বাংলাদেশের ফুটবল আকাশে ২০০৩ সালের ২০ জানুয়ারি সন্ধ্যাটা জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। ঢাকা স্টেডিয়ামে হাজারও দর্শককে উদ্দাম আনন্দে ভাসিয়ে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছিল স্বাগতিক বাংলাদেশ। মালদ্বীপকে টাইব্রেকারে ৫-৩ গোলে হারিয়ে ইতিহাসে নাম লিখায় স্বাগতিকরা। এরপর কেটে গেছে পাক্কা কুড়ি বছর।
সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আর ফিরে আসেনি। সাফ শিরোপা অধরা থেকে গেছে পরের আট আসরে। এর মধ্যে শেষ পাঁচ আসরে তো প্রথমপর্বের বাধা টপকানো যায়নি। সাফ শিরোপা মরীচিকার মতো মিলিয়ে যাওয়ার মতো মালদ্বীপও সাফে বাংলাদেশের জন্য হয়ে ওঠে অজেয় প্রতিপক্ষ।
ফাইনালের সেই স্মরণীয় জয়ের পর মালদ্বীপের সঙ্গে দেখা হয়েছে তিন ম্যাচে। ২০১১, ২০১৫ ও ২০২১ সালে তিন সাক্ষাতেই মালদ্বীপ হেসেখেলে হারিয়েছে বাংলাদেশকে। যে হারগুলো বাংলাদেশের গ্রুপপর্ব ও প্রথমপর্ব থেকে বিদায় ত্বরান্বিত করেছিল।
আজ আবারও সেমিফাইনালের সমীকরণ মেলাতে বড় বাধার নাম মালদ্বীপ। ভারতের বেঙ্গালুরুর শ্রী কান্তিরাভা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় ৪টায় শুরু হওয়া এই ম্যাচে বাংলাদেশের সামনে জয়ের কোনো বিকল্প নেই।
২২ জুন প্রথম ম্যাচে শক্তিশালী লেবাননকে বাগে পেয়েও রুখতে পারেনি বাংলাদেশ। শেষ ১৫ মিনিটে রক্ষণের ভুলে ২-০ গোলে হারতে হয়। সে রাতেই ভুটানকে একই ব্যবধানে হারিয়ে সুবিধেজনক স্থানে আছে মালদ্বীপ।
সামর্থ্য, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান থেকে শুরু করে সব দিক দিয়েই এগিয়ে থেকে আজ মাঠে নামবে দ্বীপদেশটি। আর বাংলাদেশের সঙ্গী শুধুই আশা। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া একটি দলের সেটাই যে সবচেয়ে বড় শক্তি।
তবে খুব বেশি আশাও করা যাচ্ছে না হাভিয়ের কাবরেরার এই দলটিকে নিয়ে। প্রতিপক্ষ যখন মালদ্বীপ তখন ভয়টা আরও বেশি। শেষ ছয় দেখার পাঁচটিতেই যে জয়ী দল মালদ্বীপ।
একটা সময় যে দলটিকে নিয়ে বাংলাদেশ রীতিমতো ছেলেখেলা খেলত, সেই মালদ্বীপের ফুটবল এগিয়ে গেছে অনেকটা। বাংলাদেশের তুলনায় দলটি অনেক বেশি পরিণত। তাদের খেলায় আছে গতি, ছন্দ ও গোল করার এক অবিশ্বাস্য তাড়না। গোল করার ক্ষমতায়ও তারা এগিয়ে।
সেই তুলনায় বাংলাদেশ হাঁটছে উল্টোরথে। আনাড়ি কোচ হাভিয়ের কাবরেরা লেবাননের বিপক্ষে এই দলটিকে খেলিয়েছিল পুরোপুরি রক্ষণাত্মক কৌশলে। ঘর সামলে আক্রমণে উঠে গোল করাই ছিল পরিকল্পনা। সে অনুযায়ী ম্যাচের ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ঠিকঠাকই ছিল বাংলাদেশ।
এর পরই তারিক কাজী করে বসেন এক মহাভুল। সেটা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের গোলের দরজা খোলে লেবানন। তারপরও ম্যাচটা হতে পারত অন্যরকম যদি পাওয়া সুযোগগুলো বাংলাদেশের ফরোয়ার্ডরা কাজে লাগাতে পারত।
আজও বাংলাদেশের খেলার কৌশলে পরিবর্তন আনার খুব বেশি সুযোগ নেই। মালদ্বীপের অ্যাটাকিং থার্ডকে রুখতে তাদের রক্ষণ রাখতে হবে নিরেট। পাশাপাশি গোল খরার পুরনো রোগে ভোগা বাংলাদেশের ফরোয়ার্ডদের করে দেখাতে হবে অন্য কিছু।
অতীতে দুদলের মুখোমুখি পরিসংখ্যানে এখন পর্যন্ত সমতা। ১৫ ম্যাচে ছয়টি করে জয় দুদলের। তিনটি ম্যাচ শেষ হয়েছে অমীমাংসিত। সর্বশেষ গত বছর মালেতে গিয়ে প্রীতি ম্যাচে বাংলাদেশের হারতে হয়েছে ২-০ ব্যবধানে। তার আগে অবশ্য ২০২১ সালে শ্রীলঙ্কায় চারজাতি আসরে বাংলাদেশ অনেক দিন পর হারিয়েছিল মালদ্বীপকে। আজ সেই জয়ের দেখা পাওয়ার পূর্বশর্ত নিজেদের জাল রাখতে হবে সুরক্ষিত।
গোল না খেলে, গোল করার সামর্থ্য আছে, এই দাবি করে দলের অন্যতম অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার তপু বর্মণ বলেছেন, ‘চাপের ম্যাচ কিন্তু অনেক খেলেছি আমরা। দেখা গেছে আমরা জিতে শুরু করেছি, পরে ড্র করলে ফাইনাল বা সেমিফাইনাল খেলতে পারব, কিন্তু হয়নি। এবার ভিন্ন প্রেক্ষাপট। আমরা হেরে শুরু করেছি। এখন আমাদের দ্বিতীয় ম্যাচ জিততে হবে। আমরা মনে করছি এই ম্যাচ জিততে না পারলে সাফ থেকে বিদায় নিতে হবে। তাই প্রতিটা খেলোয়াড়ের দায়িত্ব সেরাটা খেলার। অবশ্যই ক্লিনশট রাখার জন্য চেষ্টা করব। একশ ভাগের চেয়ে বেশি দিতে হবে আমাদের।’
লেবাননের বিপক্ষে গোলের সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করেন তরুণ ফরোয়ার্ড ফয়সাল আহমেদ ফাহিম।
সেই কষ্ট ভুলতেই আজ গোল করতে চান আবাহনীর এই রাইট উইঙ্গার, ‘আমাদের জেতা ছাড়া আর কোনো রাস্তা খোলা নেই। সবাইকে সবার শতভাগ দিতেই হবে। মালদ্বীপের রক্ষণ ভাঙা অবশ্যই সম্ভব। আমরা আগের ম্যাচে অনেক সুযোগ পেয়েছিলাম কিন্তু হয়নি (গোল)। সেই ম্যাচে যেটা হওয়ার হয়ে গেছে, আমরা এখন মালদ্বীপ ম্যাচ নিয়ে আশাবাদী।’
অধিনায়ক জামাল ভুঁইয়ার কাছে এই ম্যাচটাই ফাইনাল, ‘সবাই হতাশ কারণ, আমরা মনে করেছি একটা ভালো ম্যাচ খেলেছি (লেবাননের বিপক্ষে)। কিন্তু যেটা হয়, অতীতের পুনরাবৃত্তি হয়েছে। ম্যাচের শেষ দশ-পনের মিনিট মনোযোগ হারিয়ে ফেলি আমরা, যে কারণে দুই গোল খেয়েছি। এখন যেটা হয়েছে, সেটা ভুলে যেতে হবে। এখন মালদ্বীপ ম্যাচ নিয়ে ভাবছি। এটা আমাদের ফাইনাল ম্যাচ।’
আজ না জিতলে আবারও গ্রুপপর্ব থেকে হারের আক্ষেপে পুড়তে হবে বাংলাদেশকে। হতশ্রী রূপে ফুটবলারদের ফিরতে হবে শূন্য হাতে। তারপরও টনক নড়বে না ফুটবল কর্তাদের। সঠিক পথে হাঁটার কোনো পরিকল্পনাই তারা নেবেন না। সেই বোধটাই যে হারিয়ে গেছে তাদের।