তার সঙ্গে পরিচয় সম্ভবত আজকের কাগজে থাকতে। তখন আমি জনকণ্ঠে। ছোটখাটো, কৃষ্ণবর্ণের শীর্ণ মানুষ। যখনই দেখা হয়েছে, মুখ চেপে হাসি দিয়ে, হালকা দাঁত বের করে বলতেন কেমন আছেন দাদা? বাড়িয়ে দিতেন হাত। দেখা হলেই বলেছি ভাই, আমাকে তো দিলেন না! কথাটার অর্থ তিনি জানতেন। বলতেন দিমুনি! দিলেই তো শ্যাষ! তখন কী চাইবেন? হাহাহা। আসেন চা খাই। আপনার সঙ্গে জরুরি একটা কথাও আছে?
সেটা এম. এ কুদ্দুসের ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নে প্রথমবার সহসভাপতি হিসেবে নেতৃত্বে আসার সময়ের কথা। জানালেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন। সেই সময় চাকরি করতেন দৈনিক সংবাদে। এমন কথা শুনে বললাম আপনার চারদিকে এত টাকার ছড়াছড়ি, এর মধ্যে পারবেন? তিনি বললেন আপনে প্রথমে আমারে ‘তুমি কইরা বলবেন? হাহাহা। তারপর কথা বলুম। আমি আপনার অনেক ছোট। আর নির্বাচনের কথা বলতাছেন? ঐটা হইবো। দেইখেন ক্যামনে হয়। মনে রাইখেন, সবকিছু টাকা দিয়া হয় না! এরপর ইউনিয়ন অফিসে গেলে প্রায় সময়ই তাকে পেতাম। হয় অফিসের ভেতরে, না হলে ইউনিয়নের বাইরে গাছতলায়। প্রেসক্লাবের ব্যাডমিন্টন মাঠের কোনাকুনি বরাবর, যে রাস্তাটা ব্যাংকের দিকে গেছে সেখানে একটা সিমেন্টের গোল পাইপ রয়েছে। তার ওপরে তিনি বসতেন। প্রায় সময় ওখানেই পাওয়া যেত। নির্বাচিত হওয়ার পরও, কেবল মিটিং ছাড়া, ওখানেই বসতেন। আর দুপুরে খাবারের সময় চলে যেতেন প্রেসক্লাবের ভেতরে। সারাদিন আড্ডা শেষে, পড়ন্ত বিকেলে চলে যেতেন সংবাদ অফিসে। একদিন দুপুরবেলার ঘটনা। বসে আছি ইউনিয়ন অফিসে। বেজে উঠল মোবাইল ফোন। স্ক্রিনে দেখলাম কুদ্দুস কার্টুন নাম! কারণ মোবাইলে রয়েছে, তিনজন কুদ্দুস। এর মধ্যে প্রথমজন কুদ্দুস আফ্রাদ। যিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি। আরেকজন বন্ধু।
ফোন রিসিভ করতেই বললেন কই আপনে?
ইউনিয়ন অফিসে?
বসেন। আসতেছি। আমি পাইপে বইসা আছি।
না না, আপনে থাকেন। আমিই আসতেছি। ওখানে যাওয়ার পর বললেন চা খাবেন? না, ভাই। চলে যাব। জরুরি কাজ আছে।
অফিসে যাবেন?
না। এখন আর ধানমন্ডি যাব না।
হ, আপনের তো সুখের চাকরি। ইচ্ছা হইলে যান, নইলে যান না। হাহাহা। শোনেন, জরুরি কথা আছে। আমি একটা কার্টুন আঁকছি। এইবার নির্বাচনে সিনিয়র সহসভাপতি হিসাবে আমার পোস্টার, এইটাই ক্যাম্পেইন! আর একটা ছোট কার্ড করছি। এই যে...। তিনি বুক পকেট থেকে কয়েকটি কার্ড দেখালেন। বললেন যা আছে, কপালে। নামছি তো নামছি! আপনের পোর্টেট কিন্তু পাইবেন! আঁকতাছি...।
ছবি কোনটা নিছেন?
নিছি একটা, ফেসবুক থেকে। যেটা ভাল্লাগছে। ফিনিশিং বাকি আছে।
এরপর আপনেরে দিমু। আপনে কিন্তু আমারে দেবেন ৭০ ভোট! হাহাহা।
অবাক হয়ে বললাম এত ভোট পাবো কোথায়?
তিনি দাঁত বের করে হাসলেন। বললেন বিটলামি কইরেন না?
আপনে ২০০০ সালে ছিলেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির (বাচসাস) সাধারণ সম্পাদক। আমি কিছু জানি না? আমাদের ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নে আপনার বন্ধু আর শিষ্যই তো আছে কমপক্ষে ২০০! আর প্রেসক্লাবের কথা বাদই দিলাম। সেইখানে চাইছি মাত্র ৭০টা!
আচ্ছা, দেখি পারি কিনা? এই বলে চলে যাচ্ছিলাম। তিনি হাত ধরলেন। বললেন আমি কিন্তু আপনেরে ভীষণ শ্রদ্ধা করি, ভালোবাসি।
জানি তো! আমারও ভীষণ পছন্দের মানুষ আপনি। ঠিক আপনি না, আপনার হাসি! দুজনেই হাসতে থাকলাম। বললাম দৈনিক সংবাদ ছেড়ে ইত্তেফাকে গেলেন। আবার সংবাদে ফিরে এলেন ক্যান? ভাল্লাগে না!
... বেশ কিছুদিন পর। তখন নির্বাচন শেষ। নতুন নেতৃত্ব এসেছে, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নে। কুদ্দুস হয়েছেন, সিনিয়র সহসভাপতি। আমাকে দেখেই জড়িয়ে ধরলেন। অনেক কথা বললেন। এও বললেন একটা সমস্যা হইছে। নতুন সদস্য নিয়া। এইভাবে তো সদস্য পদ দেওয়া যাইবো না। গত কমিটি যে পদ্ধতিতে সদস্য চূড়ান্ত করছে, তা গঠনতান্ত্রিক না। যে কারণে, নির্বাচিত নেতাদের কয়েকজনকে নিয়া একটা রিভিউ কমিটি হইছে। তারা যাচাই-বাছাই কইরা দেখার পর, সদস্য চূড়ান্ত করবো। তখন হইবো।
এটা কবে হবে?
নির্বাচনের আগে।
কাউকে বাদ দেবেন?
যোগ্যতার মধ্যে না থাকলে তো, বাদ পড়বোই।
সমস্যা হতে পারে। তাদের কাছে, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের প্যাডে সভাপতি স্বাক্ষরিত নতুন সদস্য হিসেবে অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। নতুন সদস্যরা বাড়তি টাকা ব্যাংকে জমা দিয়ে ব্যাংক রসিদসহ সেই চিঠি সংগ্রহ করেছেন। এখন নতুন কিছু করতে গেলে, আইনের ফাঁকে পড়তে পারেন। সেই দিকটা মাথায় রাখবেন। ইউনিয়ন যেন কোনোভাবেই আদালতের বারান্দায় দৌড়াদৌড়ি না করে। এটা সাংবাদিক সমাজের জন্য লজ্জাজনক। বললাম, বাদ দেন এসব। অনেক দিন হাসপাতালে ছিলেন। হার্টে সমস্যা আছে আপনার। এসব নিয়া বাড়তি চিন্তা করার দরকার নাই। গঠনতান্ত্রিকভাবে যা হওয়ার, তাই হবে।
কে জানতো, এটাই শেষ কথা? গত শনিবার সকালে চমকে উঠলাম! দেখলাম, ফেসবুকের নিউজফিড ভেসে যাচ্ছে কুদ্দুসের মৃত্যু সংবাদ জানিয়ে। মুহূর্তেই অন্য এক কুদ্দুসের ছায়া ভেসে উঠল মনের পর্দায়। ভীষণ মায়ামাখা মুখে তিনি যেন বলছেন দাদা, আমারে শেষ দেখাটা দেখতেও প্রেসক্লাবে আইবেন না!
না, কুদ্দুস আমি আপনজনের হীমশীতল মুখ সহ্য করতে পারি না। তাই দেখি না। মনের ভেতরে বেঁচে থাক, প্রাণোচ্ছল জীবন্ত মানুষ। যেভাবে আপনাকে মনে থাকবে, আমৃত্যু। এক সমুদ্দুর ভালোবাসা, আত্মাপ্রিয় স্বজন...!
লেখক : সাংবাদিক