গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল রেজিস্ট্রেশন করতে আসা জমির ক্রেতা-বিক্রেতারা প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সামান্য ভুলের জন্য দিতে হয় হাজার হাজার টাকা। সাব-রেজিস্ট্রারকে টাকা দিলেই টিন সার্টিফিকেট অথবা আয়কর রিটার্ন না থাকলেও হয়ে যাচ্ছে জমি রেজিস্ট্রেশন।
দলিল সম্পাদনের জন্য আসা জমির ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে জমির রেজিস্ট্রেশন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এজন্য জমির ক্রেতা-বিক্রেতারা জুলাই মাসের আগেই জমি রেজিস্ট্রেশন করার জন্য প্রতিদিন ভিড় করছেন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে। জমি ক্রেতার কাগজপত্রে সামান্য ত্রুটি থাকলেই তার কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে হাজার হাজার টাকা। বিশেষ করে জমি রেজিস্ট্রেশন করতে এখন আয়কর রিটার্ন ও টিন সার্টিফিকেট থাকা বাধ্যতামূলক। অনেক ক্রেতা বিষয়টি না জেনে জমি রেজিস্ট্রেশন করতে আসেন। এ ক্ষেত্রে সাব-রেজিস্ট্রারের লোকদের হাতে ১০ হাজার টাকা দিলেই হয়ে যাচ্ছে দলিল। তখন টিন বা আয়কর রিটার্নের প্রয়োজন পড়ে না।
গাজীপুর সদরের দুটি সাব-রেজিস্ট্রার ঘুরে দেখা গেছে, দুই সপ্তাহ ধরে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জমির ক্রেতা-বিক্রেতারা জমি রেজিস্ট্রেশন করার জন্য সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ভিড় করেন। গত মার্চ মাসের ১১ তারিখে গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগ দেন মো. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি দুটি অফিসে দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তিন দিন এবং দ্বিতীয় যুগ্ম সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দুদিন অফিস করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগীরা জানান, আয়কর রিটার্ন বা জমির খাজনা-খারিজের কোনো সমস্যা হলে প্রকারভেদে ১০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিলেই জমি রেজিস্ট্রেশন করতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আর এসব টাকা সরাসরি সাব-রেজিস্ট্রারের নামেই নেওয়া হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ডেভেলপার কোম্পানির মালিক দেশ রূপান্তরকে জানান, তিনি তার তিনটি দলিল রেজিস্ট্রেশন করার জন্য রবিবার দ্বিতীয় যুগ্ম সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যান। ২০২১-২২ সাল পর্যন্ত তার আয়কর রিটার্ন দেওয়া ছিল। তিনটি দলিল তিনি রেজিস্ট্রেশন করতে গেলে তার কাছে সাব-রেজিস্ট্রার নিজে দেড় লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকার করায় দলিলগুলো ছুড়ে ফেলে দেন। তিনি আরও জানান, তার অন্য এক সহকর্মীর টিন সার্টিফিকেট না থাকায় তিনি ১০ হাজার টাকা অতিরিক্ত দিয়ে দলিল রেজিস্ট্রেশন করেছেন।
গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি ও দ্বিতীয় যুগ্ম সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কয়েকজন দলিল লেখকের সঙ্গে কথা বললে তারা (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) জানান, নতুন সাব-রেজিস্ট্রার আসার পর দলিল করতে আসা লোকজনের কাগজপত্রে কোনো সমস্যা থাকলে টাকা দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। তারা আরও বলেন, টিন ও আয়কর রিটার্ন না থাকলে জমির পরিমাণ ও টাকার পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে ১০ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত টাকা নিয়ে জমি রেজিস্ট্রেশন করে দেন সাব-রেজিস্ট্রার।
এ ব্যাপারে গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রার মো. জাহাঙ্গীর আলম অতিরিক্ত টাকা নেওয়া ও টিন এবং আয়কর না থাকলেও জমি রেজিস্ট্রেশন করার বিষয়টি অস্বীকার করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কেউ এসবের প্রমাণ দিতে পারবে না।
২০২৩-২৪ সালের জাতীয় বাজেটে জমি রেজিস্ট্রেশনে উৎসে কর ১ শতাংশ বাড়ানো হতে পারে। ফলে আগামী ১ জুলাই থেকে রাজউক ও সিডিএ অন্তর্ভুক্ত এলাকার জমি রেজিস্ট্রেশনের জন্য ৫ শতাংশ, অন্য সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকার জন্য ৪ শতাংশ উৎসে কর দিতে হবে। এজন্য অতিরিক্ত টাকা বাঁচানোর জন্য জমির ক্রেতা-বিক্রেতা জমি রেজিস্ট্রেশন করতে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ভিড় করছেন।