নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী ১৯ জুলাই। দেখতে দেখতে অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেল। ২০১২ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। এখন অমর একুশে বইমেলায় হুমায়ূন আহমেদের সবান্ধব উপস্থিতি নেই। কিন্তু রয়ে গেছে তার গল্প-উপন্যাসগুলো। লেখকের মৃত্যুর পর সাধারণত বইয়ের বিক্রি কমে আসে। নতুন বই না থাকাটা এর একটা কারণ। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। এখনও বিক্রির শীর্ষে রয়েছে তার বই। অন্তত প্রকাশকদের তেমনই দাবি।
হুমায়ূন আহমেদের বিভিন্ন ধরনের প্রায় ৩৫টি বই প্রকাশ করেছে সময় প্রকাশন। প্রথম যে উপন্যাসটি তারা বাজারে এনেছিল তার নাম ‘আশাবরী’। তবে প্রকাশনীটির সবচেয়ে বিক্রি হওয়া বইয়ের তালিকায় রয়েছে ‘মিসির আলি! আপনি কোথায়?’।
সময় প্রকাশনীর কর্ণধার ফরিদ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, হুমায়ূন আহমেদের বই এখনও বেস্টসেলার। তবে এখানে বিষয়টি ব্যাখার প্রয়োজন আছে। নতুন বইয়ের সঙ্গে পুরনো বইয়ের বিক্রির তুলনা হয় না। বেশ কিছু কারণে নতুন বই বেশি বিক্রি হয়। কিন্তু বই যখন পুরনো হয়ে যায়, সেটা হিসাব করলে হুমায়ূন আহমেদের বই বেশি বিক্রি হয়।
বর্তমানে জনপ্রিয় সাহিত্যিকদের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন সাদাত হোসাইন, কিঙ্কর আহ্সান, আশীফ এন্তাজ রবির মতো বেশ কয়েকজন লেখক। তাদের বইয়ের বিক্রি কি হুমায়ূন আহমেদের চেয়ে বেশি?
ফরিদ আহমেদ জানান, এটা সামগ্রিক হিসাবে বলতে হবে। তবে আমি মনে করি, এখনও বাংলাদেশের বেশিরভাগ নতুন বইয়ের চেয়েও হুমায়ূন আহমেদের পুরনো বইয়ের বিক্রি বেশি। তালিকায় এর পরেই থাকবেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল।
হুমায়ূন আহমেদের প্রায় ১২০টি বই প্রকাশ করেছে অন্যপ্রকাশ। ‘রূপার পালঙ্ক’ দিয়ে জনপ্রিয় এই লেখকের সঙ্গে যাত্রা শুরু করেছিল প্রকাশনীটি।
অন্যপ্রকাশের কর্ণধার মাজহারুল ইসলাম জানান, ‘রূপার পালঙ্ক’ অন্যপ্রকাশ থেকে বেরোনো হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া বই। এরপরেই রয়েছে তার শেষ উপন্যাস ‘দেয়াল’ ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘জোছনা ও জননীর গল্প’। বইগুলো পাঠকরা এখনও আগ্রহ নিয়ে পড়ছেন।
শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গেও হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের অন্যরকম গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বলে জানান মাজহারুল ইসলাম।
তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের বুকসেলফে বাংলাদেশের লেখকদের বই ঢুকেছে হুমায়ূন আহমেদ দিয়ে। এখন আরও অনেকের বই পড়ছেন তারা।
মৃত্যুর পর হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের বিক্রি কমেছে কি না জানতে চাইলে মাজহারুল ইসলাম বলেন, হুমায়ূন আহমেদ নেই ১১ বছর হয়ে গেল। সামনে এক যুগ হবে। কিন্তু তার বইয়ের বিক্রি কমেনি। তিনি সব সময় বলতেন, তার মৃত্যুর পর যেন অন্তত ১০ বছর পাঠকরা তার বই পড়েন। আমরা জানতে চাইতাম কেন আরও বেশি বছর চাইছেন না। তিনি বলতেন, যে লেখকদের বই মৃত্যুর ১০ বছর পরেও পাঠকরা পড়েন, সেই লেখকরা আরও ৩০-৪০ বছর টিকে থাকেন।
হুমায়ূন আহমেদের প্রায় ১৩টি বই প্রকাশ করেছে পার্ল পাবলিকেশন্স। প্রকাশক হাসান জায়েদী তুহিন জানান, তাদের প্রকাশনী হুমায়ূন আহমেদের প্রথম যে উপন্যাসটি বের করে তার নাম ‘ছায়াবীথি’। বইটির বিক্রি এখনও কমেনি। এছাড়া হিমুসহ অন্যান্য বইগুলো সারা বছরই বিক্রি হচ্ছে। ফলে বলা যায় তিনি এখনও জনপ্রিয়।
১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে মাতামহের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ূন আহমেদ। তার বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ এবং মা আয়েশা ফয়েজ। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন সবার বড়। রচনার ব্যাপ্তি, বিষয়ের বৈচিত্র্য, চরিত্র নির্মাণ, রচনাশৈলী, সংলাপ প্রভৃতি মিলিয়ে এক অভিনব ধারা সৃষ্টি করেছিলেন তিনি।
১৯৭২ সালে ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদের আবির্ভাব। তার দ্বিতীয় উপন্যাস শঙ্খনীল কারাগার। গল্প, উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, শিশুতোষ গ্রন্থ, নাটক, প্রবন্ধ, আত্মজৈবনিক রচনা প্রভৃতি মিলিয়ে তার গ্রন্থের সংখ্যা তিন শতাধিক।
সৃজনশীলতার স্বীকৃতিস্বরূপ হুমায়ূন আহমেদ বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮১), মাইকেল মধুসূদন দত্ত পুরস্কার (১৯৮৭), হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯০), একুশে পদক (১৯৯৪), শেলটেক পুরস্কার (২০০৭) ইত্যাদি।