জলবায়ু সমস্যা বাংলাদেশের অস্তিত্বের লড়াই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক বিশেষ দূত সাবের হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, আমাদের দেশের অর্থনীতি এখন নির্ভর করছে জলবায়ুর যে চ্যালেঞ্জ আমরা কীভাবে মোকাবিলা করি, এর ওপর।
গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি)’ আয়োজিত জলবায়ু বাজেট এবং সুপারিশ পর্যালোচনা অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, আমাদের প্রবৃদ্ধি যদি সাত থেকে আটে চলে যায় তাহলে আমরা কিন্তু নেগেটিভ গ্রোথে চলে যাচ্ছি। জলবায়ু সমস্যার কারণে আমাদের কী ক্ষতি হচ্ছে সেই বিষয়ে আমাদের জানতে হবে। জলবায়ুর কারণে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়, সেই ক্ষতি মোকাবিলায় আমাদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা,পরিসংখ্যান এবং তথ্যের বিশ্লেষণ আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। আমাদের বিনিয়োগের সংকট থাকতে পারে। আমরা বলতেই পারি যে তারুণ্য, জেন্ডার ইনভায়রনমেন্ট এর উপর আমাদের নজর রাখা উচিত। আমাদের প্রশ্ন জন্মায় বাংলাদেশের জলবায়ুর জন্যে কি রকম অর্থনীতি প্রয়োজন। আর বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে সঙ্গে বাইরে থেকে কি পরিমাণ বিনিয়োগ হবে সেটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের দেখতে হবে কি রকম বরাদ্দ আছে। সেটা পর্যাপ্ত কি না। এছাড়া কি পরিমাণ রিসোর্সেস অ্যাভিলেবল আছে এবং আমাদের কোনটা প্রয়োজন সেটা জানতে হবে। আমাদের প্রয়োজন নিয়েও আমাদের মূল্যায়ন থাকতে হবে। আমরা যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলছি সেটা কোনো স্থির বিষয় নয়। এটি একটি চলমান বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি যাকে আমরা মুভিং গোল পোস্ট বলতে পারি। সকল পরিসংখ্যান বলছে অভিযোজন পরিকল্পনার জন্য ২৩০ বিলিয়ন প্রয়োজন এখন থেকে ২০৫০ সাল সময়ে। কিসের উপর ভিত্তি করে আমরা করবো। যেখানে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে ১.১ডিগ্রি সেলসিয়াস করে।
অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য তানভীর শাকিল জয় বলেন, আমাদের সমস্যা অনুযায়ী দাতা সংস্থা থেকে যে অর্থ পাচ্ছি সেটা অনেক কম। কারণ এখন পর্যন্ত জলবায়ু নিয়ে আমরা কী ধরনের সমস্যা বাংলাদেশ মোকাবিলা করছে সেটা ভালোভাবে তুলে ধরতে পারিনি। যেকোনো দেশ চাওয়ার সময় অবশ্যই বেশি চাইবে। কিন্তু প্রাপ্তির জায়গা অনেক কম।
তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশের সবার ধারণা গাছ লাগালে জলবায়ু সমস্যার পরিবর্তন হয়ে যাবে। আসলে তা নয়। জলবায়ু সমস্যা মোকাবিলায় স্থানীয় সরকার বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ গ্রামীণ জনপদ থেকে শুরু করে শহর পর্যন্ত যত উন্নয়ন হয়, সেখানে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সরাসরি সম্পৃক্ত থাকে। গ্রামীণ জনপদেও জলবায়ু সমস্যা মোকাবিলা আমাদের সচেতন হতে হবে। সেজন্য কমিউনিটিকে আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলে জলবায়ু মোকাবিলা সম্ভব। এছাড়া বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, এনজিও ছাড়াও যেসব প্রতিষ্ঠান জলবায়ু মোকাবিলায় কাজ করছে তাদের নিয়ে একটা সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, জলবায়ু বাজেট সংস্কার করা উচিত, যা জাতীয় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কৌশল হিসেবে বিবেচিত হয়। সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা (পিএফএম) এজেন্ডাসহ জলবায়ু বাজেট সংস্কার হওয়া প্রয়োজন। জলবায়ু বাজেট সংস্কার পরিচালনার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়া উচিত। পাশাপাশি সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হওয়া উচিত অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের। বেসরকারি খাত, বেসরকারি সংস্থা, সুশীল সমাজ এবং সম্প্রদায়-ভিত্তিক সংস্থাগুলোসহ বৃহত্তর স্টেক হোল্ডারদের এ সংস্কার কাজে যুক্ত হতে পারে।
ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির (এসএসএনপি) বরাদ্দ বাড়াতে হবে। জলবায়ু বাজেট প্রক্রিয়া প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জলবায়ু বাজেটকে জাতীয় বাজেট প্রক্রিয়ার সঙ্গে আরও ভালোভাবে সংযুক্ত করা এবং জলবায়ু সম্পর্কিত তহবিল ব্যয়ের সামর্থ্য আরও বাড়াতে জনশক্তির সক্ষমতা অপরিহার্য।
চলতি বছরের জলবায়ুর বাজেট প্রসঙ্গে ফাহমিদা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (সিসিটিএফ) শক্তিশালী করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। চলতি বছরের বাজেটে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের আকার ১ হাজার ৪৩৫ কোটি ৯০ লাখ টাকার বেশি। যদিও অষ্টম বার্ষিক পরিকল্পনায় ২০২০-২৫ সালের মধ্যে ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা ৮ হাজার কোটি টাকা থেকে পিছিয়ে আছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে সবুজ জলবায়ু তহবিল (জিসিএফ), গ্লোবাল ইনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএফ) এবং দ্বিপাক্ষিক উৎসসহ আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে জলবায়ুর অর্থায়ন চায়। এই তহবিলগুলো জলবায়ু-সম্পর্কিত প্রকল্প এবং প্রোগ্রামগুলোকে সহযোগিতা করার জন্য ব্যবহার করবে। সর্বাধিক পরিমাণ জলবায়ু তহবিলের অনুমোদন হওয়া সত্ত্বেও ক্লাইমেট ভালনারেবিলিটি ফোরামভুক্ত (সিভিএফ) এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তহবিলের অভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সংকট দেখা যায়। বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় প্রকল্পগুলি তৈরি করা উচিত। প্রজেক্ট ডিজাইনিংয়ের জন্যও সক্ষম উন্নয়ন প্রয়োজন। উন্নত দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোর বেসরকারি খাতের জলবায়ু তহবিলের একটি উল্লেখযোগ্য উৎস। বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের তহবিলের প্রবাহ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন রয়েছে।