ডেঙ্গুর বদলে যাওয়া ধরনে উদ্বিগ্ন চিকিৎসকরা

রাজধানীর মহাখালীর দক্ষিণ সিটি করপোরেশন হাসপাতালের তৃতীয় তলায় ব্লক-ডি’র ৫০ নম্বর শয্যায় চিকিৎসাধীন মিমি খাতুন। বয়স ৩০ বছর। এসেছেন মহাখালীর টিবি গেট এলাকা থেকে। প্রচণ্ড জ্বর আসে। টেস্টে ডেঙ্গু ধরা পড়ে। ভর্তি হন হাসপাতালে।

তখন রক্তে প্ল্যাটিলেট বা অনুচক্রিকা ছিল ১ লাখ ৭৯ হাজার। হাসপাতালে ভর্তির দুদিন পর জ্বর সেরে যায়। কিছুটা সুস্থবোধ করেন তিনি। কিন্তু জ্বর ছাড়ার দুদিন পর হঠাৎ তার রক্তে প্ল্যাটিলেট কমে ৪০ হাজারে নেমে আসে। আগের চেয়েও জটিল হয়ে পড়েন তিনি।

একই রকম উপসর্গ দেখা গেছে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মানিকনগরের শিশু হোসাইনের ক্ষেত্রেও। বয়স ১০ বছর। ৭ তলার মেঝেতে চিকিৎসাধীন। ৫ দিন জ্বর থাকার পর টেস্টে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। তখন রক্তে প্ল্যাটিলেট ছিল ১ লাখ ৯৫ হাজার। হাসপাতালে ভর্তির দুদিনের মধ্যে জ্বর সেরে যায়। কিন্তু তার একদিন পর হঠাৎ প্ল্যাটিলেট কমে ২২ হাজারে নেমে আসে।

মেঝেতে শোয়া শিশুর চোখের পাতা ফুলে গেছে। ঠোঁটে র্যাশ। জ্বর সেরে যাওয়ার পর ও রোগী যখন কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠেন, তখন হঠাৎ করেই রক্তে প্ল্যাটিলেট কমে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন চিকিৎসকরাও। এই দুই হাসপাতালের চিকিৎসকরা এই ধরণের উপসর্গকে এবার ডেঙ্গুর নতুন ধরন বলে মনে করছেন।

রোগীর রোগের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে চিকিৎসকরা দেখেছেন, আগে জ্বরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রক্তের প্ল্যাটিলেটও বাড়তো। জ্বর সেরে গেলে প্ল্যাটিলেট কমতো। কিন্তু এবার হচ্ছে উল্টোটা। জ্বর সেরে যাওয়ার পর রোগীরা যখন কিছুটা স্বস্তিবোধ করছেন, ঠিক তখনই প্ল্যাটিলেটের মাত্রা উদ্বেগজনক হারে কমছে ও রোগী জটিল হয়ে যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নিয়াতুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, জ্বর সেরে যাওয়ার পর দ্বিতীয় ফেসে প্ল্যাটিলেট কমে যাচ্ছে। এই সময় ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে। তাই জ্বর চলে যাওয়ার পরের পিরিয়ডটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। সে ক্ষেত্রে জ্বর সেরে যাওয়ার ২৪-৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত রোগীদের খুবই সতর্ক থাকতে হবে। যারা হাসপাতালে ভর্তি থাকবেন, তাদের চিকিৎসকরা পরামর্শ দেবেন। আর যারা বাড়িতে থাকবেন, তারা চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন। উপসর্গগুলো চিকিৎসককে বলবেন। তখন আরও কিছু পরীক্ষা করে চিকিৎসকরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

এই চিকিৎসক আরও বলেন, এবার ডেঙ্গুর চরিত্র পরিবর্তন হয়েছে। উপসর্গ বদলে গেছে। আমরা জানতাম যে জ্বর, মাথা ব্যথা, অস্থিগুলোতে প্রচণ্ড ব্যাথা হলেই ডেঙ্গু হয়। কিন্তু এবার এসব উপসর্গ প্রথমবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে। যারা দ্বিতীয়বার বা তৃতীয়বার আক্রান্ত হচ্ছে, তারা অস্বাভাবিক উপসর্গ নিয়ে আসছে। যেমন- জ্বর আসার দুই-একদিনের মাথায় জ্বর সেরে যাচ্ছে। এরপর ডায়রিয়া দেখা দিচ্ছে। বমি বন্ধ হচ্ছে না। হঠাৎ করেই প্ল্যাটিলেট কমে যাচ্ছে। এমনকি আট-নয় মাসের গর্ভবতী নারীদেরও গাইনোলজিক্যাল উপসর্গের পাশাপাশি অচেনা কিছু উপসর্গ দেখা দিচ্ছে।

এই দুই হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শুধু প্ল্যাটিলেটের এই রকমফেরই নয়, এবার অধিকাংশ রোগী জটিলতা নিয়ে আসছে। রোগীদের বেশির ভাগ দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার আক্রান্ত। অধিকাংশ রোগী ৩-১০ দিন পর হাসপাতালে আসছে। ফলে তাদের ঝুঁকিও বেশি। সে কারণে রোগীদের দ্রুত ছেড়েও দেওয়া যাচ্ছে না। বেশি সময় হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (প্রশাসন) ডা. রাশেদা সুলতানা জানান, আগে ডেঙ্গুর লক্ষণগুলো ছিল– শুরুতেই জ্বর আসত, শরীরে ব্যথা, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা ও চামড়ায় লালচে দাগ থাকতো। প্ল্যাটিলেটের এত ওঠানামা করতো না। কিন্তু এবার প্রায় সময় জ্বর আসছে না, প্রাথমিক পর্যায়েই ডায়ারিয়া ও শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, পেটব্যথা করছে, বমি হচ্ছে, পেটে-বুকে পানি জমছে ও শরীরে খিঁচুনি দেখা দিচ্ছে।