রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের বাসিন্দা সেদ্ধ ডিম বিক্রেতা আব্দুস সামাদ। খোলামোড়া ঘাটে গভীর রাত পর্যন্ত সেদ্ধ ডিম নিয়ে একাগ্র চিত্রে বসে থাকতেন। ডিম বিক্রির ক্লান্তিহীন এই কাজ থেকে আয় ছিল সামান্য, তবুও সংসার চলছিল যেন স্বাচ্ছন্দ্যেই। ফাতেমা আক্তার বাবলীকে নিয়ে শুরু হওয়া সংসার জীবনে ছিল একমাত্র ছেলেসন্তান বাঁধন। কিন্তু হঠাৎই তাদের সুখের সংসারে নেমে আসে ঘোর অমানিশা।
অন্যান্য দিনের মতোই এক রাতে ডিম বিক্রি শেষে বাসায় ফেরেন সামাদ। কিন্তু বাড়ির বাইরের ফটকে তালা ঝোলানো দেখতে পেয়ে তার মনে খটকা লাগে। পরে তালা ভেঙে ভেতরে গিয়ে দেখেন স্ত্রী বাবলীর রক্তাক্ত নিথর দেহ পড়ে আছে। তার হাত-পা ওড়না দিয়ে বাঁধা, গলাকাটা দেহ। খবর পেয়ে বাবলীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। কারা তাকে হত্যা করেছে? এই সাদামাটা পরিবারের তো কারও সঙ্গে কিঞ্চিৎ শত্রুতাও ছিল নাÑ এমন প্রশ্ন ঘুরতে থাকে প্রতিবেশীদের মনে। কেরানীগঞ্জের জিয়ানগর এলাকার বাসায় ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নামে পুলিশ। পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তকারীরা মামলার দায়িত্ব পেয়ে শুরু করে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
পিবিআইয়ের তদন্তকারীরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সংগ্রহ করা আলামত সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিটে পাঠানো হয়। সেখানে আলামতগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বোঝা যায়, হত্যাকাণ্ডটি অত্যন্ত কৌশলে করা হয়েছে। ডিএনএ প্রোফাইলিং রিপোর্টে হত্যার শিকার বাবলী ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। পরে এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া সন্দেহভাজন আসামি মো. সেলিম মিয়ার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন পর্যালোচনায় বাবলীর একান্ত মুহূর্তের দৃশ্য পাওয়া যায়। ওই মোবাইল ফোন থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে সেলিম ও বাবলীর পরকীয়া সম্পর্কের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়।
তদন্তে উঠে আসে, সামাদ-বাবলী দম্পতির একমাত্র ছেলে একটি আবাসিক মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। আর সামাদ দীর্ঘ সময় বাসার বাইরে ডিম বিক্রির কাজে ব্যস্ত থাকতেন, ফলে বাসায় একাই থাকতেন বাবলী। আর তার একাকিত্বের সুযোগ নিয়ে সেলিম মিয়া নামে ওই তরুণ ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন প্রেমের সম্পর্ক। বাসায় কেউ না থাকার সুযোগ নিয়ে তারা পার করতে থাকেন স্বামী-স্ত্রীর মতো একান্ত সময়।
পিবিআই জানায়, দুজনের এ-সম্পর্ক দীর্ঘদিন চলার পর বাবলীকে বিয়ে করার জন্য তার স্বামীকে তালাক দেওয়ার পরামর্শ দেন সেলিম। কিন্তু বাবলী তার সন্তান ও সামাজিক মর্যাদার কথা ভেবে ওই প্রস্তাবে অসম্মতি জানান। এ ছাড়া দীর্ঘদিনের অবৈধ সম্পর্ক থেকেও সরে আসার পরিকল্পনা থেকে সেলিমকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন বাবলী।
অন্যদিকে সেলিম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বাবলীর ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। ফলে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য চলতে থাকে। একপর্যায়ে তাদের এই মনোমালিন্য ও সম্পর্কের বিষয়টি আঁচ করতে পারেন বাবলীর স্বামী আব্দুস সামাদ। এরপর তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যেতে বাসা পরিবর্তন করে অন্য এলাকায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেন।
তাদের বাসা পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্ত গোপনে নেওয়া হলেও জেনে ফেলেন সেলিম। বিষয়টি নিয়ে বাবলীর সঙ্গে তার ঝগড়াও হয়। একপর্যায়ে নানা ভয়ভীতিও দেখায়। বিষয়টি বাবলী তার মা ও স্বামীকে জানান।
তদন্তকারীরা বলছেন, সেলিম বাবলীর সঙ্গে আগের মতো পরকীয়ার সম্পর্ক বজায় রাখতে না পারায় তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। পরে পরিকল্পিতভাবে ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করে বাবলীকে। তদন্ত চলাকালে সেলিমকে দুই দফায় বিস্তর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু বাবলীর সঙ্গে পরকীয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও হত্যার বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যায়।
এ প্রসঙ্গে পিবিআই সদর দপ্তরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তদন্তকালে প্রযুক্তির মাধ্যমে দেখা গেছে, আসামি সেলিম ওই সময় ঘটনাস্থলের আশপাশে ছিলেন। তার সন্দেহজনক ঘোরাফেরা সাক্ষীদের মাধ্যমেও জানা গেছে। এছাড়া সেলিম আগেই বাবলীকে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন। এসব বিষয় পর্যালোচনায় হত্যার অভিযোগটি প্রমাণিত হয়েছে এবং সেলিমকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।’