পঞ্চম হিজরির শাওয়াল মাসে মক্কার কোরাইশ, মদিনার ইহুদি, বেদুঈন এবং পৌত্তলিকরা সম্মিলিতভাবে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করেছিল। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপর গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। খন্দক শব্দের অর্থ পরিখা বা গর্ত। যেহেতু এই যুদ্ধে অনেক লম্বা পরিখা খনন করা হয়, তাই এই যুদ্ধের নাম দেওয়া হয় খন্দকের যুদ্ধ। এ যুদ্ধ আহজাব নামেও পরিচিত। আহজাব অর্থ সম্মিলিত বাহিনী।
উহুদের যুদ্ধে কোরাইশরা চেয়েছিল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে হত্যা করে ইসলামের নাম-নিশানা স্তব্ধ করে দিতে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। সে জন্য মরিয়া হয়ে ৬২৭ খ্রিস্টাব্দে মার্চ মাসে ১০ হাজার সৈন্যের এক বিরাট বাহিনী নিয়ে মদিনা আক্রমণের উদ্দেশ্যে রওনা হয় কোরাইশদের এই জোট। খবর পেয়ে সাহাবিদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন নবী কারিম (সা.)। সিদ্ধান্ত হয় শহরের ভেতর থেকে কোরাইশদের আক্রমণ প্রতিহত করা হবে। সৈন্য সংগ্রহ শুরু হলে দেখা গেল বাছাই প্রক্রিয়া শেষে সর্বমোট ৩ হাজার সৈন্যের জোগাড় হয়েছে। এত অল্প সংখ্যক সৈন্য দিয়ে ১০ হাজার সৈন্যের মোকাবিলা কীভাবে হবে এজন্য সবাই চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এমন সময় এক অসাধারণ যুদ্ধপদ্ধতির ধারণা নিয়ে আসেন সাহাবি হজরত সালমান ফারসি (রা.)। তিনি বলেন, নগরীর উত্তর ও পশ্চিম দিক সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত। তাই ওদিক দিয়ে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তিনি এই দিক দিয়ে পরিখা খনন করার পরামর্শ দিলেন। তার পরামর্শ সবার মনঃপূত হলে সবার পরিশ্রমে পরিখা খনন হয়ে যায়। রাসুল (সা.) নিজেও এই খনন কাজে অংশ নেন। কোরাইশ বাহিনী এসে মুসলিম বাহিনীর এই কৌশল দেখে হতচকিত হয়ে যায়। মাঝে মাঝে পরিখা অতিক্রমের চেষ্টা করতে গিয়ে তাদের ১০ জন নিহত হয়। মুসলিম পক্ষের ৬ জন শহীদ হন। এভাবেই ২৭ দিন থাকার পর কাফেরদের ওপর গজব হিসেবে ঘূর্ণিঝড় নেমে আসে। ঝড়ে কাফেরদের তাঁবুগুলো উড়িয়ে নিয়ে যায়। তারা যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। উল্লেখ্য, খন্দক যুদ্ধ নিয়ে আল্লাহতায়ালা সুরা আহজাবে ৯ থেকে ২৭ পর্যন্ত ১৯টি আয়াত নাজিল করেন।
খন্দকের যুদ্ধ ক্ষেত্রের পরিখাগুলোর কোনো চিহ্ন এখন আর নেই। যুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে ৭টি মসজিদ। যুদ্ধের সময় হজরত সালমান ফারসি (রা.), হজরত আবু বকর (রা.), হজরত সাদ বিন মুয়াজ (রা.), হজরত আলী (রা.) যেখান থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সেখানে পরবর্তীকালে মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে যুদ্ধের সময় নবী কন্যা হজরত ফাতেমা (রা.)-এর তাঁবু ছিল, সেখানে তার নামে একটি মসজিদ এবং সর্বশেষ খন্দকের যুদ্ধের বিজয়কে স্মরণে রেখে মসজিদ আল ফাতাহসহ মোট ৭টি মসজিদ নির্মিত হয়। সব মসজিদ একত্রে আসসাবায়া বা ৭ মসজিদ নামে পরিচিত।