থ্রেডস মেটার গেমচেঞ্জার, টুইটারের হুমকি

টুইটারের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নতুন সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ চালু করেছে মেটা। সোশ্যাল জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানটি তাদের নতুন অ্যাপের নাম রেখেছে থ্রেডস। তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেটার নতুন অ্যাপটি শুধু নামে থ্রেডস নয়, এটি সত্যিকার অর্থেই টুইটারের জন্য একটি হুমকি। এই অ্যাপটি নাকি ফেসবুকের মালিকাধীন মেটার জন্য গেমচেঞ্জার হতে পারে। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মালিকানাধীন মেটা নির্ধারিত সময়ের আগে গত ৬ জুলাই নতুন প্ল্যাটফরমটি চালু করেছে। চালুর পরপরই মেটাকে স্বাগত জানান ব্যবহারকারীরা। বিশেষ করে যেসব টুইটার ব্যবহারকারী ইলন মাস্কের হস্তক্ষেপে বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন।

মেটার জন্য সবচেয়ে ভালো খবর, চালুর ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে ৩০ মিলিয়ন ব্যবহারকারী থ্রেডসে যোগ দেন। এর পাশাপাশি তাদের ২ বিলিয়নের বেশি ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী আছে, তারাও সরাসরি তাদের অ্যাকাউন্ট থ্রেডসের সঙ্গে লিঙ্ক করতে পারবেন। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই এটা বলা যায় যে, থ্রেডসের ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে।

মার্ক জাকারবার্গ ৩০ মিলিয়ন নতুন ব্যবহারকারীকে স্বাগত জানাতে থ্রেডসে একটি পোস্টও করেন। থ্রেডস পোস্টগুলোতে ব্যবহারকারীরা উত্তর দিতে পারবেন, লাভ দিতে পারবেন, উদ্ধৃতি ও মন্তব্য করতে পারবেন। তাই বলা যায়, থ্রেডস ও টুইটারের মধ্যে মিলগুলো খুবই সুস্পষ্ট। এখন প্রশ্ন হলো, থ্রেডস কি শেষ পর্যন্ত টুইটারকে সরিয়ে দেবে?

একটু পেছন ফেরা যাক

গত বছরের অক্টোবরে ইলন মাস্ক টুইটারের সিইও হওয়ার পর ব্যবহারকারীরা হতাশ হয়ে পড়েন। কারণ তিনি টুইটার ব্যবহারকারীদের জন্য কিছু নিয়ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। মাস্ক টুইটারের কর্মীদের ছাঁটাই করতে শুরু করেন। তিনি এখন পর্যন্ত টুইটারের মূল কর্মীদের প্রায় ৮০ শতাংশ বরখাস্ত করেছেন। এর অল্প সময়ের মধ্যেই মাস্ক টুইটারের ভেরিফিকেশন সিস্টেম বাতিল করেন। অর্থের বিনিময়ে ‘ব্লু টিক’ নেওয়ার নিয়ম চালুর কথা বলে বেশি আলোচনা ফেলে দেন। যা নিয়ে টুইটারের ব্যবহারকারীরা বিরক্ত প্রকাশ করেন। ফলে অনেক বড় করপোরেট ব্র্যান্ড এই প্ল্যাটফরম ছেড়ে দিয়েছে। খুব সম্প্রতি তিনি ব্যবহারকারীরা কতগুলো টুইট দেখতে পারবেন তা সীমাবদ্ধ করার ঘোষণা দেন। এ ছাড়া আরও কিছু কারণে টুইটারের ব্যবহারকারীরা বিরক্ত ছিলেন। ইলন মাস্কের এই খামখেয়ালিপনার খেসারত টুইটারকে দিতে হবে বলে মনে করছেন টেক বিশেষজ্ঞরা। কারণ, টুইটারের ছাঁটাই কর্মীদের অনেকে এখন মেটাতে কাজ করছেন।

টুইটারের জন্য সবচেয়ে আশঙ্কার খবর হলো অনেক সেলিব্রেটি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা থ্রেডস ব্যবহার করতে শুরু করেছেন। এর মধ্যে আছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ, অপরাহ উইনফ্রে, দালাইলামা, শাকিরা, গর্ডন রামসে এবং এলেন ডিজেনেরেসসহ অনেকে।

কমিউনিটি হচ্ছে সাফল্যের চাবিকাঠি

মাস্কের রাজত্বের আগে অনেক বছর ধরেই সফল ছিল টুইটার। দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিক, সরকার, শিক্ষাবিদ ও সাধারণ মানুষ বিভিন্ন তথ্য শেয়ারে এই প্ল্যাটফরমটি ব্যবহার করেছেন। জরুরি পরিস্থিতিতে টুইটার রিয়েল-টাইম সরবরাহ করে। তাই কিছু দুর্যোগের সময় ব্যবহারকারীরা টুইটারে বিভিন্ন তথ্য শেয়ার করেছেন। যেগুলো মানুষকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছে। টুইটারের পোস্ট যাচাই করার প্রক্রিয়া, অনুপযুক্ত তথ্য ব্লক ও রিপোর্ট করার সুবিধা এর সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। তাই টুইটারে ট্রল, বট ও অনলাইন অপব্যবহারের মতো ভুল ছিল না। এসব বৈশিষ্ট্য টুইটারকে প্রতিযোগীদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। ফলে টুইটারের একটি কমিউনিটি গড়ে উঠেছিল, যা ছিল এই প্ল্যাটফরমটির সাফল্যেও চাবিকাঠি। কিন্তু মাস্কের কিছু সিদ্ধান্তের কারণে ব্যবহারকারীরা কিছুটা বিরক্ত ছিলেন। সেই সুযোগে থ্রেডসকে ইনস্টাগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে মেটা নিজেকে নেতৃস্থানীয় প্ল্যাটফরম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। টুইটারের মতো সুবিধা দিয়ে থ্রেডস ব্যবহারকারীদের আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। তারাও একটি কমিউনিটি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। আর এটিই টুইটারের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় হুমকি।

মেটার থ্রেডস কী?

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ফেসবুকের মালিকাধীন মেটার নতুন সামাজিক মাধ্যম থ্রেডস। মূলত মেটার মালিকাধীন ইনস্টাগ্রাম টিম এই অ্যাপটি বানিয়েছে। যারা থ্রেডস ব্যবহার করবেন তাদের ইনস্টাগ্রামে অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে। থ্রেডস দিয়ে স্ট্যাটাস পোস্ট করা যাবে, অন্যের স্ট্যাটাসে কমেন্ট করা যাবে। আবার ব্যবহারকারীদের সঙ্গে কথাও বলা যাবে। তবে একটি পোস্টের জন্য ৫০০ অক্ষরের বেশি লেখা যাবে না। পোস্টে বিভিন্ন লিঙ্ক, ছবি ও ভিডিও শেয়ার করা যাবে। থ্রেডসে পোস্ট করা স্ট্যাটাস ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতেও দেওয়া যাবে। ইনস্টাগ্রামের ফলোয়াররা থ্রেডসেও তাদের পোস্ট দেখতে পারবেন।

ব্যবহারের নিয়ম

থ্রেডস ব্যবহার করতে হলে আগে ইনস্টাগ্রামে অ্যাকাউন্ট করতে হবে। যাদের আগে থেকে ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট আছে তারা সরাসরি থ্রেডস ব্যবহার করতে পারবেন। থ্রেডসে লগইন করতে ইনস্টাগ্রামের তথ্য লাগবে। থ্রেডস পোস্ট কাস্টমাইজ করা যাবে। মানে কারা পোস্ট দেখতে পাবেন তা ব্যবহারকারী ঠিক করে দিতে পারবেন। ফেসবুকের মতো থ্রেডসেও ব্লক করা, আনফলো করা কিংবা রিপোর্ট করা যাবে।

সামনে চ্যালেঞ্জ

যেহেতু এটি মেটার প্ল্যাটফরম, তাই আরও একটি মেটার প্ল্যাটফরম ব্যবহারে কেউ কেউ আগ্রহী নাও হতে পারেন। কারণ, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা হোয়াটসঅ্যাপে অনেকেই আগে থেকে যুক্ত আছেন। সেখানে নতুন আরেকটি প্ল্যাটফরম জনপ্রিয় করা, কিংবা ব্যবহারকারীদের ধরে রাখা মেটার জন্য চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। থ্রেডস ব্যবহারকারীরা হয়তো মাথায় রাখবেন উভয় প্ল্যাটফরমের ‘বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য অভিজ্ঞতা’। আবার চাইলেই থ্রেডস থেকে বের হওয়া যাবে না। কারণ, থ্রেডস অ্যাকাউন্টটি মুছে ফেলতে হলে ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটি মুছে ফেলতে হবে। তাহলেই কেবল থ্রেডস অ্যাকাউন্টটি মুছে ফেলা সম্ভব হবে। এ ছাড়া মেটা ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোথাও থ্রেডস চালু না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইইউর নতুন ডিজিটাল মার্কেট অ্যাক্ট থ্রেডসের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। এই আইন থ্রেডসের গোপনীয়তা নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। মেটা থ্রেডসকে একটি বিকেন্দ্রীভূত অবকাঠামোর দিকে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে। অ্যাপটির ‘হাউ থ্রেডস ওয়ার্কস’ বিবরণে বলা হয়েছে, ‘থ্রেডসের ভবিষ্যৎ সংস্করণগুলো ফেডিভার্সের সঙ্গে কাজ করবে। ব্যবহারকারীরা ম্যাস্টোডনসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফরমে একে অপরকে অনুসরণ করতে ও ইন্টারঅ্যাক্ট করতে সক্ষম হবেন।’ এর অর্থ ব্যবহারকারীরা থ্রেডসে সাইনআপ ছাড়াই নন-মেটা অ্যাকাউন্ট থেকে থ্রেডস দেখতে ও ইন্টারঅ্যাক্ট করতে পারবেন। তবে থ্রেডস কখন ও কীভাবে বিকেন্দ্রীভূত হবে এবং কীভাবে ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করতে পারে তা এখনো অস্পষ্ট।

মেটা কি ‘ট্রেড সিক্রেটস’ চুরি করেছে?

মাস্ক কিন্তু হাল ছাড়ার পাত্র নন। তিনি লড়াই ছাড়া হার মানবেন না। ইতোমধ্যে তিনি মেটার বিরুদ্ধে ‘ট্রেড সিক্রেটস’ চুরির অভিযোগ তুলেছেন। থ্রেডস চালুর কয়েক ঘণ্টা পর টুইটারের আইনজীবী অ্যালেক্স স্পিরো একটি চিঠি প্রকাশ করে মেটার বিরুদ্ধে ‘অবৈধভাবে বাণিজ্য গোপনীয়তার অপব্যবহারের’ অভিযোগ করেছেন। চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে, মেটাতে নিয়োগ পাওয়া টুইটারের প্রাক্তন কর্মীদের কয়েকজনকে ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ মেটার কপিক্যাট ‘থ্রেডস’ অ্যাপ তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে মেটা এসব দাবি অস্বীকার করলেও দুটি সংস্থার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখনো শেষ হয়নি, মাত্র শুরু হয়েছে।