আইনের আবছায়া

মানবসভ্যতার যত পরিবর্তন হয়েছে, একটি দেশের আইনও ঠিক সেভাবেই এগিয়েছে। পৃথিবীর সব রাষ্ট্রে বিভিন্ন জাতির মধ্যে যেসব আইন রয়েছে, তা মেনে চলতে একজন নাগরিক বাধ্য। আবার অনেক উপজাতি বা আদিবাসী রয়েছে, যারা নিজস্ব কিছু নিয়ম-রীতি অনুযায়ী পরিচালিত হয়। সেখানে রাষ্ট্রীয় আইন শতভাগ ব্যবহৃত হয় না। কোনো দেশের সরকারও সে ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে না। কিন্তু আদিবাসীর বাইরে যে বৃহৎ জনগোষ্ঠী রয়েছে, তারা নিজ নিজ দেশের আইন মানতে বাধ্য। সেটা দেশের সংবিধানেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।

সমাজ-সংসারের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা নিয়ন্ত্রণের জন্য নানা ধরনের আইনের দরকার। সেখানে দেশের সার্বভৌমত্ব, জননিরাপত্তা, সম্পর্ক বিবাহ-পরিবার, অভ্যন্তরীণ অপরাধ দমন এবং বিভিন্ন বিষয়ে আইনের প্রয়োজন। সময়ের সঙ্গে সংগতি রেখে সব সময় আইন পরিবর্তিত হয়ে এসেছে। এটাই স্বাভাবিক। সময় যেমন চলমান, ঠিক তেমনটি আইনও। যে কারণে দেখা যায়, বিভিন্ন দেশে ক্রমাগত পরিবর্তিত হতে থাকে আইন, যা একেবারেই স্পষ্ট। সেখানে আইনের বাক্যের কোনো আবছায়া বা অস্পষ্টতা নেই। একই সঙ্গে সমাজে শুরু হয় এর প্রয়োগ। কিন্তু আমাদের দেশে হচ্ছে অনেকটাই তার বিপরীত। দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিষয়টি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

অসংগতিপূর্ণ ধারা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে মামলা, রুল হলেও অনেক ক্ষেত্রে নিষ্পত্তির বিষয়টি উদ্যোগহীনতায় আটকা পড়ে। অসংগতি ও অস্পষ্টতা আছে বিভিন্ন আইনের অন্তত ১৮টি ধারা পর্যালোচনা করে উচ্চ ও অধস্তন আদালতের বেশ কয়েকজন আইনজীবী মনে করেন, ১৬৩ বছরের পুরনো দণ্ডবিধি, ১২৫ বছর আগের ফৌজদারি আইন ও দেড়শ বছরের পুরনো সাক্ষ্য আইনে দেশের আদালতগুলোতে বিচার কার্যক্রম চলে। সংগত কারণেই পুরনো আইনের সংস্কার, সংশোধন বা পরিমার্জন করে আইনগুলো আরও যুগোপযোগী ও যান্ত্রিকতামুক্ত করার তাগিদ আসে।

কিন্তু বিভিন্ন ধরনের বিতর্ক ও প্রশ্ন উঠেছে, জনগুরুত্বপূর্ণ এমন বেশ কিছু আইনের সংশোধন বা পরিবর্তনের তাগিদ দিয়ে উচ্চ আদালতের দেওয়া রায় কিংবা আদেশ বাস্তবায়ন হয়নি, তা নিয়ে। এই না হওয়ার পেছনে মূলত কী কাজ করছে, তা আমাদের জানা নেই। তবে এ কথা বলা যায়, মানুষের প্রয়োজনে আইন। পুরনো আইনের সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন আইন। কিন্তু অনেক আইনি ধারার অস্পষ্টতা, অসংগতির পাশাপাশি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি নিয়ে আপত্তি ও প্রশ্ন উঠলেও, তা সমাধান হয় না।

এখনো চূড়ান্ত হয়নি, ১৯৯৯ সালের মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কিছু ধারা, ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার ও ১৬৭ ধারা অনুযায়ী রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ নিয়ে বিতর্ক, ছেলেশিশু, পুরুষ ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি অহরহ যৌন নির্যাতনের শিকার হলেও দণ্ডবিধিতে ধর্ষণ সম্পর্কিত সাজার আইনে সুস্পষ্ট অপরাধ বিষয়ে উল্লেখ, গর্ভের সন্তান বৈধ নাকি অবৈধ, তা বিচার-সংক্রান্ত সাক্ষ্য আইনের ১১২ ধারার বৈধতা নিয়ে ২০২০ সালের ৯ মার্চ রুলের নিষ্পত্তি, শ্রমিকের স্বার্থ সুরক্ষায় ২০০৬ সালে হয় শ্রম আইন এসব আইনের বিভিন্ন ধারার অসংগতি এবং অস্পষ্টতাসহ নানাবিধ আইন বিষয়ে সুনির্দিষ্ট লিখিত কোনো রায়ের প্রয়োগ এখনো হয়নি। এ বিষয়ে সংসদ সদস্যদের একান্ত উদ্যোগ দরকার। আইনের স্থবিরতা কেউ প্রত্যাশা করে না।