ঢাকায় খুনোখুনির সর্বোচ্চ ২৩ শতাংশই ওয়ারি বিভাগে

তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাহাদাত হোসেন (২৮) নামের এক যুবকের বুকে ছুরি মেরে নির্মম ভাবে খুন করেন তারই আপন বড় ভাই মো. শামীম (৩১)। একই সময় বাবা মো. আনোয়ারকেও ছুরিকাঘাত করেন তিনি। গত ২৩ জুন সন্ধ্যায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওয়ারি বিভাগের গেন্ডারিয়া থানার বেগমগঞ্জে ঘটে এ নির্মম হত্যাকাণ্ড।

গত বছরের ১ এপ্রিল একই বিভাগের বনগ্রাম এলাকায় বুকে ছুরিকাঘাত করে শফিক (১৯) নামে এক যুবককে খুন করে দুর্বৃত্তরা। তিনি বনগ্রামের তামার কারখানায় কাজ করতেন। ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে তাকে হত্যা করা হয়।

ডিএমপির আটটি বিভাগে খুনের শীর্ষে রয়েছে ওয়ারি বিভাগ। যার শতকরা হিসেব বলছে রাজধানীর মোট খুনের ২৩ শতাংশই ওয়ারি বিভাগে যা আটটি বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। খুনের সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে মিরপুর বিভাগ (১৭ শতাংশ) ও তৃতীয় অবস্থানে গুলশান বিভাগ (১২ শতাংশ)। গত দেড় বছরে ডিএমপির বিভিন্ন থানায় হত্যা মামলার পরিসংখ্যান ঘেঁটে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব খুনের পেছনে মাদক, ছিনতাই ও জমিজমা নিয়ে বিরোধ অন্যতম কারণ। বিশেষ করে মাদকের বিস্তার বেশি বিভাগটিতে। মাদকরে জন্য বিখ্যাত নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের চনপাড়া বস্তি এ বিভাগের সীমান্তবর্তী এলাকায়। এ ছাড়া ওয়ারি বিভাগে খুনিরা অন্য স্থানে খুন করে লাশ ফেলার নিরাপদে স্থানও মনে করছেন।

ওয়ারি বিভাগে খুনের নেপথ্যের কারণ হয়েছে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ বিভাগের পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিএমপির এ বিভাগটিতে মূলত ছিনতাইকারী ও মাদক সেবীদের বিচরণ বেশি। বিশেষ করে যাত্রা বাড়ি চৌরাস্তা ও সায়েদাবাদ টার্মিনালে ছিনতাইকালে ছুরিকাঘাতের ঘটনা অহরহ ঘটে থাকে। এ ছাড়া পতিত ভূমি নিয়ে বিরোধ, মাছের ঘের, শিল্প প্রতিষ্ঠানে কাজ করা নিয়েও বিবাদ থেকে ঘটে হত্যার ঘটনা।

বেগমগঞ্জে নিহত শাহাদাত হোসেনের স্ত্রী মরিয়ম আক্তার বৃষ্টি দেশ রূপান্তরকে জানান, শামীম মাদকাসক্ত ও ভবঘুরে। যার কারণে ছেলেকে বাসা থেকে বের করে দেয় মো. আনোয়ার। ঘটনার দিন হঠাৎ বাসায় এসে ভাত চান শামীম। ভাত দিতে দেরি হওয়ায় প্রথমে বৃষ্টিকে মারধর করে। পরে বাবা ও ভাইকে ছুরিকাঘাত করে শামীম।

ডিএমপির ওয়ারি বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) এস. এম. শামীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, জীবনের নানান হতাশা থেকে আপন ভাইকে হত্যা করেন শামীম।

নিহত শরিফের সহকর্মী মো. ফরহাদ জানান, তারা ওয়ারি বনগ্রামে একটি তামার কারখানার কাজ করেন। সন্ধ্যার দিকে শরিফ বনগ্রাম হাজি মসজিদের সামনে ছিল। এ সময় কে বা কারা তার বুকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। পরে দেখতে পেয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে গেলে তার মৃত্যু হয়। কারও সঙ্গে কোনো বিরোধ ছিল কিনা তা বলতে পারছি না। তবে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে এর আগে এলাকায় মারামারির ঘটনা ঘটেছিল।

ডিএমপির খুনের মামলায় শীর্ষ অবস্থানে ওয়ারি বিভাগ থাকলেও এ বিভাগের পুলিশের দায়িত্বশীলরা বলছেন, যে অর্থে খুনের মামলা নেওয়া হয় অনেক ক্ষেত্রে খুন সেই অর্থে হয় না। কারণ বিভিন্ন জায়গা থেকে খুন করে লাশ ফেলে রেখে যায় এ বিভাগে। এ ছাড়া নদীতে ফেলা অন্য এলাকার লাশও ভেসে আসে এখানে। লাশ উদ্ধারের জায়গা হওয়াতে মামলা নেওয়া হয় ঠিকই কিন্তু হত্যার ঘটনাস্থল ওয়ারি বিভাগে না।

জানতে চাইলে ডিএমপির ওয়ারি বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. জিয়াউল আহসান তালুকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওয়ারি বিভাগটি ঢাকা শহরের পেরিফেরি (সীমান্তবর্তী) হওয়ার কারণে ও নারায়ণগঞ্জ জেলার লাগোয়া হওয়ায় অপরাধীরা এই জায়গাটিকে বেছে নেয় ডেডবডি ফেলে দেওয়ার জন্য। যে কারণে প্রকৃত পক্ষে যে খুনগুলো আমাদের এলাকায় হচ্ছে তার চেয়ে বেশিই ডেড বডি এখানে পাওয়ার কারণে খুনের মামলা নিতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, মামলার পরিসংখ্যান ওয়ারি বিভাগে খুনের প্রকৃত ডাকা দেবে না। কারণ প্রকৃত খুন অন্য স্থানে হচ্ছে কিন্তু ডেড বডিটা এখানে ফেলে রেখে যাচ্ছে তাদের নিরাপদ কোনো শেল্টারের কারণে। পরবর্তীতে ডিটেক্ট হয়।

ডিএমপি সূত্র বলছে, রাজধানীকে আটটি বিভাগে ভাগ করে গঠিত হয়েছে ডিএমপি। বিভাগ আটটি হলো রমনা, লালবাগ, ওয়ারী, মতিঝিল, তেজগাঁও, মিরপুর, গুলশান ও উত্তরা। এসব বিভাগের অধীনে রয়েছে মোট ৫০টি থানা। গত বছর এবং চলতি বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ডিএমপির এসব থানায় মোট হত্যা মামলা হয়েছে ২২৪টি। এর মধ্যে ওয়ারি বিভাগের অন্তর্ভুক্ত শ্যামপুর, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, কদমতলী, গেন্ডারিয়া ও ওয়ারি থানায় হত্যা মামলা হয়েছে ৫১টি। যার মধ্যে দুটি রয়েছে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। এ ছাড়া মিরপুরে ৩৮টি, গুলশানে ২৬টি, উত্তরা বিভাগে ২৩টি।