কে তারে রাখে মনে...

বৃষ্টি হচ্ছিল সেদিন। প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণ থেকে আমরা সবাই অমিতদাকে বিদায় বললাম। আসর জমিয়ে রাখা অমিত হাবিব সেই বাদল দিনে নিঃসাড় শুয়েছিলেন কফিনে। অনেক দূরের পথ, সেই মহেশপুরের পথে তাকে বহন করছিল লাশবাহী গাড়ি। এই শহরে বিয়াল্লিশ বছর আগে তিনি এসেছিলেন মহেশপুরের মায়া আর ছায়াঘেরা জীবন ছেড়ে। জীবন গড়বেন বলে। কিন্তু মৃত্যু জীবনের সঙ্গে বিয়োগ ঘটিয়ে দেয়। কখনো সাড়ম্বরে, কখনো অকস্মাৎ।

তখনো সম্পাদকের টেবিলে বসেছিলেন অমিত হাবিব। সেই বিকেলে কী ভাবছিলেন অমিতদা? লিড নিউজের হেডলাইন? নাকি কাগজের স্টক নিয়ে? পূর্ণ সম্পাদক হিসেবে যে কয় বছর অমিতদাকে পেয়েছি এই তো তার রোজকার ভাবনা। যদি বলি উদ্বেগ, সেটাও। পত্রিকার আপার ফোল্ড বা উপরি ভাঁজটা কেমন হবে? আমাকে প্রায়ই বলতেন, খোকন ব্যাক পেজেরও একটা ক্যারেক্টার দাঁড় করানো উচিত। অমিতদা চাইতেন, পত্রিকা বারো কিংবা ষোলো কিংবা কুড়ি যত পৃষ্ঠারই হোক প্রত্যেক পাতার আলাদা আলাদা চরিত্র থাকা চাই। সীমিত সামর্থ্যে সেটা আর কুলিয়ে ওঠা যায় না। সেই যে গার্ডিয়ানের বিখ্যাত সম্পাদক সিপি স্কট বলেছিলেন, সম্পাদকের নিউজ এথিক্স আর বিজনেস দুটোর ভারসাম্য রাখতে হয়। সচেতনভাবে না হলেও অবচেতনেও সম্পাদক এই কাজই করে যান। সিপি স্কটের সেই কথার শতবর্ষ পেরিয়ে গেছে।

সংবাদপত্র শিল্প আয়ুষ্কালের শেষ সীমায় বলা যায়। এ যুগে সম্পাদকের গড় আয়ু কম হওয়ার কথা। অমিত হাবিব পেলেন তারও কম। পূর্ণ সম্পাদক হিসেবে মাত্র সাড়ে চার বছর। আরও বেশি সময় তিনি ডিজার্ভ করতেন। প্রতীকী অর্থে লিখলাম। কিন্তু বাস্তবে অমিতদা ষাটও পুরো করতে পারলেন না। আটান্নর ক্যামিওতেই সাজঘরে ডাক। ক্রিকেট তার প্রিয় স্পোর্টস। প্রায় সময় ক্রিকেটের ভাষায় রসিকতা করতেন। হতাশা প্রকাশেও ক্রিকেটের আশ্রয় চাইতেন। ধরুন, তেত্রিশে যে যুবক দেশের সবচেয়ে অভিজাত দৈনিকের জাঁদরেল বার্তা সম্পাদক তাকে সম্পাদক হতে অপেক্ষা করতে হলো আরও কুড়ি বছর! মাঝখানে অন্তত তিন-চারবার নানা নামে সম্পাদকের প্রক্সি দিয়েছেন। এতগুলো আলোচিত সংবাদপত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে থেকে ষাট পুরোবার আগেই জীবনের ময়দান ছেড়ে দেওয়া তো ক্যামিও-ই। আর কী নামে তার জীবন বলেন বা ক্যারিয়ার বলেন তাকে বিবৃত করব!

জীবনে-যাপনেও প্রচলিত শৃঙ্খলার পথে হাঁটেননি তিনি। আনএক্সামিনড লাইফ সৃষ্টিশীল মানুষের সঙ্গে খুব যে খাপ খায় তা আমরা দেখি না। অমিত হাবিব কবিতা লেখা ছাড়লেও কবিমন তো তাকে ছেড়ে যায়নি। পাখির মন না হলেও চনমনে কবিমন। শেষবার যখন তার সঙ্গে গল্প করতে গেছি বললেন, আড্ডা দিয়ে মজা পাচ্ছি না। দেশ রূপান্তর অফিসের একই ভবনে অফিস নিতে বলে বললেন, এখানে চলে আসেন। সামনের স্পেসটা খালি আছে। অমিতদার আড্ডাপ্রীতি, জীবনতৃষ্ণার কথাই শুধু বলছি। সাংবাদিক অমিত হাবিব কেমন ছিলেন সেটা বরং পাঠকের জানা দরকার বেশি।

১৯৯৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থা থেকে ঘটনাচক্রে তার সঙ্গে একই বার্তাকক্ষে কাজ করার সুযোগ আসে আমার। বাংলা মোটরের পুরনো ভোরের কাগজ অফিসে। তীক্ষè যুক্তি, প্রমিত বাংলায় বাক্যবাণে প্রায় অসম্ভব তর্কেও তিনি বিজয়ীর হাসি হাসতেন। তার ব্যক্তিত্বের সেই ছায়া কাগজে দেখা যেত। সেকালে বার্তা সম্পাদক পদটি সংবাদপত্রে ডি ফ্যাক্টো সম্পাদকের মতো ছিল। সহজ করে বললে বলতে হবে, পত্রিকার কনটেন্ট, খবর বিন্যাস ও অঙ্গসজ্জায় সম্পাদকের টোন থাকলেও ছায়া থাকত বার্তা সম্পাদকের। বার্তা সম্পাদকই পত্রিকা পরিকল্পনা ও তা এক্সিকিউট করতেন। এখনকার মতো মিনিটে মিনিটে ঘটনার আপডেট বা কানেকটিভিটি সেসময় কল্পনাই করা যেত কেবল। ডেস্কটপ পাবলিকেশনও তখন আসেনি। আমরা লিখতাম নিউজপ্রিন্টের প্যাডে। তো রিপোর্টার বা সাব-এডিটররা শত পাতার ছোট নিউজপ্রিন্ট প্যাডও প্রায় সময় ভরে ফেলতেন। অনেক রিপোর্টার দীর্ঘ প্রতিবেদন লিখে এনে বার্তা সম্পাদক বা নিউজ এডিটরের টেবিলে রেখেই ছুট। অমিতদাকে দেখতাম, বলছেন... ইয়ে বসেন। তখন নিউজরুমে এসিও ছিল না। নেন, সিগারেট নেন। তারপর দুহাতে নিউজপ্রিন্ট প্যাডে লেখা নিউজ তুলে ওজন করার ভঙ্গি করতেন। নাহ, অর্ধেক কমিয়ে নিয়ে আসেন। রিপোর্টার হয়তো অনেক কিছু বাদ দিয়ে নিয়ে এলেন। আবার সেই মাপের ভঙ্গি। আরও অর্ধেক কমাতে হবে যে! পৃষ্ঠা সংখ্যা চার ভাগের একভাগে নেমে এলে উনি হয়তো নিজে দেখলেন না হলে পাশে বসা জয়েন্ট নিউজ এডিটর কিংবা অন্য কাউকে বললেন দেখে দিতে। জটিল নিউজ এলে বেশির ভাগ সময় নিজেই লাল কালিতে ছাইরঙা নিউজপ্রিন্ট রাঙিয়ে দিতেন। রিরাইট করতেন অনেক। বহু রিপোর্টারের পুরো রিপোর্ট নতুন করে নিজেই লিখতেন। নিউজ লেখার ক্ষেত্রে একটিভ ভয়েসে লেখাটাই গ্রামাটিক্যালি প্রেফার করা হয়। বাংলায় এই কাজটি করা একটু কঠিন। অমিতদার ভাষার মধ্যে ডিরেক্ট স্পিচ থাকত। সাংবাদিক গদ্যের গতিময়তা ছিল। নির্মেদ, বাহুল্যবিহীন ও বিশেষণবিহীন। এই নিয়ম সংবাদ লেখার আবশ্যকীয় শর্ত হলেও বাংলা ভাষায় সাংবাদিকতার অতীতকালে এসব অনুপস্থিত ছিল। নব্বইয়ের দশকে আজকের কাগজ প্রকাশের মাধ্যমে সাংবাদিকতায় যে নতুন ঢেউ বা ওয়েভের সৃষ্টি হয় বাংলায় এই ভাষাভঙ্গি প্রচলনও হয় তখন। অমিতদা এই সাংবাদিক ভাষাভঙ্গির সূচনাকারীদের একজন।

সাংবাদিকতায় গসিপ ছিল। জল্পনা ছিল। স্ট্রেইট জ্যাকেট নিউজ লেখার চেয়ে অলংকারবহুল খবর লেখা হতো। আজকের কাগজ তাতেও একটা বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে বলে আমার ধারণা। সাংবাদিক হিসেবে ডিফাইন করতে হলে অমিত হাবিবকে বাংলা সাংবাদিকতার বাঁক বদলের অন্যতম নায়ক বলে মানতে হবে। এই ক্ষেত্রে আমার যুক্তি হচ্ছে, যে পত্রিকাটিতে এই নতুন ওয়েবটি পরিপূর্ণরূপে প্রকাশিত হয়েছিল সেই পত্রিকাটির বার্তা সম্পাদক ছিলেন তিনি। এ বিষয়ে অথেনটিক কোনো গবেষণা আমার বক্তব্যকে সমর্থন করছে কিনা আমি জানি না। সহজবোধ্য ও সাবলীল ভাষায় খবর লেখার দক্ষতা যেমন অমিতদাকে এগিয়ে রেখেছিল তেমনি তার শিরোনাম বা হেডলাইন লেখার দক্ষতা ও সৃষ্টিশীলতার খবর সাংবাদিক সমাজে সুবিদিত ছিল। এখানে একটি ছোট্ট ঘটনার কথা বলে রাখি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন প্রথম মেয়াদের সরকারের সময় তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের শাশুড়ির মৃতদেহ পাওয়া যায় তাদের ঢাকার বাসায়। মৃত্যু অপঘাতে। গুলিবিদ্ধ লাশ। পুলিশ নিশ্চিত নয়, হত্যা না আত্মহত্যা। তারা অতি সতর্ক। এদিকে পত্রিকা তো ছাড়তে হবে। খবরও দিতে হবে। সত্যের প্রতিও অনুগত থাকতে হবে। কে জানি অমিতদাকে ফোন করলেন, অমিত কী হেডলাইন করবা? আমি তো বুঝতে পারছি না। এপ্রান্ত থেকে অমিতদাকে বলতে শুনলাম, লিখে দেন পুতুলের শাশুড়ির গুলিবিদ্ধ লাশ। অমিতদা নিজে কিন্তু তখনো শিরোনাম করেননি। হেডলাইন করার ক্ষেত্রে তার মুন্সিয়ানার সুনাম শহরজুড়েই ছিল। তখন আমি অমিতদার সঙ্গে কাজ করি না। সাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ মারা গেছেন। তিনি তখন কালের কণ্ঠের উপদেষ্টা সম্পাদক। হেডলাইনে চোখ আটকাল, অনন্ত নির্জনতায় মার্কেজ। আমি দেখেই ভাবলাম, এই হেডলাইন অমিতদারই হবে। খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হলাম। সর্বশেষ দেশ রূপান্তরে কাজ করার সময়ও দেখেছি হেডলাইন খুঁজতেন তিনি। যুৎসই হেডলাইন না হলে ঘুরে ঘুরে আসতেন গ্রাফিক্স রুমে। সাংবাদিক হিসেবে দক্ষতার পাশাপাশি সংগঠক হিসেবে তিনি ছিলেন রীতিমতো ক্যারিশম্যাটিক। পত্রিকার বড় বড় প্রজেক্ট করেছেন। সেখানে জড়ো করতেন সেরা সাংবাদিকদের। দৈনিক যায়যায়দিন করার সময়টায় আমি অমিতদার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। দরকারি লোকটিকে পেতে মাঝরাতে তার বাসায় উপস্থিত হয়ে তার স্ত্রীকে কনভিন্স করার কত উদাহরণ যে আছে! কেউ আসতে রাজি না থাকলে কি কৌশলে তার ইচ্ছাকে প্রভাবিত করা যায় তার সম্ভাব্য সব অপশন ভেবে রাখতেন তিনি।

ছোট ছোট বাক্যে অমিতদাকে ধরার এই চেষ্টায় পরিপূর্ণ মানুষটিকে আঁকা একদম অসম্ভব। তার সাংবাদিক জীবনের কিছু দিক বলার চেষ্টা করার পর মনে হলো আসল কথাটাই বলিনি। যেই গুণটি আজকের সাংবাদিকতায় রীতিমতো বিরল। আজকাল শুনেছি অনেক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী তাদের মিডিয়ায় সম্পাদক নিয়োগ দেন পাবলিক রিলেশন্স দেখার জন্য। বলা বাহুল্য, অমিতদাকে এ রকম দাওয়াত খাওয়ার সাংবাদিকতা করতে দেখিনি। দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেও তিনি সরকারি প্লটের জন্য ধরনা দেননি। ক্ষমতাবানদের এড়িয়ে চলেছেন, পাছে আবার অনেক বেশি অনুরোধ রক্ষার আব্দার আসতে পারে ভেবে!

অমিতদা তর্ক করতে পছন্দ করতেন খুব। কিন্তু টকশোতে যেতেন না। ফেসবুকে থাকতেন সবসময়, কিন্তু একটিভ থাকতেন না। আমি বলতাম, শোতে তো যেতে পারেন। টুকটাক লিখতেও তো পারেন। তিনি বলতেন, আমি ওল্ড স্কুলের। আমার যা বলার পত্রিকার মাধ্যমেই তো বলার সুযোগ আছে। কিন্তু পত্রিকাতেও স্বনামে লিখতেন না কিছুই। তিনি পুরনো কথাটি মনে রাখতেন, সম্পাদকের স্বর শোনা যাবে কিন্তু তাকে দেখা যাবে না। সেই সম্পাদকের স্বর স্তব্ধ হয়ে গেছে এক বছর আগে! স্মৃতিতে দেখা যায় অনেক।

লেখক : দেশ রূপান্তরের সাবেক যুগ্না সম্পাদক