পাবলিকের উপায় কী? কোথায় যাবে?

কথিত আছে, ভূত তাড়ানোর জন্য শস্য হিসেবে সর্ষেকে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু একটা পর্যায়ে দেখা গেল ভূত বিদায় হচ্ছে না। বরং এর-ওর ঘাড় মটকিয়ে দিব্যি রাজত্ব করে যাচ্ছে। তখন এক তান্ত্রিক আবিষ্কার করল, যে শস্য দিয়ে ভূত তাড়ানো হয়েছে তার মধ্যেই ভূত ছিল। তাই সেই শস্যটি আর কাজে লাগল না। আমাদের দেশেও তাই হয়েছে। একটি ঘটনা দিয়ে শুরু করি।

আমি বিদেশ থেকে ফিরছিলাম, এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন পার হওয়ার সময় প্রথম ফোনটি এলো এক অচেনা ভারী কণ্ঠের। বললেন, আপনি বোধহয় অনেক লোকের মধ্যে আছেন, একটু কি আলাদা জায়গায় দাঁড়াবেন? আমি জিজ্ঞাসা করলাম কেন? বললেন, একটু জরুরি কথা আছে, আপনারই উপকারে আসবে। আমি তার কথা মানলাম না, বললাম, কী বলবেন বলুন। আপনার নাম কি মামুনুর রশীদ? আমি বললাম জি। আপনার নামে আমাদের দুদকে কয়েকটি দরখাস্ত এসেছে। আমরা তার সত্যতা যাচাই করেছি। আমি দুদকের উপপরিচালক, চল্লিশ মিনিটের মধ্যে ফাইলটি আমাকে ছেড়ে দিতে হবে।

আমি বললাম, বিষয়টা কী বলুন। অপরপ্রান্ত থেকে বললেন, বিষয়টা হচ্ছে আপনি এবং আপনার স্ত্রী চাকরি করাকালীন কিছু জায়গা-জমি কিনেছেন, সেগুলোর প্রমাণও আছে। আপনি এখন অবসরে গেছেন, কাজেই সব তথ্য নিয়ে আমরা ফাইলটি প্রস্তুত করেছি। আপনি যদি কোনো কথা বলতে চান বলতে পারেন।

আমি তখন ভ্রমণক্লান্ত, বিরক্তিতে মনটা বিষিয়ে গেছে, তবুও আমি হাসলাম এবং বললাম আপনি ভুল করছেন, আমি কোনো সরকারি চাকরি করিনি অবসরেও যাইনি। গত পনেরো বছরের মধ্যে আমার জায়গাজমি কেনার কোনো ব্যাপারই নেই। কিন্তু লোকটা দমল না। বলল, সে আপনি বলতে পারেন কিন্তু আমাদের দুদকের তদন্ত টিম এসব কিছুর প্রমাণ পেয়েছে। আমার প্রশ্ন, তাহলে কী করবেন এখন? খুব দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি বললেন মামলা হবে, আপনি এক বিরাট ঝামেলায় পড়ে যাবেন। তার চেয়ে আসুন একটা মীমাংসা করি। আমার ডিপার্টমেন্টের চারটি শাখা, সামনে ঈদ, প্রত্যেককে যদি আপনি একটু মিষ্টি খাওয়ান, টাকা দিয়ে সন্তুষ্ট করেন তাহলে আর কোনো ঝামেলা হবে না।

আমার ভেতরের ক্ষোভকে চাপা দিয়ে কৌতুক করেই বললাম, ধরুন আমি মিষ্টি খাওয়ালাম না, তাহলে কী হবে? ফাইলটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আজই চলে যাবে, ওপরে ট্যাগ লেগে যাবে অতীব জরুরি। মামলা হবে আপনার নামে, ওয়ারেন্ট বের হবে, কোর্ট-কাচারিতে দৌড়াতে দৌড়াতে জীবন শেষ হয়ে যাবে, সেই সঙ্গে আপনার স্ত্রীরও। দেখুন, এই যে কথা বলতে বলতে দশ মিনিট চলে গেল আর আছে আধঘণ্টা। আমি একটু অভিনয় করলাম, কাতরস্বরে বললাম কত টাকা দিতে হবে? লোকটা বলল, এসব ক্ষেত্রে আমরা লাখ পাঁচেক টাকার নিচে কোনো ডিল করি না। শুধু আপনার খাতিরে চারটি টেবিলের জন্য লাখখানেক টাকা লাগবে। এখন বিকাশে আপাতত চল্লিশ হাজার টাকা পাঠান, বাকিটা ঈদের ছুটির পর দেবেন।

আমি তখন খুব ঠান্ডা গলায় হাসতে হাসতে বললাম, আপনি ফাইলটি ছেড়ে দেন, আমার নামে মামলাটা হোক তারপর আমি দেখব। ইচ্ছা করছিল একটা গালি দিই, কারণ অতীতে বিকাশের প্রতারকদের পাল্লায় পড়ে আমার বেশ কিছু টাকা খোয়া গেছে তবুও গালটা দিলাম না। এর পরপরই আমি আমার বন্ধু অবসরপ্রাপ্ত সচিবদের সঙ্গে কথা বললাম, যাদের মধ্যে কেউ কেউ দুদকেই চাকরি করত। তারাও বলল, অবসরে যাওয়ার পর নাকি তারাও এ রকম ফোন পায়। যথারীতি পরে ফোন করে ওই নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেছে।

এ তো গেল প্রতারকচক্রের ঘটনা, কিন্তু চমকে উঠলাম যখন দেখলাম দুর্নীতি দমন কমিশনের উচ্চপদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তা মুক্তিযুদ্ধের ভুয়া সনদ নিয়েছেন। সেই সঙ্গে কয়েকজন সচিবও ছিল। দুদিন আগে খবরের কাগজে দেখলাম, মহাপরিচালকের পিএসহ আরও চারজন ধরা পড়েছে। ধরা পড়ার সময় নগদ কিছু টাকা এবং কিছু কাগজ পাওয়া গেছে। বেচারা পিএ আজকের দিনে ঘুষের অঙ্কের দিক থেকে এত কম টাকার জন্য ধরা পড়লেন! যে দেশে ঘুষের অঙ্ক কোটি টাকার নিচে নামে না। সে দেশে বেচারা মাত্র দেড় লাখ টাকার জন্য ধরা পড়ল! আমি একবার দুদকের একটি মতবিনিময় সভায় গিয়েছিলাম। সেখানে বলেছিলাম, দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগবিধি ও বেতন কাঠামো একেবারেই অন্য রকম হওয়া উচিত এবং শাস্তির বিধানের ক্ষেত্রেও আইনের সংস্কার করা প্রয়োজন। যে লোকটি ধরা পড়েছে সেই লোকটি মানি লন্ডারিং বিভাগের মহাপরিচালকের পিএ। অথচ সরকার মানি লন্ডারিংয়ের ব্যাপারে অনেক কথাই বলছে কিন্তু কার্যত তা যে ফলপ্রসূ নয়, তা কানাডা, আমেরিকা, ইংল্যান্ড, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইউরোপের শহরগুলোতে গেলেই এর প্রমাণ মেলে। শুধু তাই নয়, সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং প্রতিবেশী ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গেলেও তার প্রমাণ যথেষ্ট পাওয়া যায়।

একবার আমরা খুব গবেষণা করে বের করেছিলাম যে, দেশের দারিদ্র্যের কারণটা কী? সেটা কি সীমিত সম্পদ? বিশাল জনসংখ্যা? নাকি মুষ্টিমেয় ধনীদের সীমাহীন লোভ, অর্থসম্পদ পাচার এবং দুর্বৃত্ত কর্তৃক সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ঘটেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোকদের সীমাহীন দুর্নীতি-লুণ্ঠন এবং যথেচ্ছাচারের কারণে। ১৯৪২ সালের দুর্ভিক্ষ ঘটেছিল কালোবাজারি, মুনাফাখোর এবং মজুদদারদের অতি লোভের কারণে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও সীমাহীন দুর্নীতি ঘটেছে, বঙ্গবন্ধু স্বয়ং বলেছিলেন চাটার দল সব চেটেপুটে খেয়ে ফেলেছে, সেই চাটার দল এখন প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছে। তাদের কাছে দুর্নীতি, সম্পদ পাচারÑ এগুলো আর এখন অসম্মানজনক কাজ নয়, তাদের কেউ ঘৃণাও করে না তারা সসম্মানে ঢাকায় কোটি টাকার গাড়ি হাঁকিয়ে সকাল দুপুর সন্ধ্যা ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ এবং ডিনার করে বেড়ায়। ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদদের তবুও টিকা-টিপ্পনী সহ্য করতে হয়, কিন্তু দুর্নীতিবাজ আমলারা নিরাপদে দিন যাপন করে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বাণিজ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যেই বলে থাকেন সরকার ইচ্ছা করলেও দ্রব্যমূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। কিছু দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী তাদের কথা শুনছে না। আবার অর্থমন্ত্রীও বলছেন মুদ্রাস্ফীতি কমানো যাচ্ছে না। আর অন্যদিকে করের বোঝা বেড়েই চলেছে। বিদ্যুতে অসহনীয় এবং যুক্তিহীন বিলের চাপ, নানা জায়গায় ধরনা দিয়েও বিদ্যুৎ বিলের কোনো সুরাহা হয় না। এ মাসে চার হাজার পরের মাসে দশ হাজার তার আগের মাসে একুশ হাজার এ রকম বিল! অর্থাৎ সেখানেও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ব্যাংকের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্তৃত্ব নেই, সুদের হার বেড়ে চলেছে কিন্তু সঞ্চয়ের ওপর সুদ কমিয়ে নানা ধরনের করারোপ করা হচ্ছে। এসব কে থামাবে?

সব দেশেরই শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতায় থাকার সময় কিছু বিত্তের অধিকারী হয় বটে, কিন্তু সেই বিত্তটি জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে নয়। কিন্তু এসব দুর্নীতির ফলাফল গিয়ে পড়ে জনগণের ওপর। তাই দ্রব্যমূল্যের দাম, করের বোঝার চাপে জনগণের হাহাকার কেউ শুনতে পায় না। কিন্তু এভাবে কত দিন চলবে? কোথাও তো একটা নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। সব কিছু করে পার পাওয়া যায়Ñ এই অপবাদ তো ঘোচাতে হবে, কিন্তু তাই বা কী করে সম্ভব? যদি দেখতাম রাজনীতিবিদরা বাজারে বাজারে দলবেঁধে ঘুরছে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সেই সঙ্গে সরকারের লোকজনও গিয়ে দাঁড়াচ্ছে অথবা মুদ্রাস্ফীতি কমানোর জন্য ব্যাংক মালিকরা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। ব্যাংকের কর্মকর্তারা প্রচুর টাকা বেতন পায়, উচ্চ পর্যায়ের যারা আছেন তাদের তো কথাই নেই। এই বেতনের টাকা কোথা থেকে আসে? বছর বছর দেখা যায় ব্যাংকগুলোর বিশাল বিশাল টাওয়ার গড়ে উঠছে সেই অর্থের উৎসই বা কী? সবই জনগণের টাকা। আবার এই ব্যাংকগুলোই বিদেশে টাকা পাচার করতে নানাভাবে সহায়তা করে থাকে। বাংলাদেশে সবাই সবার আত্মীয় তার ওপর আছে রাজনীতিবিদ, আমলা এবং বড় ব্যবসায়ীদের প্রবল চাপ।

এ সময়ে অর্থনীতির গতি সঞ্চার হয়েছে, অনেক উল্টাপাল্টা কর্মকা-ের সম্ভাবনা থাকে এবং তার পরিণতি আমরা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু পৃথিবীর সব দেশে সব কিছুর ওপর সরকারের একটা নিয়ন্ত্রণের জায়গা থাকে। তাদের হাত থেকে রাঘববোয়ালরাও রেহাই পায় না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে রাঘববোয়ালরাই সব নিয়ন্ত্রণ করছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কোথায় যাব, কার কাছে যাব? এই সর্ষের ভূতের হাত থেকে এই রাষ্ট্র কবে রক্ষা পাবে?

লেখক: নাট্যকার, অভিনেতা ও কলামিস্ট

mamunur530@gmail.com