বহু ঐতিহ্যের শহর কনস্টান্টিনোপলের প্রথম মসজিদের নাম ‘জামে আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)।’ এটি নির্মাণ করেন কনস্টান্টিনোপল বিজেতা সুলতান মোহাম্মদ আল ফাতিহ। ঘটনাটি ১৪৫৮ খ্রিস্টাব্দের, শহরটি বিজয়ের পাঁচ বছর পর।
তবে মসজিদ নির্মাণের গল্পের শুরু এরও বহু আগের। হিজরতের ৫২তম বছরে যখন বিখ্যাত সাহাবি খালিদ বিন জায়েদ হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-কে নিয়ে কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের উদ্দেশ্যে এ অঞ্চলে আগমন করেন। এ যুদ্ধাভিযান পরিচালিত হয়েছিল উমাইয়াদের নেতৃত্বে। হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) ইতিহাসে প্রসিদ্ধ হয়ে আছেন আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর মেজবান হিসেবে। মদিনায় যখন রাসুল (সা.) হিজরত করেন, তখন তার গৃহেই গিয়ে ওঠেন এবং সেখানে অবস্থান নেন।
সাহাবি হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) যখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ ও অসুস্থ, তখনই কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের প্রথম যুদ্ধাভিযান পরিচালিত হয়। তিনি তার শারীরিক অক্ষমতা সত্ত্বেও এ অভিযানে অংশ নেন। ৫২ হিজরির এ সময়টায় মুসলিম দুনিয়ার শাসক হজরত মোয়াবিয়া (রা.)। রাসুল (সা.)-এর বাণী, ‘নিশ্চিতরূপে তোমরা কুসতুনতিনিয়া (কনস্টান্টিনোপল) জয় করবে। সুতরাং তার শাসক কতই না উত্তম হবে এবং তার জয় লাভকারী সৈন্যরাও কতই না উত্তম হবে।’ এর ফজিলত অর্জনের জন্য জীবনের পড়ন্ত বেলাতেও তিনি অভিযানটিতে অংশ নেন।
কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের প্রথম এ যুদ্ধাভিযান চলাকালীনই রাসুল (সা.)-এর প্রিয় এ সাহাবি ইন্তেকাল করেন। কিন্তু ইন্তেকালের আগে তিনি যে হৃদয়স্পর্শী অসিয়ত করে যান, তা আজও ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। মৃত্যুশয্যায় সেনাপতি ইয়াজিদ ইবনে মোয়াবিয়া (রা.)-কে তিনি বললেন, ‘আমি মারা গেলে তোমরা আমার লাশটি ঘোড়ার ওপর উঠিয়ে শত্রু-ভূমির অভ্যন্তরে যতদূর সম্ভব নিয়ে যাবে এবং শেষ প্রান্তে দাফন করবে। আর মুসলিম বাহিনীকে এই পথে দ্রুত তাড়িয়ে নিয়ে যাবে, যাতে তাদের অশ্বের পদাঘাত আমার কবরের ওপর পড়ে এবং আমি বুঝতে পারি, তারা যে সাহায্য ও কামিয়াবি চায়, তা তারা লাভ করতে পেরেছে।’ অসিয়ত অনুযায়ী হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-কে কনস্টান্টিনোপলের দেয়াল ঘেঁষে দাফন করা হয়।
এর অনেক বছর পর ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে শহরটি বিজয়ের জন্য ফের অভিযান চালান উসমানি শাসক সুলতান মোহাম্মদ আল ফাতিহ। আল্লাহর সাহায্যে বহু বিস্ময়কর ঘটনার পর মোহাম্মদ আল ফাতিহ কনস্টান্টিনোপল জয় করতে সক্ষম হন কিন্তু ততদিনে হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-এর কবর হারিয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে কবরটির সন্ধান দেন সুলতানের মুর্শিদ ও শিক্ষক শায়খ আকা শামসুদ্দিন (রহ.)। তুর্কি মুসলিমরা মনে করেন- শায়খ তার আধ্যাত্মিক ক্ষমতাবলে কবরটি খুঁজে পান। তুর্কিদের কাছে শায়খ আকা শামসুদ্দিন (রহ.) ছিলেন কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের নেপথ্য কারিগর ও আধ্যাত্মিক নায়ক।
খোদাভীরু শাসক সুলতান মোহাম্মদ আল ফাতিহ হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-এর কবরটির সন্ধান পেয়ে অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত হন এবং এটির সংরক্ষণে তার ওপরে একটি গম্বুজ নির্মাণ করেন এবং এর পাশেই প্রতিষ্ঠা করেন আজকের ঐতিহাসিক মসজিদ ‘জামে আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)।’ এটি ‘মসজিদে আইয়ুব সুলতান’ নামেও পরিচিত। ঐতিহ্যবাহী শহর কনস্টান্টিনোপলের সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিক মসজিদ এটিই। যা শহরটি বিজয়ের পাঁচ বছর পর ১৪৫৮ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল।
উসমানি শাসনামলের দীর্ঘ সময়টিতে ‘জামে আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)’ আধ্যাত্মিকতা ও রাজনীতি চর্চার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে মূল্যায়িত হতো। মসজিদের আঙিনায় নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হতো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মজলিস ও নানা সভা-সেমিনার। নতুন সুলতানের সাড়ম্বর অভিষেক অনুষ্ঠান হতো এখানেই। এ অনুষ্ঠানেই উসমানি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা উসমান গাজি বিন আর্তুগ্রুলের তরবারি দিয়ে তুর্কিরা তাদের নতুন সুলতানকে বরণ করে নিত।
একটা সময় পর্যন্ত, মসজিদের পাশটা গণকবরস্থানে রূপ নেওয়ার আগে উসমানি শাসকরা এখানে সমাধিস্থ হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করতেন। এখন তো এটা পুরো আধুনিক ইস্তাম্বুলের সর্ববৃহৎ কবরস্থান। এত শতাব্দী পরও এ স্থানটি শুধু তুর্কিদের কাছেই নয়; বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর কাছে এক অনন্য আকর্ষণীয় জায়গা। দ্বীনের আবহ ও আধ্যাত্মিকতার টানে প্রতিদিন এখানে হাজারো মানুষ জেয়ারতে আসেন। বিশেষত রমজান ও দুই ঈদে মসজিদ ‘জামে আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)’ ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মিলনমেলায় পরিণত হয়।