ঈদে নিরাপত্তা

ঝুঁকির শীর্ষে তেজগাঁও-মতিঝিল-রমনা

রাজধানীর কলাবাগান এলাকার বশিরউদ্দিন রোডের একটি বাসায় থাকেন মো. ফিরোজ হোসাইন। গত ঈদুল ফিতরে পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যান তিনি। ঈদের পর ২৪ এপ্রিল রাতে বাসায় ফিরে দেখেন তার তিনটি রুমের সবকিছু এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। আলমারি ভাঙা এবং জানালার গ্রিল কাটা। বাসা থেকে ২২ ভরি স্বর্ণালংকার এবং নগদ ৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা চুরি হয়েছে। এ ঘটনায় কলাবাগান থানায় মামলা করেন ফিরোজ।

গত বছর ঈদুল ফিতরে গ্রামের বাড়িতে যান রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ইমামুল আরাফাত। বাসায় ফিরে দেখেন জানালার গ্রিল কেটে চোরেরা ৩৭ ভরি স্বর্ণালংকার, দুটি ল্যাপটপ ও নগদ ২ লাখ টাকা নিয়ে গেছে। চুরির ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন ইমামুল আরাফাত।

প্রতি ঈদেই রাজধানী বিভিন্ন এলাকায় ঘটে এমন সব দুর্ধর্ষ চুরি-ডাকাতি। ঈদে রাজধানী ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে যারা যান তাদের অন্যতম চিন্তার বিষয় বাসার চুরি-ডাকাতি নিয়ে। এবারও ঈদুল আজহায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আটটি বিভাগের মধ্যে চুরি ডাকাতির বেশি ঝুঁকিতে আছেন তিনটি বিভাগের বাসিন্দারা। বিভাগ তিনটি হলো- তেজগাঁও, মতিঝিল ও রমনা। চুরি, ডাকাতি ও দস্যুতার পরিসংখ্যানে শীর্ষে রয়েছে ডিএমপির এ তিনটি বিভাগ। গত বছর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ডিএমপির আটটি বিভাগের ৫০টি থানায় হওয়া চুরি, ডাকাতি ও দস্যুতার মামলা বিশ্লেষণে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এ সময়ের মধ্যে বিভাগ তিনটিতে শুধু চুরির মামলা হয়েছে ১,১১৬টি। আর ডাকাতি ও দস্যুতার মামলা হয়েছে ১৪৩টি।

এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নগরবাসীকে অনুরোধ করেছেন, যারা ঈদে গ্রামের বাড়িতে যাবেন তারা যেন বাসা ঠিকভাবে লক করে যান। এ ছাড়া যাদের সিসিটিভি আছে তারা যেন ইন্টারনেট প্রটোকল দিয়ে খেয়াল করেন। নিরাপত্তা প্রহরী যাদের রেখে যাবেন তারা যেন বিশ্বস্ত হন। খুব দামি জিনিস যেন নিরাপদ স্থানে রেখে যান। যেমন, যে সকল আত্মীয়স্বজন ঈদে গ্রামের বাড়িতে যাবে না তাদের কাছে রাখতে পারেন।

জানতে চাইলে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) ড. খ. মহিদ উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিএমপির সব বিভাগেই চোর কমবেশি আছে, তবে তেজগাঁও, মতিঝিল ও রমনার বিভাগে আমাদের বিশেষ নজর আছে। পুলিশের পক্ষ থেকে আমরা যতখানি করা যায় তার সর্বোচ্চটা করব।

তিনি বলেন, আগের চুরির মামলাগুলো আমরা খুবই নিবিড়ভাবে তদন্ত করছি এবং বেশ কিছু চোর ধরা পরেছে। চোরের গ্যাংগুলো যদি ধরা না পরে তাহলে চুরি হতেই থাকবে। শুধু পাহারা দিয়ে তো চুরি ঠেকানো সম্ভব না। কেননা যারা চুরি করে তাদেরও কাউন্টার ইনটেলিজেন্স থাকে, তারাও দেখে পুলিশ কোন পথে হাটে।

তিনি আরও বলেন, সকল ক্ষেত্রে প্রাথমিক নিরাপত্তার দায়িত্ব যার সম্পদ তারই, এটা শুধু বাংলাদেশে না সারা পৃথিবীতেই।

বেশ কিছু চোর গ্রেপ্তারের পর রাজধানীতে চুরির পরিমাণ আগের থেকে কমছে বলেও দাবি করেন পুলিশের এ কর্মকর্তা।

এদিকে রাজধানীর নিরাপত্তা জোরদারে ডিএমপির উপ পুলিশ কমিশনারদের (ডিসি) কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ১৭ দফার ওই নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে ঈদের সময় ব্যাংক, স্বর্ণের দোকান, মার্কেটের নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে, আশপাশের দোকান দিয়ে ঢুকে যেন চুরি, ডাকাতি করতে না পারে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। ওই সব স্থানে দায়িত্বরত নিরাপত্তা প্রহরীদের সঙ্গে পুলিশের সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে নির্দেশনায়। এ ছাড়া বাসাবাড়িতে নিরাপত্তা জোরদারে বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট জোরদারের কথাও বলা হয়েছে নির্দেশনায়। গত ২২ জুন ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (অপারেশনস) বিপ্লব কুমার সরকার স্বাক্ষরিত এক বার্তায় ডিসিদের এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়।

রমনা, লালবাগ, ওয়ারী, মতিঝিল, তেজগাঁও, মিরপুর, গুলশান ও উত্তরা এই আটটি বিভাগে ভাগ করা হয়েছে ডিএমপিকে। এর মধ্যে তেজগাঁও বিভাগে রয়েছে, তেজগাঁও থানা, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা, মোহাম্মদপুর থানা, আদাবর থানা, শেরেবাংলা নগর থানা ও হাতিরঝিল থানা। রমনা মডেল থানা, শাহবাগ থানা, ধানমন্ডি থানা, নিউমার্কেট থানা, হাজারীবাগ থানা ও কলাবাগান থানা নিয়ে গঠিত রমনা বিভাগ। এ ছাড়া পল্টন মডেল থানা, মতিঝিল থানা, সবুজবাগ থানা, খিলগাঁও থানা, রামপুরা থানা, মুগদা থানা ও শাহজাহানপুর থানা নিয়ে গঠিত মতিঝিল বিভাগ।

২০২২ সালে ডিএমপির বিভিন্ন থানায় হওয়া মামলার মামলার পরিসংখ্যান বলছে, তেজগাঁও বিভাগে সব থেকে বেশি চুরি সংগঠিত হয়েছে। এ সময়ে চুরির মামলা হয়েছে ৩৫৯টি ও ডাকাতি-দস্যুতার মামলা হয়েছে ৪৪ টি। চুরিতে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মতিঝিল বিভাগ, ২৩৩টি মামলা হয়েছে এ বিভাগে। এ ছাড়া ডাকতি ও দস্যুতার মামলা হয়েছে ২৭টি। রমনা বিভাগে চুরির মামলা হয়েছে ২৫০টি। আর ডাকাতির দস্যুতার মামলা ২৪টি। এ ছাড়া মিরপুর বিভাগে ১৯৯টি, উত্তরা বিভাগে ১৯২টি, গুলশান বিভাগে ১৪৩টি, ওয়ারী বিভাগে ১৪০টি, লালবাগ বিভাগে ৮৭টি।

চলতি বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত মামলার পরিসংখ্যান বলছে, তেজগাঁও বিভাগে সব থেকে বেশি চুরির (১০৮ টি) মামলা হয়েছে। ডাকাতি-দস্যুতার মামলা হয়েছে ২২টি। ৬৯টি চুরির মামলা হয়েছে মতিঝিলে। ডাকতি ও দস্যুতার মামলা হয়েছে ১১টি। রমনা বিভাগে চুরির মামলা হয়েছে ৯৭ টি। আর ডাকাতির-দস্যুতার মামলা ৬টি। এ ছাড়া অন্যান্য বিভাগের মধ্যে গুলশান ও ওয়ারি বিভাগে ৫০টি করে, মিরপুর বিভাগে ৪৬টি মামলা হয়েছে।

ডিএমপির গোয়েন্দা তেজগাঁও বিভাগের (ডিবি) উপকমিশনার (ডিসি) মো. গোলাম সবুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের সবগুলো টিম শিফটিং ভিত্তিতে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা কাজ করবে। বিশেষ করে সন্ধ্যা থেকে শুরু করে ভোর রাত পর্যন্ত। তেজগাঁও বিভাগের অধীনে থাকা মার্কেট গুলোতে বিশেষ নজর থাকবে। এ ছাড়া বিগত সময়ের চিহ্নিত অপরাধী, চোর ছিনতাইকারীদের তালিকা নিয়ে আমরা কাজ করছি। তারা কোথায় আছে, এলাকায় আছে কিনা এসব বিষয়ে নিয়মিত কাজ করছে আমাদের টিম।