ইসলাম ধর্মের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, রীতি, নীতি-নৈতিকতা, শিষ্টাচার ও আদর্শের এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ সালাম। যা ইসলামের সর্বোত্তম অভিবাদন। যার মূলে নিহিত রয়েছে শান্তির বীজ। যা শুভকে আমন্ত্রণ করে, অশুভকে দূরীভূত করে। পরস্পর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, মায়া ও মমতার সুভাস ছড়ায়; রহমত ও বরকতের আলো ছড়ায়। আদি পিতা হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে সমস্ত মুসলিম জাহানের অভ্যর্থনা হিসেবে সালাম প্রচলিত হয়ে আসছে।
সালাম আরবি শব্দ, অর্থ শান্তি, প্রশান্তি, কল্যাণ, নিরাপত্তা, দোয়া, আরাম, আনন্দ, সুখ, তৃপ্তি ইত্যাদি। সালাম একটি প্রতীক হিসেবে আমাদের ধর্ম, সমাজ এবং সাংস্কৃতিক সারমর্মে গভীরভাবে নিহিত। এর ধর্মীয় তাৎপর্যের সঙ্গে সামাজিক তাৎপর্যও রয়েছে। ধনী-গরিব, ছোট-বড়, সম্মানী-অসম্মানী, পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে দেখা হওয়া মাত্রই সব মুসলিমকে সালাম দেওয়া সুন্নত।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘এক ব্যক্তি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কে প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসুল! ইসলামে কোন আমলটি সর্ব উত্তম? উত্তরে রাসুল (সা.) বললেন, মানুষকে খানা খাওয়ানো এবং তুমি যাকে চিনো আর যাকে চিনো না সবাইকে সালাম দেওয়া।’ সহিহ বোখারি
ইসলামে সালামের জবাব দেওয়ার ব্যাপারেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সালামের উত্তর দেওয়া ওয়াজিব। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর যখন তোমাদের সালাম দেওয়া হবে তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম সালাম দেবে। অথবা জবাবে তাই দেবে।’ সুরা আন নিসা : ৮৬
একজন মুসলমান সালামের উত্তর দানের মাধ্যমে আরেকজন মুসলমানের হক আদায় করে। ‘আসসালামু আলাইকুম’ (আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) বলার মাধ্যমে সালামদাতা অপর ব্যক্তি বা পক্ষের মঙ্গল কামনা করে। অনুরূপভাবে সালামগ্রহীতা ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম’ (আপনার ওপরও শান্তি বর্ষিত হোক) জবাবের মাধ্যমে সালামদাতার কল্যাণ ও মঙ্গল কামনা করে। এর ফলে পারস্পরিক সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।
বর্তমানে আমাদের সমাজে পূর্বের তুলনায় সালামের প্রচলন অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এর ফলে মানুষের ভেতর পারস্পরিক মায়া-মমতা, ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে, সমাজে দ্বন্দ্ব-কলহ ও সংঘাত প্রকট থেকে আরও প্রকটতর হচ্ছে। হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি, অসুস্থ প্রতিযোগিতা বাড়ছে, পারস্পরিক সম্পর্ক ও একতা বিনষ্ট হচ্ছে। একাকিত্বতা এবং নিঃসঙ্গতার মতো ইত্যাদি সামাজিক সমস্যা সমাজে বাসা বাঁধছে।
সালাম আদান-প্রদানের মাধ্যমে সালামদাতা ও গ্রহীতা উভয়ই একে অপরের মঙ্গল কামনা করে। সালামের মাধ্যমে কতিপয় লোক বা দলের ভেতর ভালো আলাপচারিতা গড়ে ওঠে। যেহেতু সালামের মাধ্যমে একজন আরেকজনের প্রতি মঙ্গল কামনা করে, তাই সালাম আদান-প্রদানে ব্যক্তির মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, মায়া-মমতা, ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সালাম ব্যক্তিদের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক স্থাপনকে উৎসাহিত করে। এটি মুসলিম উম্মাহকে একে অপরকে শান্তি ও শুভেচ্ছার সঙ্গে অভিবাদন জানাতে উৎসাহিত করে, একতা, সম্মান এবং বোঝাপড়ার বোধ জাগিয়ে তোলে।
সালাম বিনিময়ের মাধ্যমে মুমিন ব্যক্তিরা একে অপরের উপস্থিতি এবং মঙ্গল স্বীকার করে, যা সমাজ ব্যবস্থাকে আরও অন্তভুক্তিমূলক এবং সমন্বিত সমাজের দিকে পরিচালিত করে। যেহেতু সালাম আদান-প্রদানের মাধ্যমে পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি পায়, তাই সালাম আগ্রাসন, সহিংসতা এবং অপরের ক্ষতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।
সালামের অভ্যাস ব্যক্তিদের তাদের নৈতিক বাধ্যবাধকতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যা তাদের পরস্পর ক্ষতি করা থেকে বিরত রাখে। সালাম প্রচলনের মাধ্যমে সমাজে ন্যায় ও সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। সালামের মাধ্যমে সমাজের ধনী-গরিব নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ সম্মান পায়, তাদের মধ্যকার ভেদাভেদ দূর হয়। যা তাদের ভেতর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তোলে, একতা বৃদ্ধিতে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। সালাম মানুষের অন্তরের কৃপণতা দূর করে। পাশাপাশি পার্থিব জীবনে ও মানুষকে কৃপণতা থেকে দূরে রাখে।
সর্বোপরি সালামদাতা ও গ্রহীতার উভয়ের ওপর আল্লাহ সন্তুষ্ট হন, রহমত ও বরকত দান করেন। হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি আগে সালাম দেবে সে আল্লাহ ও তার রাসুলের কাছে উত্তম ব্যক্তি।’ মুসনাদে আহমাদ : ২২১৯২