গুচ্ছ থেকে মুখ ফিরিয়েছে ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী

উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষে উচ্চশিক্ষার জন্যে দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর দিকে ঝোঁকে শিক্ষার্থীরা। স্বপ্ন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করবে। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যে কেবল অংশ নিতেই যেখানে অর্থের সঙ্গে ঘটতো অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম যা মানসিক স্বাস্থ্যেও প্রভাব ফেলতো।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা আলাদা করে ভর্তি ফরম সংগ্রহ এবং সেই প্রতিষ্ঠানে গিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে যাওয়ার জন্যে যে বিপুল অর্থের খরচ হয় তার বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে ব্যয় সংকোচন ও সহজ করতে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আনা হয় পরিবর্তন।

চারটি বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজস্ব প্রক্রিয়ায় ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করে চলেছে। অন্যদিকে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে ১৯টি সাধারণ ও বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিষয়ক বিশ্ববিদ্যালয় গুলো নিয়ে শুরু হয় গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা। যেখানে বর্তমানে আরও ৪টি বিশ্ববিদ্যালয় যোগ দিয়েছে। বর্তমানে সেই সংখ্যা ২২টি।

সময় ও ব্যয় সংকোচন উদ্দেশ্য দেখানো গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন ও ভর্তি কার্যক্রম ইতোমধ্যে হয়েছে সমালোচনার স্বীকার। অভিযোগ রয়েছে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বাণিজ্যেরও।

ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ প্রক্রিয়া নিয়ে আদালতেও পড়েছিল অভিযোগ। প্রাপ্ত নম্বর অনুযায়ী প্রকাশ হওয়া মেধাক্রমের বাইরে গিয়েও অপেক্ষাকৃত পেছনে থাকা শিক্ষার্থীকে ভর্তি করানোর অভিযোগ রয়েছে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে। সেগুলোর মধ্যে এসেছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম।

গুচ্ছে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ও ভর্তির সুযোগ পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করবার পূর্বে পর্যন্ত মোট দুবার যাবার কথা থাকলেও অনেক শিক্ষার্থীকে কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেতে হয়েছে কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ বার। এমনই এক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী প্রিতম পাল। যিনি বর্তমানে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়ায় বারবার সিদ্ধান্ত ও নিয়ম পরিবর্তনের কারণে আমাদের সমস্যায় ফেলেছিল।

গণ-বিজ্ঞপ্তির নাম করে শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ডেকে নিয়ে হয়রানি করে সকল যোগ্য শিক্ষার্থীদের ভর্তি না করারও অভিযোগ রয়েছে অনেক শিক্ষার্থীর। এই নিয়ে একাধিক মানববন্ধন করেছিল ভর্তি–ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা।

গুচ্ছ ভর্তি কার্যক্রমে হয়রানির প্রভাব শিক্ষার্থীদের বিমুখ করে তুলছে বলেও জানান শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।

সম্প্রতি গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে পাওয়া তথ্যের বিশ্লেষণে দেখা যায় পূর্বের থেকে প্রায় ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী গুচ্ছে ভর্তি হওয়ার আগ্রহ হারিয়েছে। ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে উত্তীর্ণ হয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৮৮৯ জন । বিভিন্ন সমালোচনায় প্রশ্নবিদ্ধ গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার এবারের প্রক্রিয়ায় তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩লাখ ৫ হাজার ৯৮৬ জনে।

গুচ্ছে শিক্ষার্থীদের এমন অনাগ্রহকে ভাবিয়ে তুলছে সংশ্লিষ্টদের। দুটি বিশ্ববিদ্যালয়য়ের সাবেক দুই উপাচার্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা যে ভাবনায় গুচ্ছে গিয়েছিলাম তার সুফল আসলে আমরা পাচ্ছিনা। বরং উল্টো হুমকিতে পড়ছে শিক্ষা ব্যবস্থা। ইউজিসি, মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকেই নিজেদের বিষয়ে নিজেদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চেয়ারে থাকলে আসলে সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়া যায় না। মূলত শিক্ষাটা একটা ফাঁদে আটকে আছে। আর সেটা হলো গুচ্ছয় ভর্তি পরীক্ষায় যাওয়া।

২২ বিশ্ববিদ্যালয়য়ের প্রত্যেকটিতে কমেছে শিক্ষার্থী ভর্তির আবেদন । যা গত বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।

সব থেকে বেশি চাহিদা কমেছে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যা ৭০ শতাংশ। কাছাকাছি রয়েছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ৬৩%, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়৫০%, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ৪৬%, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫৬% চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ৫১% সহ গুচ্ছে থাকা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতেও কমেছে শিক্ষার্থীদের আবেদন।

গুচ্ছে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কমছে কিনা এমন প্রশ্ন শুনেই ব্যস্ত আছি, মিটিং-এই আছি বলে ফোন কেটে দেন গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন ।

তবে এমন অভিযোগ মানতে নারাজ গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা পরিচালনার টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য সচিব ও চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নাছিম আখতার । তিনি বলেন, এটাকে কমেছে বলা যাবে না। সচেতন হয়েই অনেকে আবেদন করছে না। তারা জেনে গেছে কম নাম্বার নিয়ে আবেদন করলে ভর্তি হওয়া যাবে না। তাই এই পরীক্ষা শিক্ষার্থী কমাচ্ছে না বরং আগ্রহ বাড়াচ্ছে।

গুচ্ছে অনিয়মের বিষয়ে চাঁদপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেন আমার জানা নেই । আর অনিয়ম হলে আমাকে তথ্য দিন আমি জায়গা মতো পৌঁছে দেবো।

তবে ভর্তি পরীক্ষার কোন প্রক্রিয়া নিয়েই জানেন না বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ জামিনুর রহমান। তিনি বলেন, এই তথ্য আমার জানা নেই এইগুলো গুচ্ছ পরীক্ষা সংক্রান্ত কমিটি জানবে। আপনি শাহাজালালের উপাচার্যকে ফোন দিন।

এই গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা কার্যক্রম থেকে আয়কৃত অর্থের ব্যবহার নিয়েও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।

গুচ্ছে থাকা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকই এই প্রক্রিয়ায় থাকতে চাননা। তারা নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে বের হয়ে আসার জন্যে বললেও তা কাজে আসেনি।