মাদক কারবারির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তালিকার পর তালিকা হচ্ছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না মাদক কারবারিদের। মাদকদ্রব্য ছড়িয়ে পড়ছে শহর থেকে গ্রামাঞ্চলের আনাচে-কানাচে। মাদক কারবারিদের তালিকা নিয়েও বিতর্ক আছে। কারণ তালিকায় অনেক নিরপরাধ লোকজনের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিতর্ক এড়াতে নতুন করে তালিকার কাজে হাত দিয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। ইতিমধ্যে তালিকার কাজ প্রায় সম্পন্ন করে আনা হয়েছে।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাদক নির্মূল করতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি। অভিযান হচ্ছে। প্রকৃত মাদক কারবারিদের তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে না এবং হবেও না।’ ইচ্ছাকৃতভাবে তালিকায় নাম তুলে কাউকে হয়রানি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
২০১৮ সালে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে সরকার। এরপর মাদকবিরোধী অভিযানে র্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন। কক্সবাজারের টেকনাফে অনুষ্ঠান করে আত্মসমর্পণ করানো হয় ১০২ কারবারিকে। কিন্তু মাদকের বিস্তার রোধ করা যায়নি।
পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগের চেয়ে মাদকবিরোধী অভিযান কিছুটা শিথিলতা চলছে। আর এই সুযোগে মাদক কারবারিরা এলাকায় আসছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। ঈদের পর জোরালো অভিযান চালানো হবে। নতুন করে একটি তালিকা তৈরির কাজ প্রায় শেষ করে আনা হয়েছে। তালিকাটি নির্ভুল হবে বলে আশা করছি। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন দিলে আমরা অ্যাকশনে যাব।’
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদক কারবার ও সেবন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মাদক কারবারিতে জড়িয়ে পড়েছে। সরকারের নির্দেশে পুলিশ-র্যাব ও সব গোয়েন্দা সংস্থা মাদক কারবারি ও গডফাদারদের তালিকা তৈরি করেছে। তালিকায় রাজনৈতিক দলের নেতা, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পেশার ‘হাইপ্রোফাইল লোকদের নাম রয়েছে। ওই তালিকাটি নিয়ে পুলিশ ও র্যাব বিশেষ অভিযান শুরু করার কথা রয়েছে। মাস দু-এক আগে বিভিন্ন জেলা থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে একটি প্রতিবেদন পাঠায়। প্রতিবেদনে বলা হয়Ñ এখনো মাদক কারবারিরা সক্রিয়। যারা আত্মগোপনে ছিল তাদের মধ্যে অনেকেই এলাকায় ফিরেছে। তারা প্রকাশ্যে মাদক কারবার করছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে আইজিপিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৈঠকে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ঈদের পর সাঁড়াশি অভিযান চালানো, মাদকের আস্তানাগুলো উচ্ছেদ, অভিযান কেন আগের মতো হচ্ছে না তা অনুসন্ধান করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ও অভিযানের ফলোআপ পুলিশ ও র্যাব সদর দপ্তর মনিটরিং করার সিদ্ধান্ত অন্যতম। এ ছাড়া মাদক কারবারে পুলিশের কোনো সদস্য জড়িত থাকলে তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নতুন তালিকায় বেশ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী, রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের নামও উঠে এসেছে। তাদের ব্যাপারে আরও অধিকতর তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্র জানায়, নতুন তালিকায় যাদের নাম এসেছে তাদের মধ্যে আছেন কক্সবাজারের মোস্তাক মেম্বার, নুরুল মেম্বার, টেকনাফের শাহজাহান, ফেনীর জসিম মিয়া, নুর আহমেদ, মোহাম্মদ নবী, কামাল মিয়া সুমন, কুমিল্লার মোহাম্মদ মহসিন, শাহজালাল মিয়া, চট্টগ্রামের কাশিম আহমেদ, মুরাদ উদ্দিন, চুয়াডাঙ্গার হান্নান শেখ, মিথুন, সাফিকুল, সাগর শেখ, ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাঁশবাড়ী এলাকায় সখিনা, বিউটি, সুরাইয়া ওরফে লিপি, সোহেল, জেনেভা ক্যাম্পের আসাদ, মোকছেদ, শাকিল, রিকশাচালক নুরুল আমিন, উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের তানজিমারখোলার জয়নাল আবেদীন, সুলতান আহমেদ, ফজল কাদের, জাহাঙ্গীর আলম, মুফিজ উদ্দিন ও রহিমা খাতুন। তা ছাড়া যেসব স্থান হয়ে দেশে মাদক ঢুকছে সেগুলোও চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব স্থান হলো টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপ, নাফ নদের খুরের মুখ, ঘোলারপাড়া, দক্ষিণপাড়া, মাঝেরপাড়া সৈকত, সাবরাং কচুবনিয়া, হারিয়াখালী, কাটাবনিয়া, খুরের মুখ, আলীরডেইল, মুন্ডারডেইল, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের মহেষখালীয়াপাড়া সৈকত, নোয়াখালীপাড়া, কুনকারপাড়া, বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর, শীলখালী, মাথাভাঙ্গা, বড়ডেইল, উখিয়ার ইনানী, হিমছড়ি, দরিয়ানগর, শাহপরীরদ্বীপ মিস্ত্রিপাড়া, জেটিঘাট, জালিয়াপাড়া, নোয়াপাড়া, সাবরাং, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নাজিরপাড়া, মৌলভীপাড়া, টেকনাফ পৌরসভার জালিয়াপাড়া, কায়ুকখালীপাড়া ঘাট, নাইট্যংপাড়া ঘাট, বরইতলী, কেরুনতলী, হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা, জাদিমুড়া, আলী খালী, দমদমিয়া, চৌধুরীপাড়া, হ্নীলা, মৌলভীবাজার, হোয়াইক্যং ইউনিয়নের খারাংখালী, কাঞ্জরপাড়া, লম্বাবিল, উনচিপ্রাং, উখিয়ার থাইংখালী, পালংখালী, বালুখালী, ঘুমধুম, রেজুপাড়া, তমব্রু, আছাড়তলী ও ঢালারমুখ। দেশের অন্য জেলাগুলোর বিভিন্ন স্থান হয়ে মাদক ঢুকছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তালিকায় আলোচিত সাবেক সংসদ সদস্য বদির নাম না থাকলেও তার কয়েকজন স্বজনের নাম রয়েছে। তবে তালিকায় যাদের নাম এসেছে তারা মূলত মাদক কারবারি। আগের তালিকায় থাকা অনেকের নামও আছে নতুন তালিকায়।
তিনি বলেন, নাফ নদ হয়ে মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। নদের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে তাদের নজরদারি আছে। বিজিবি, পুলিশ ও কোস্টগার্ডও কাজ করছে। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা চোরাকারবারিদের সহায়তা করছে বলে এসব পদক্ষেপ কাজে আসছে না। কিছুদিন আগে মিয়ানমারের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ দপ্তরকে আবারও চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই দেশের নিরাপত্তা বাহিনী সহায়তা করছে না।