিন রাতেই আবির্ভাব ঘটে তৃতীয় পক্ষের। তারা নুর-রাশেদ এবং কিবরিয়া-মামুন পক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তারা রেজা কিবরিয়া ও নুরুল হক নুরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করে। রাশেদ খাঁনকে ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক এবং হাসান আল মামুনকে ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব করাকে অসাংগঠনিক বলে অভিযুক্ত করে তারা।

বুধবার বাংলাদেশ ছাত্র, যুব, শ্রমিক ও পেশাজীবী অধিকার পরিষদের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক যৌথ বিবৃতিতে রাশেদ খাঁন ও নুরুল হক নুরের নেতৃত্বে রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেন। এর ফলে গণঅধিকারে নুরের ভিত্তি প্রমাণিত হয়েছে বলে দলটির কয়েকজন নেতা জানান।

গণঅধিকারের কয়েকজন নেতা মনে করেন, নুরুল হক নুরের এ তৎপরতা রেজা কিবরিয়ার যে কোনো প্রভাব নেই দলে তা প্রমাণ করে। তা ছাড়া দলের সদস্য সচিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেই তিনি বিদেশ চলে গেলেন। তার স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে হাসান আল মামুনকে সদস্য সচিব করা হলো, অথচ এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য নেই। তার অনুপস্থিতিতে দল গুছিয়ে নিতে নুরের কোনো সমস্যা হয়নি।

তারা বলেন, যেকোনো রাজনৈতিক দলের ভিত্তি হচ্ছে এর অঙ্গসংগঠন। গণঅধিকার পরিষদের যার সবগুলোই নুরের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। যার কারণে অন্যরা চাপে পড়ে গেছে।

তবে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে পরিচিত অপর অংশের নেতাদের দাবি তাদের উদ্যোগে বড় ধরনের ভাঙন থেকে রক্ষা পেয়েছে গণঅধিকার পরিষদ।

তাদের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গণঅধিকার পরিষদকে বিপর্যয় থেকে রক্ষায় শুরু থেকে আমরা সক্রিয় ছিলাম। যে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে গণঅধিকার পরিষদ গড়ে ওঠে, তার আহ্বায়ক ছিলেন হাসান আল মামুন। তিনিসহ তৃতীয় পক্ষ উদ্যোগী হলে নুরুল হক নুর, রাশেদ খাঁনসহ অন্যদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।

তৃতীয় পক্ষের ওই নেতা বলেন, বুধবার সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে রেজা কিবরিয়াকে নিয়ে কাজ করার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন নুরসহ অন্যরা।

এ বিষয়ে হাসান আল মামুন দেশ রূপান্তর অনলাইনকে বলেন, আমরা বুধবার বৈঠক করেছিলাম। আমাদের দলে কোনো বিভেদ নেই। আহ্বায়ক রেজা কিবরিয়া এবং সদস্যসচিব নুরুল হক নুর পরস্পরের বিরুদ্ধে যা বলেছেন তা রাগের বশবর্তী হয়ে। তবে তারা জনসম্মুখে এসব অভিযোগ উত্থাপন করায় দলে সাময়িক কিছু সংকট দেখা দিয়েছে। এ সংকট যেন আর না বাড়ে সে জন্য আমরা উদ্যোগী হয়েছি। সর্বশেষ বৈঠকে সব পক্ষ এক হয়ে কীভাবে একটা সমাধানে পৌঁছানো যায় সে বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি।

ইনসাফ কায়েম কমিটির কর্মসূচিতে রেজা কিবরিয়ার অংশ নেয়া প্রসঙ্গে মামুন বলেন, এ বিষয়ে আমরা নিয়ম অনুযায়ী রেজা কিবরিয়াকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেব। সেই নোটিশের পর তিনি কী জবাব দেন তার প্রেক্ষিতে আমরা দলীয় ফোরামে সিদ্ধান্ত নেব।

ইসরায়েলি এজেন্টের সঙ্গে নুরুল হক নুরের বৈঠক নিয়ে অভিযোগ সে বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এগুলো সব আমরা খতিয়ে দেখব দলীয়ভাবে। আমরা চাইনা জনপরিসরে আমাদের এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা আরো বিস্তৃত হোক এবং বিভ্রান্তি ছড়াক।

মামুন বলেন, আমরা এ দলে যেন কোনো বিভেদ তৈরি না হয় সে লক্ষ্যে কাজ করছি। এখানে আমার কোনো ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া বা মূল্যায়ন নেই। যা হবে দলগতভাবেই হবে। দলটাকে বাঁচাতে আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।

গণঅধিকার পরিষদের কয়েকজন নেতা জানান, হাসান আল মামুন কোটা সংস্কার আন্দোলনের আহ্বায়ক ছিলেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও তিনি ছাত্রত্ব শেষ হয়ে যাওয়ায় অংশ নিতে পারেননি। এরপর এক বছরের বেশি সময় তিনি জেল খেটেছেন। তবে দলে তার বলার মতো কোনো পদ নেই।

তারা বলছেন, সামনের কাউন্সিলে হয়তো সভাপতি পদে নুরুল হক নুরের সঙ্গে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

জানতে চাইলে নুরুল হক নুর বলেন, হাসান আল মামুনদের সঙ্গে আমাদের একটা বৈঠকে হয়েছে। তার বলেছে, নির্বাচনের আগে দলের ভেতর বিভেদ যেন বড় না হয়। সে জায়গা থেকে আমরা বলেছি হয়েছে রেজা কিবরিয়া যদি ইনসাফ কমিটির সঙ্গে আর কোনো ধরনের সম্পর্ক না রাখেন তাহলে তার সঙ্গে কাজ করে যেতে আমরা রাজি আছি। এ জন্য তাকে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, রেজা কিবরিয়াকে আমরা একেবারেই সবকিছু থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছি তা নয়। সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই দল তার বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে। তবে অভিযোগ তুলে তিনি বিদেশ চলে গেছেন। দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার যোগাযোগ আগেও ছিল না, এখনো নেই। এ প্রেক্ষিতে বলতে হয়, দলের সঙ্গে তার সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ আর নেই।

হাসান আল মামুনদের সঙ্গে কোনো বিরোধ আছে কি না জানতে চাইলে নুর বলেন, নির্বাচনের আগে আমাদের দেশে সবসময় বিভিন্ন দলে গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা দেখা যায়। আমাদের সঙ্গেও এবার তাই হচ্ছে বলে মনে করি। এ ছাড়া আমাদের নিজেদের ভেতর বড় ধরনের কোনো বিভেদ নেই।

ইসরায়েলি এজেন্টের সঙ্গে বৈঠকের অভিযোগ খতিয়ে দেখবেন মামুন-এ বিষয়ে জানতে চাইলে নুরুল হক নুর বলেন, সুশিল বুদ্ধিজীবীদের মতো করে বলা যায় যেকোনো অভিযোগ খতিয়ে দেখব। আমাকে জড়িয়ে অনলাইনে ছাত্রলীগ, যুবলীগের সাইবার সেল বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কুৎসা রটায়। সেসব কুৎসা খতিয়ে দেখতে চাওয়ার অর্থ হলো প্রাথমকিভাবে তাকে সত্য বলে ধরে নেয়া হচ্ছে। দলের ভেতর এ অভিযোগ নিয়ে আমার ওপর কোনো চাপ নেই। দলের বেশিরভাগ সদস্য যদি মনে করেন এটি খতিয়ে দেখা দরকার, তাহলে আমি মেনে নেব।

রেজা কিবরিয়া বর্তমানে পায়ের চিকিৎসার জন্য কম্বোডিয়ায় অবস্থান করছেন বলে এর আগে দেশ রূপান্তরকে জানিয়ে ছিলেন হাসান আল মামুন। ফলে এ বিষয়ে তার মন্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

রেজা কিবরিয়াপন্থী বলে পরিচিত গণঅধিকারেরর কেন্দ্রীয় সদস্য শাহরুখ খানকে হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ দিলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।