কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আত্মত্যাগের এক অনন্য উপমা। কোরবানির দিনসমূহে প্রত্যেক সাহেবে নেসাবের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। কোরবানির মাধ্যমে পার্থিব ও পরকালীন প্রভূত কল্যাণ অর্জিত হয়। সেই সঙ্গে আল্লাহভীতি অর্জন, অসহায়-দরিদ্রদের সহায়তা ও আত্মত্যাগ প্রকাশের সুযোগ আসে কোরবানির মৌসুমে। কোরবানির বিধান প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, ‘প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমি কোরবানির বিধান রেখেছি, যাতে তারা গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তুগুলো জবাইয়ের সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। যা তিনি তাদের রিজিক হিসেবে দান করেছেন। তোমাদের মাবুদ একই মাবুদ। সুতরাং তোমরা তারই কাছে আত্মসমর্পণ করো আর সুসংবাদ দাও বিনীতদের।’ সুরা হজ : ৩৪
ইসলামের অন্য ইবাদতগুলোর মতো কোরবানি সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ ও মাসয়ালা জেনে নেওয়া কোরবানিদাতার একান্ত কর্তব্য। অন্যথা কোরবানির প্রকৃত পুরস্কার-প্রাপ্তি ও কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হতে হবে। নিম্নে এ সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় আলোচনা ও মাসয়ালা তুলে ধরা হলো।
নিয়তের পরিশুদ্ধতা
অন্যান্য ইবাদতের মতো কোরবানিও হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য; পার্থিব কোনো উদ্দেশ্যে নয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘সুতরাং আপনি আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় করুন এবং কোরবানি করুন।’ সুরা কাউসার : ২
পবিত্র কোরআনের অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘আপনি বলে দিন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও মরণ সবই জগৎসমূহের পালনকর্তা আল্লাহর জন্য।’ সুরা আনআম : ১৬২
কোরবানি কখন কার ওপর ওয়াজিব
যদি কোনো ব্যক্তি সংসারের মৌলিক চাহিদা মিটিয়ে কোরবানির দিনগুলোতে (১০ জিলহজের সূর্যোদয়ের পর থেকে ১২ জিলহজের সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত) সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি রুপা অথবা তার সমপরিমাণ বাজার মূল্যের নগদ টাকা বা যেকোনো পণ্যের মালিক হয়, তবে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব। ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া : ৫/৬৯৬
একান্নভুক্ত পরিবারে পিতার অর্থ ও ব্যবস্থাপনার ওপর ভিত্তি করে সন্তানরা উপার্জন করে টাকা পিতার হাতে সোপর্দ করে এবং পরিবারের যাবতীয় পরিচালনা যৌথভাবে হয়ে থাকে, সে অবস্থায় সন্তানদের উপার্জিত টাকা পিতার বলে গণ্য হবে, এ কারণে কোরবানি শুধু পিতার ওপর ওয়াজিব হবে, অন্যদের ওপর নয়। তবে এ অবস্থাও যদি সন্তানদের ব্যক্তিমালিকানায় কোনো সম্পদ বা অর্থ এ পরিমাণ থাকে, যা কোরবানির নেসাব পর্যন্ত পৌঁছায়, তাহলে পিতার পাশাপাশি সন্তানদের ওপরও কোরবানি ওয়াজিব হবে। আদ দুররুল মুখতার : ৪/৩৬৫
স্বামী যদি নিজ দায়িত্বে স্ত্রীর ভরণপোষণের হক আদায় করে, এ অবস্থায় স্ত্রীর মালিকানাধীন জমি (ক্রয়কৃত/মিরাসসূত্রে প্রাপ্ত) ও স্বর্ণের একত্র মূল্য যদি নেসাব পরিমাণ হয়, তাহলে ওই স্ত্রীর ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে, অন্যথায় নয়। আল বাহরুর রায়েক : ৮/১৭৪
কোরবানির পশুর বয়সসীমা
চন্দ্রবর্ষ হিসেবে উটের বয়স ন্যূনতম পাঁচ বছর, গরু ও মহিষ দুই বছর, ভেড়া ও দুম্বা যদি এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় বয়স এক বছর পূর্ণ না হলেও দেখতে এক বছরের মতো মনে হয়, তাহলে তা দ্বারাও কোরবানি জায়েজ। অবশ্য এ ক্ষেত্রে কমপক্ষে ছয় মাস বয়সের হতে হবে। আর ছাগলের বয়স পূর্ণ এক বছর হতে হবে। এর কম হলে তা দ্বারা কোরবানি জায়েজ হবে না। ইমদাদুল ফাতোয়া : ৩/৫৬৮
শরিকি কোরবানির বিধান
একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা শুধু একজনই কোরবানি দিতে পারবে। এমন একটি পশু দুই বা ততোধিক ব্যক্তি মিলে কোরবানি করলে কারোটাই সহিহ হবে না। আর উট, গরু ও মহিষে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারবে। সাতের অধিক হলে কারও কোরবানি সহিহ হবে না। সহিহ মুসলিম : ১৩১৮
কোরবানির পশুতে প্রত্যেক অংশীদারের অংশ সমান হতে হবে। কারও অংশ অন্যের অংশ থেকে কম হতে পারবে না। যেমন কারও আধা ভাগ, কারও দেড় ভাগ। এমন হলে কোনো শরিকের কোরবানি শুদ্ধ হবে না। ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া : ৪/২০৭
কোরবানিতে হারাম টাকা ব্যবহার করা নাজায়েজ। ওই ধরনের টাকা দ্বারা কৃত কোরবানি সহিহ হয় না এবং এর দ্বারা অন্য শরিকদের কোরবানিও বাতিল হয়ে যায়। আহসানুল ফাতোয়া : ৭/৫০৩
কেউ যদি শুধু গোশত খাওয়ার নিয়তে কোরবানি করে, তাহলে তার কোরবানি শুদ্ধ হবে না। তাকে অংশীদার বানালে অন্যদের কোরবানিও আদায় হবে না। ফাতোয়ায়ে হিন্দিয়া : ৫/৩০৪
কোরবানির পশু জবাই প্রসঙ্গে
কোরবানির পশু নিজে জবাই করা উত্তম। তবে অন্যকে দিয়েও জবাই করাতে পারবে। এ ক্ষেত্রে কোরবানি দাতা পুরুষ হলে জবাইস্থলে তার উপস্থিত থাকা ভালো। ফাতোয়ায়ে শামি : ৫/২৭২
জবাইয়ের সময় কোরবানির পশুর কণ্ঠনালি, খাদ্যনালি এবং দুই পাশের মোটা দুটি রগের মধ্যে যেকোনো একটিসহ মোট তিনটি কাটতে হবে। যদি দুটি কাটা হয় তাহলে কোরবানি ও জবাই শুদ্ধ হবে না। হেদায়া : ৪/৪৩৭
দক্ষ ও পারদর্শী লোকের মাধ্যমে দ্রুত জবাইয়ের কাজ সম্পন্ন করা। জবাই করার আগে ছুরি ভালোভাবে ধার দেওয়া। জবাই করার সময় ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলা। কোরবানির পশুকে এমনভাবে জবাই করবে, যাতে পশুর কোনো প্রকার অপ্রয়োজনীয় কষ্ট না হয়। জবাইকারীর সঙ্গে যদি অন্য কেউ ছুটি চালানোর কাজে সাহায্য করে, তাহলে তার জন্যও ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলা ওয়াজিব। অন্যথায় কোরবানি সহিহ হবে না এবং জবাইকৃত পশুও হালাল হবে না। ইমদাদুল ফাতোয়া : ৩/৫৪৭
জবাইয়ের পর পশু পুরোপুরি নিস্তেজ হওয়ার পূর্বপর্যন্ত তার চামড়া খসানো বা অন্য কোনো অঙ্গ কাটা উচিত নয়। আদ দুুররুল মুহতার : ৬/২৯৬
অনেক সময় দেখা যায়, জবাইয়ের পর পশুকে দ্রুত নিস্তেজ করতে ছুরি বা চাকুর ধারালো আগা দিয়ে জবাইয়ের স্থানে আঘাত করা হচ্ছে। এটা পশুর প্রতি অমানবিক আচরণের বহিঃপ্রকাশ। তাছাড়া এর মাধ্যমে পশুর স্বাভাবিক মৃত্যু ব্যাহত হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এটাকে একরকম ‘হত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তারা বলেন, পশু জবাইয়ের পর যে স্থানে তীক্ষè ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়, সেটি মূলত ‘মেরুরজ্জু বা স্পাইনাল কর্ড’-এর অংশ। ছুরির আঘাতে পশুর স্পাইনাল কর্ড বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেই পশুর দেহ থেকে মস্তিষ্কের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে পশুটি হার্ট অ্যাটাক করে এবং মারা যায়। অথচ পশু জবাইয়ে ইসলামের নির্দেশনা হলো উত্তম পন্থা অবলম্বন করা। হজরত শাদ্দাদ ইবনে আউস (রা.) বর্ণিত এক হাদিসের হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা সবকিছুর ওপর অনুগ্রহকে অপরিহার্য করেছেন। অতএব, তোমরা কাউকে (শরিয়ত মোতাবেক হদ বা কিসাস হিসেবে) হত্যা করবে, উত্তম পদ্ধতিতে করবে। যখন (পশু) জবাই করবে, উত্তম পদ্ধতিতে করবে এবং প্রত্যেকে তার ছুরিতে শান দিয়ে নেবে, যাতে জবাইকৃত পশুকে কষ্টে না ফেলে। সহিহ মুসলিম : ১৯৫৫
কোরবানির পশু জবাই করে পারিশ্রমিক দেওয়া-নেওয়া জায়েজ। তবে কোরবানির পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া যাবে না। কিফায়াতুল মুফতি : ৮/২৬৫
কোরবানির গোশত ও চামড়ার বিধান
কোরবানির গোশত বণ্টনের শরিয়তসম্মত উত্তম পন্থা হলো কোরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করে এক ভাগ গরিব-মিসকিনকে দেওয়া, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনকে দেওয়া এবং আর এক ভাগ নিজের জন্য রেখে দেওয়া। তবে এ ব্যাপারে কোরবানিদাতা সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। ইচ্ছা হলে কোরবানির সব গোশত নিজে ও পরিবারকে নিয়ে খেতে পারে। আবার চাইলে আত্মীয়স্বজন ও গরিব-মিসকিনকেও দিতে পারবে। ফাতোয়ায়ে মাহমুদিয়া : ১১/৩৪৩
ইদানীং কোরবানির গোশত সংগ্রহ ও বিতরণের সামাজিক এক রীতি লক্ষ করা যাচ্ছে। যেখানে প্রত্যেক কোরবানিদাতা গরিবের জন্য নির্ধারিত অংশটা পাড়া বা মহল্লার নির্দিষ্ট এক স্থানে পৌঁছে দেয়। পরে সংগৃহীত গোশত মাথাপিছু হারে সমাজের মানুষের মাঝে বিতরণ করা হয়। গোশত বণ্টনের এ পদ্ধতি জায়েজ, যদি তাতে মান্নতের গোশত মিশ্রিত না থাকে। কেননা মান্নতের গোশত গরিবের হক এবং তা শুধু তাদের মাঝেই বণ্টন করতে হবে। আদ দুুররুল মুহতার : ৬/৩৬৭
কোরবানির গোশত প্রস্তুত এবং এ সংক্রান্ত অন্যান্য কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিকে পারিশ্রমিক হিসেবে কোরবানি পশুর কোনো অংশ দেওয়া যাবে না। হজরত আলি (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তার কোরবানির উটগুলোর নিকট অবস্থান করতে বলেন। তিনি তাকে উটের সব গোশত, চামড়া ও জিন (প্রাণীর পরিধেয় পোশাক) মিসকিনদের মাঝে বিতরণের নির্দেশ দেন এবং তা থেকে কসাইকে পারিশ্রমিক হিসেবে কিছু দিতে নিষেধ করেন। সহিহ মুসলিম : ১৩১৭
কোরবানিদাতা কোরবানির চামড়া নিজ কাজে ব্যবহার করতে পারবে। তবে চামড়া বিক্রি করে দিলে তার মূল্য জাকাত খাওয়ার উপযুক্ত গরিব-মিসকিনদের সদকা করে দেওয়া জরুরি। কোনো মসজিদ-মাদ্রাসার নির্মাণ বা উন্নয়নমূলক কোনো কাজে ওই চামড়ার মূল্য ব্যয় করা জায়েজ নেই। আহসানুল ফাতোয়া : ৭/৫৩১
কোরবানির পশুতে আকিকার অংশ
সন্তান জন্মের পর আল্লাহর শোকরিয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে জন্মের সপ্তম দিনে পশু জবাইকে আকিকা বলে। হাদিসে এ ব্যাপারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। সপ্তম দিন সম্ভব না হলে চৌদ্দতম/একুশতম দিনে দিতে পারবে। তাও সম্ভব না হলে পরবর্তীকালে যেকোনো সময় দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আকিকার গোশতের হুকুম কোরবানির গোশতের মতোই। তাছাড়া কোরবানির পশুতে আকিকার অংশ নেওয়াও জায়েজ। তবে কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার পরও কোরবানি না দিয়ে আকিকা দেওয়া বা কোরবানির তুলনায় আকিকাকে প্রাধান্য ও বেশি গুরুত্ব দেওয়া জায়েজ নয়। কেননা কোরবানি ওয়াজিব আর আকিকা মোস্তাহাব পর্যায়ের আমল। বিষয়টি একান্ত লক্ষণীয়। সহিহ বোখারি : ৫৪৭২
কোরবানির দিন ও সময়
কোরবানির সময়সীমা ১০ জিলহজের সুবহে সাদিকের পর থেকে ১২ জিলহজের সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত। তবে যে এলাকায় শরিয়ত কর্র্তৃক বর্ণিত শর্ত মতে জুমা ও ঈদের নামাজ পড়া জায়েজ সে এলাকায় ঈদের নামাজের আগে কোরবানি করা জায়েজ হবে না। ফাতহুল কাদির : ৮/৪২৫
কেউ যদি কোরবানির দিনগুলোতে ওয়াজিব কোরবানির দিতে না পারে এবং কোরবানির পশু ক্রয় না করে থাকে, তাহলে তার ওপর কোরবানির উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করে থাকে, কিন্তু কোনো কারণে কোরবানি দেওয়া হয়নি, তাহলে ওই পশু জীবিত সদকা করে দেবে। ফাতোয়ায়ে কাজিখান : ৩/৩৪৫