মানসিকভাবে অসুস্থ মতিউর রহমান ১৫ বছর বয়সে নিখোঁজ হন। এরপর পরিবারের লোকজন অনেক খোঁজাখুঁজি করেছেন। থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য বাবা শহিদুল ইসলাম। অবশেষে ২১ বছর পর প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে ছেলে মতিউরকে ফেরত পেয়েছেন বাবা-মা। গতকাল শুক্রবার দুপুর আড়াইটার দিকে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে মতিউরকে নিয়ে বাংলাদেশে আসেন ভারতের শ্রদ্ধা ফাউন্ডেশনের সমাজকর্মী নিতিশ শর্মা ও চিকিৎসক ডা. সারওয়ালি কে কোনডুউইলকার।
মতিউর রহমান ঠাকুরগাঁও উপজেলা সদরের আখানগর ইউনিয়নের দেবীডাঙ্গা গ্রামের শহিদুল ইসলামের বড় ছেলে। ২০০২ সালে তিনি নিখোঁজ হন। পরিবারের ধারণা, আখানগর ইউনিয়নের কান্তিভিটা ধোনতলা সীমান্ত হয়ে ভারতের উত্তর দিনাজপুর যান মতিউর।
২০১৯ সালের জুনে মহারাষ্ট্র থেকে মতিউরকে উদ্ধার করেন ভারতের ‘শ্রদ্ধা পুনর্বাসন ফাউন্ডেশন’-এর সমাজকর্মীরা। ওই সংস্থার পক্ষ থেকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মতিউরের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর তাকে সিজোফ্রোনিয়া রোগী হিসেবে শনাক্ত করা হয়। এরপর শ্রদ্ধা পুনর্বাসন ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসার মাধ্যমে গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি তিনি সুস্থ হন। এরপর মতিউরের কাছেই তার পরিবারের পরিচয় জানতে পারেন ফাউন্ডেশনের কর্তাব্যক্তিরা। তারপর সেখানকার সমাজকর্মী নিতিশ শর্মা বাংলাদেশে তার দুই বন্ধুর মাধ্যমে মতিউরের পরিবারের খোঁজ পান। তাদের সহযোগিতায় প্রথম ভিডিওকলের মাধ্যমে বাবা-মাসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন মতিউর। এরপর দুই দেশের প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে গতকাল দেশে ফেরত এলেন মতিউর। ২১ বছর পর ছেলেকে কাছে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরেন বাবা-মাসহ অন্য স্বজনরা। সঙ্গে ছিলেন একমাত্র বোন সাইফুন নাহারসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। আনন্দে কেঁদে ফেলেন তারাও।
মতিউর রহমান বলেন, ‘আমি কখনই ভাবতে পারিনি মা-বাবার কোলে আসতে পারব। আমি অসুস্থ ছিলাম। যারা আমাকে দেশে ফিরিয়ে দিল আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।’
মতিউরের মা মর্জিনা বেগম বলেন, ‘খোদার কাছে সন্তানের জন্য কেঁদেছিলাম, খোদা আমার কথা শুনেছেন।’
মতিউরের বাবা শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সন্তান হারানোর কষ্ট যে কত কঠিন, তা সবাই বুঝতে পারবে না, আমার পরিবার সেই কষ্ট বুঝেছে। যারা আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দিয়েছে আমি সারা জীবন তাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকব।’
মতিউরের ছোট বোন সাইফুন নাহার বলেন, ‘আমি যখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি তখন ভাইকে হারিয়েছি। আমার বিয়ে হয়েছে, আমি এখন দুই সন্তানের জননী। আমাদের সব কষ্ট আল্লাহ দূর করে দিয়েছেন।’
মতিউরকে নিয়ে বাংলাদেশে আসা ভারতের শ্রদ্ধা পুনর্বাসন ফাউন্ডেশনের সমাজকর্মী নিতিশ শর্মা বলেন, ‘আমরা পথ-প্রান্তর থেকে মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষদের সুরক্ষার চেষ্টা করি। বাংলাদেশের মতিউর রহমানকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরে আমরা খুশি।’