পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ইলেকশন নিয়ে আগাম যা লিখেছিলাম, মোটামুটি তার সবটুকুই মিলে যাওয়ায়, আনন্দ পেতে পারতাম কলমচি হিসেবে। কিন্তু যে আশঙ্কা করে বলেছিলাম যে এবার সংখ্যালঘু ভোট শিফট হবে। অনেক জায়গায় শাসকদলের ভোট লুট আটকাতে গণপ্রতিরোধ হবে। ফলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অনেক মানুষের প্রাণ যেতে পারে। অক্ষরে অক্ষরে তা মিলে গেছে। বিপুলসংখ্যক নিরীহ মানুষ খুন হয়েছেন। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। একুশ শতকের পৃথিবীতেও যদি তথাকথিত ‘গণতন্ত্রের স্বার্থে’ গরিবের এমন জীবন দিতে হয় তা সত্যিই বর্বরতা।
মুশকিল হচ্ছে, এই বর্বরতা চোখের সামনে ঘটে যাওয়ার পরও অনেক তথাকথিত ইন্টেলেকচুয়ালরাও যুক্তিতর্ক করে ব্যাপারটাকে লঘু করে দেখাতে ব্যস্ত। আর রাজনীতিবিদদের কথা যত কম বলা যায় তত ভালো। এক এক সময় মনে হয় আজকের এই গ্রেট পলিটিশিয়ানদের চামড়া এতটাই মজবুত যে, গন্ডার সেখানে নিতান্তই শিশু। কিন্তু কিছু করার নেই। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলে যে সিস্টেম বছরের পর বছর চলে আসছে তা যত ঘুণ ধরুক না কেন, আমরা পরম যতেœ তার গুণকীর্তন করে যাব। সিস্টেম নিয়ে প্রশ্ন তুললে আপনি দেশবিরোধী, রাষ্ট্রদ্রোহী। এ এমন এক সিস্টেম, যেখানে আপনার দৈনন্দিন নানা কাজে বাধ্য হয়ে এমন রাজনীতিবিদের কাছে যেতে হবে, অন্য সময় হলে তার নাম শুনলে আপনার ঘেন্না হতো। পাওয়ার পলিটিকসের যুগে, আদ্যন্ত ভোগবাদী এই সমাজে সবার ওপরে ক্ষমতা সত্য, তাহার ওপরে নাই।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে এটা পরিষ্কার যে, শাসক দল পুরোপুরি গা জোয়ারি, ছাপ্পা ভোট, প্রশাসন, পুলিশকে কাজে লাগিয়ে পঞ্চায়েত দখল করেছে। কখনো কখনো, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তৃণমূল কংগ্রেস ভোট রিগিংয়ে সর্বকালের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। মমতা ব্যানার্জির সরকার নিঃসন্দেহে বেশ কিছু জনমুখী প্রকল্প সারা বছর চালালেও জনগণের ওপরে আস্থা এত কম যে, বিরোধী শূন্য রাজ্য করতে তাদের গা জোয়ারি পথ না ধরলে চলে না।
পুলিশ সবসময় শাসক অনুগত। এবারও সে তাই ছিল। আর ছিল কেন্দ্রীয় বাহিনী। নির্বাচনের আগে থেকেই বিরোধী দল কেন্দ্রীয় বাহিনী চাই বলে যেভাবে উদ্বাহু নৃত্য করছিল, আর কোনো না কোনোভাবে তাকে ঠেকাতে সরকার পক্ষ কোর্টে যাচ্ছিল, তাতে সাধারণ মানুষের ধারণা হচ্ছিল যে, সত্যিই বোধহয় কেন্দ্রীয় ফোর্স এলেই একমাত্র সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। বাস্তবে দিল্লি বাহিনী সব বুথে ছিল না। থাকলেও তাদের কোনো সক্রিয় ভূমিকা অন্তত এবারের ভোটে দেখা যায়নি। ফুটবল বা ক্রিকেটেও ম্যাচ গড়া-পেটা হয়। এ দেশেও কখনো কখনো কেন্দ্র-রাজ্য গড়া-পেটা হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তা ছাড়া মেঠো তর্জন-গর্জন বাদ দিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য দুপক্ষের দরদ যখন হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি, তখন গট আপ না থাকাটাই তো আশ্চর্যের।
একজন-দুজন নয়, খুব ভুল না বললে এবার পঞ্চায়েত নির্বাচনে মারা গেছেন অন্তত পঞ্চান্নজন অতি সাধারণ লোক। যাদের মধ্যে শাসকদলের লোকের সংখ্যা কম নয়। আমরা দিনে দিনে এমন অসংবেদনশীল হয়ে পড়ছি, এত মৃত্যু এখন নিতান্তই সংখ্যা মাত্র। এত পরিবারে অন্ধকার নেমে আসার পরও টিভিতে আমাদের বিজ্ঞানীদের পারস্পরিক দোষারোপ অব্যাহত। গত চৌত্রিশ বছরে কেমন পরিস্থিতি ছিল, এখন কত ভালো তা নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা থেকে অন্যান্য রাজ্যের চেয়ে পশ্চিমবঙ্গ কত চমৎকার রয়েছে, এসব তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ চলছে। চলতেই থাকবে। শুধু গরিব পরিবারগুলো সারা জীবন হাহাকার নিয়ে বেঁচে থাকবে। আঙুল তোলা হয় মাওবাদীদের দিকে, তারা সহিংস আন্দোলনে বিশ্বাসী বলে। আমাদের কোনো গণতান্ত্রিক, আদর্শবাদী, অহিংস রাজনীতিক আছেন, যিনি বুক ঠুকে বলতে পারেন যে তার হাতে রক্ত লেগে নেই! কোনো বুদ্ধিজীবী আছেন যিনি সরাসরি দেশের সর্বত্র যে চরম স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামবেন!
এবার দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ভাঙ্গর এলাকায় নির্বাচনের আগে বা পরে যা হয়েছে তা ফ্যাসিস্ট আচরণ ছাড়া আর কোনো ভাষায় ব্যাখ্যা করব বুঝে উঠতে পারছি না। আমি যদি তর্কের খাতিরে মেনেও নিই যে, গন্ডগোলের পেছনে বিরোধী দলের ইন্ধন ছিল, সেটা তো কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কিন্তু শাসকদের ভূমিকা কি ছিল তা তো জলের মতো পরিষ্কার। নমিনেশন জমা দেওয়া থেকে ভোটের দিন, আরও ভয়ংকর নির্বাচিত প্রতিনিধিকে জোর করে হারিয়ে দেওয়ার অভিযোগ। সবাই দেখেছেন কোথাও কোনো গোলমাল হলেই পুলিশ নির্লজ্জভাবে কেমন পক্ষপাত করে গণতন্ত্রকে ধর্ষণ করেছে। যে পশ্চিমবঙ্গ বুদ্ধিচর্চায় সারা দুনিয়ার কাছে শ্রদ্ধা অর্জন করে এসেছে চিরটাকাল, সে ধীরে ধীরে যেভাবে অন্ধকারের দিকে চলেছে তা ভাবলে দুঃখ হয়।
এর আগে বহুবার বলেছি যে, সংখ্যালঘু ভোট নিশ্চিত শিফট হবে। এবারের যাবতীয় অরাজকতার মধ্যেও মুর্শিদাবাদে, কিছু মালদা, দিনাজপুর, দুই চব্বিশ পরগনায় বিরোধী বাম, কংগ্রেস, আইএসএফ বেশ কিছু জায়গায় ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের গ্রাম ও সমিতি জিতেছে। জেলা পরিষদ পাবে না বলাই বাহুল্য জানতাম। পায়নিও। যেভাবে বামেদের নিশ্চিহ্ন করার কথা বলা হচ্ছে এবং বিজেপিকে প্রধান বিরোধী দল বলে বলা হচ্ছে, ব্যাপারটা সত্যিই তা নয়। বিজেপি এবার কিছু না হোক, ষোলো শতাংশ ভোট হারিয়েছে। বামেদের ভোট শতাংশের হিসেবে বেশ বেড়েছে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে, বিজেপির ভোট কমে কাদের বাক্সে পড়ল! আমার ধারণা তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে গেছে। বামেদের বাড়তি ভোট এসেছে মূলত তৃণমূল থেকে। তৃণমূল তাত্ত্বিকভাবে অনেক সময় বোঝাতে চেষ্টা করেন যে, তৃণমূল মূলত সাবঅলটার্ন পার্টি। তৃণমূলের এই তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণে পুরোপুরি কৃতিত্ব নকশালপন্থিদের বড় অংশের। শত্রুর শত্রু আমার মিত্র এই তত্ত্বজ্ঞানে তাদের জাতশত্রু সিপিআইএমের বিরুদ্ধে, তারা মমতাপন্থি। মুশকিল হচ্ছে জেলাওয়ারি যেটুকু যা ভোট বামেরা জিতেছে তা কোন উচ্চবর্গ থেকে এসেছে এর কোনো ব্যাখ্যা কখনো পাই না। প্রলেতারিয়েতের সঙ্গে লুম্পেন প্রলেতারিয়েতের ফারাক নিয়ে লেনিনীয় ব্যাখ্যায় অধিকাংশ অতি বামেদের অনাস্থা বেশ রহস্যময়। পাশাপাশি গ্রামশি রাষ্ট্রীয় হেজিমনি প্রশ্নে যে নিম্নবর্গীয় দ্রোহের কথা বলেছিলেন তার সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের বাহিনীর সম্পর্ক ঠিক কোথায় আজ অবধি তা মাথায় ঢুকল না।
এত সব লিখছি দুটো কারণে। এক. পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিসরে বিতর্ক পুরোদস্তুর ভ্যানিস হয়ে গেছে। যা গণতন্ত্রের পক্ষে যথেষ্ট উদ্বেগের। দুই. তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক অভিমুখ ঠিক কোনদিকে তা জানতে চাওয়া। জনমুখী কর্মসূচি কিছুদিন নিশ্চিত জনপ্রিয় হতে পারে। কিন্তু কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান সে করতে পারে না। কৃষি নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের নির্দিষ্ট ভাবনা আজও স্পষ্ট নয়। তৃণমূলের আর এক সংকট তার অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী কোন্দল। স্থিতাবস্থায় যা ওপর ওপর মনে হচ্ছে, আগামী কোনো সময় নিশ্চিত তা বড় জটিলতা ডেকে আনবে।
আর বামেদের যদি ফের ক্ষমতায় ফিরতে হয়, তবে নিশ্চিতভাবেই ঔদ্ধত্য, গোষ্ঠীবাজি, সংকীর্ণ মানসিকতা, ইডি, সিবিআইকে পূজা করা বন্ধ করে, আগে কী কী ভুল ছিল তা অকপটে মেনে নিয়ে নিবিড় জনসংযোগে মন দিতে হবে। গণ-আন্দোলন ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। মনে রাখতে হবে, এবার নিশ্চিত অনেক জায়গায় তৃণমূল সন্ত্রাস করে জিতেছে। সব জায়গায় কিন্তু নয়। সেসব জায়গায় হার নিয়ে বিশ্লেষণটাও কিন্তু জরুরি।
লেখক: প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক
sdastidar27@gmail.com