বৈশ্বিক ক্রান্তিকালে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব

করোনা-উত্তর বৈশ্বিক ক্রান্তিকালের বর্তমান পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ভূরাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক টানাপড়েনে চীন এবং ভারতের মধ্যে অন্তত কৌশলগত কোনো ভারসাম্যকে প্রতিষ্ঠা করাটা খুবই গুরুত্ববহ একটি বিষয় বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। প্রসঙ্গত, বোদ্ধারা মনে করেন যে, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের নিকটবর্তী লক্ষ্যটি দৃশ্যত সমর-রাজনীতির অন্তর্গত হলেও এর দূরবর্তী উদ্দেশ্য কার্যত বিশ্বব্যাপী ডলারের একাধিপত্যকে বিনষ্ট করা। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে ডলারের বিকল্প এক বা একাধিক আন্তর্জাতিক মুদ্রার প্রবর্তনের মাধ্যমে বর্তমান চলমান একরৈখিক বিশ্ববাজার অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা। আর সে প্রেক্ষাপটেই চীন-ভারতের মধ্যে প্রাথমিকভাবে অন্তত পর্দার অন্তরালে হলেও একটি কৌশলগত ভারসাম্যকে প্রতিষ্ঠা করার গুরুত্বটি সামনে চলে এসেছে। কারণ গোটা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই বর্তমানে চীন আর ভারতের অধিবাসী! সুতরাং বিশাল জনসম্পদ আর তাদের আর্থিক লেনদেন বর্তমান বিশ্বে চলমান মার্কিন পরাশক্তি নিয়ন্ত্রিত একরৈখিক বাজার অর্থনীতির স্বেচ্ছাচারিতার প্রেক্ষাপটে উল্লিখিত গুরুত্বটিকে অনুধাবন করা খুবই সহজ একটি বিষয় বটে।

বস্তুত শুধু একরৈখিক অর্থনৈতিক কিংবা বাণিজ্যিক  দৃষ্টিকোণ থেকেই নয় বরং ভূরাজনৈতিক কিংবা সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলেও চীন-ভারতের মধ্যে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য গোটা বিশ্বের চালচিত্রকেই পালটে দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বিশেষ করে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বা কর্র্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রকারান্তরে এশিয়া বা প্রাচ্যের মধ্যযুগীয় লুপ্ত গৌরবটিরই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাটা সম্ভবপর হয়ে উঠতে পারে বলেই বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বিশ্বাস করেন। অন্যদিকে আলোচ্য দুটি দেশের সম্মিলিত সামরিক শক্তির তাৎপর্য বিশ্বের পরাশক্তির সমীকরণকে উলট-পালট করে দেওয়ার সক্ষমতাকেও সংরক্ষণ করে বলে ওয়াকিবহাল মহল মনে করেন।

বিশেষভাবে উল্লেখ্য, কৃষিজ-বনজ-খনিজ-জলজ সম্পদ, পর্যটন বাণিজ্য এবং প্রযুক্তি ও শিল্পায়নে সুলভ জনশক্তির সমাহার ইত্যাদি বহুকিছুর সমন্বয়ে চীন ও ভারত এবং এই দুদেশের সীমান্তবর্তী কিংবা নিকটবর্তী দেশসমূহের একটি সম্মিলিত সম্ভাবনা গোটা বিশ্বেই চমক সৃষ্টিকারী কোনো নেতৃত্বকে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে অসামান্য সম্ভাবনাময় বলেই প্রতীয়মান হয়।

সুতরাং চলমান বিশ্বে মার্কিন মুলুকের কর্র্তৃত্ববাদী ভূরাজনৈতিক, সামরিক ও আর্থসামাজিক একরৈখিক মোড়লিপনার সমান্তরাল কোনো সংঘবদ্ধ শক্তির উত্থান যে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কতটা গুরুত্ব বহন করে, সেটা আর বলার কোনো অপেক্ষাই রাখে না। বিশেষ করে ডলারের প্রতিদ্বন্দ্বী একটি বা দুটি (যেমন ইউয়ান, ইউরো ইত্যাদি) আন্তর্জাতিক শক্তিশালী মুদ্রার উদ্ভব বিশ্বব্যাপী আর্থিক ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তাকে যে অনেকটাই নিশ্চিন্ত করতে পারে, সেটা বলাই বাহুল্য।

এসব প্রেক্ষাপটে চীন ও ভারতের প্রতিবেশী-নিকটবর্তী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং অত্যন্ত দৃঢ়চেতা, আত্মবিশ্বাসী, অভিজ্ঞ নেতা হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উল্লিখিত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অসামান্য সম্ভাবনাময় একটি পরিস্থিতিকে সংরক্ষণ করে চলেছেনÑ এটা বলা যেতেই পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বর্তমান সরকার দৃশ্যত শত্রুভাবাপন্ন চীন ও ভারতকে একইসঙ্গে যেভাবে মিত্রশক্তি হিসেবে নিজ উন্নয়নে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে পারদর্শিতা দেখাচ্ছে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষক মহলের অনেকেই এই নিবন্ধে উপস্থাপিত বক্তব্যটিকে নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নিচ্ছেন।

সর্বোপরি এটা বলা বাহুল্য যে, বিশ্বের ইতিহাসে অদ্যাবধি কোনো কর্র্তৃত্ববাদী শাসক শক্তিই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অনাদিকাল তার মোড়লিপনাকে বজায় রাখতে সক্ষম হয়নি। কারণ দীর্ঘকাল যাবৎ নেতৃত্বে থাকার অবকাশে উল্লিখিত নেতৃত্বের অন্দরমহলে নানাবিধ অবৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা বা ভ্রান্ত  চিন্তাধারার ঝুলকালি প্রাকৃতিক নিয়মেই যেন সৃষ্ট হয়। আর সৃষ্ট এসব ঝুলকালিকে পরিচ্ছন্ন করে চলমান নেতৃত্বকে যথোচিতভাবে সময়োপযোগী করে তোলার যোগ্যতাটি কালের চক্রে একসময় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই যেন ক্ষয়প্রাপ্ত হয়! আসলে সংক্ষুব্ধ জাতি-গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রসমূহের বিশালত্বের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত ক্ষুদ্রতর একটি স্বার্থান্ধ ভোগবাদী বলয় স্বভাবতই একসময় অবরুদ্ধ অবস্থায় পতিত হয়। আর এই অবস্থাকে ব্যবহার করেই মহাকালের দিগন্তে নতুন একেকটি সূচনার আবির্ভাব ঘটে যা ইতিহাসের প্রত্যাবর্তনের স্বতঃসিদ্ধতাকেই প্রমাণ করার জন্যই যেন উন্মুখ হয়ে প্রতীক্ষারত থাকে! 

ভিন্নতর একটি বিবেচনা থেকে এটা বলা যেতে পারে যে, বৃহত্তর চীন-ভারতীয় ভূখ-ের অধিবাসীদের বৃহদাংশ মনন বা চিন্তাচেতনার দিক থেকেও একটি বিশেষ বলয়ে উত্তরাধিকার সূত্রেই বৃত্তবন্দি হয়ে আছে। কারণ বেদ-বেদান্ত, বৌদ্ধ মতাদর্শ, কনফুসীয় নীতিবাদ, তাওবাদ, সুফিবাদ, বৈষ্ণব এবং বিভিন্ন লোকজ উপধারা বা মরমিয়া-সহজিয়া চর্চা ইত্যাদির একটি নিগূঢ় ঐক্যসূত্রে এই অঞ্চলের জনজীবন বিগত কয়েক হাজার বছর থেকেই প্রভাবিত হয়ে চলেছে। সুতরাং অন্তত মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট বিচারে এই ভূখন্ডের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর একটি আত্মিক সংযোগ লোকচক্ষুর অন্তরালে প্রবাহিত হয়েই চলেছে। অর্থলোলুপ সম্ভোগপ্রিয় পশ্চাত্যের জনজীবনের ভাবধারার বিপরীতে উল্লিখিত প্রাচ্যীয় ভাবধারাটি দৃশ্যমান কোনো সুযোগ্য নেতৃত্বের সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টায় এই অঞ্চলের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্ববহ একটি নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে বলে বিশ্বাস করা যায়।

সবশেষে এ কথা বলা যেতেই পারে যে, বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করার মধ্য দিয়ে তৎকালীন প্রেক্ষাপটে তৃতীয় বিশ্ব থেকে উত্থিত অসামান্য দৃষ্টান্তমূলক নেতৃত্বের সম্ভাবনাটিকে একদা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তে অকালেই বিনাশ করা হয়েছিল। আজ প্রায় অর্ধশত বছর পর নিয়তির পক্ষ থেকেই ক্ষতিপূরক কোনো প্রতিবিধান হিসেবেই যেন বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনাকে সেই একই সম্ভাবনার উজ্জ্বলতায় বর্তমান ক্রান্তিকালের বৈশ্বিক মঞ্চে সমুপস্থিত করা হয়েছে! এখন দেখা যাক মহাবিশ্বের অদৃশ্যমান নিয়ন্ত্রক প্রভুত্বকারী অস্তিত্ব কোন পরিণামকে তার জন্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে রেখেছে! তবে সৌভাগ্য সাধারণত দুঃসাহসী নেতৃত্বের কোনো অভিযাত্রাকে বরণ করে নেওয়ার জন্য মহাকালের বাঁকে বাঁকে সাগ্রহে অপেক্ষারত থাকে! আর এটাই বাঙালির আশার প্রদীপকে দেদীপ্যমান করে তুলেছে।

লেখক: আইনজীবী ও চিন্তাবিদ