থ্যাংক ইউ, অমিতদা

২০০৯ সাল। দৈনিক কালের কণ্ঠের যাত্রা শুরুর আগের কথা। প্রথমে ভেবেছিলাম নতুন পত্রিকায় প্রতিদিন গড়ে ৪ পৃষ্ঠা করে ফিচার আয়োজন থাকবে। সেরকম করেই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। অমিতদা পত্রিকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সবকিছু বদলে গেল। প্রথমে টার্গেট ছিল, ধীরে ধীরে সার্কুলেশন বাড়িয়ে শীর্ষস্থানের দিকে যাত্রা করবে কালের কণ্ঠ। দাদা বললেন, না, শুরুতেই মার্কেট পেনিট্রেট করে লিড নিয়ে নিতে হবে। বড় আকারে শুরু করতে হবে। পত্রিকা হবে মোট ৩২ পৃষ্ঠার।

আমরা তো আঁতকে উঠলাম, ‘বলেন কী? তাহলে খরচ বেড়ে যাবে না?’

‘বাড়বে’, নির্বিকারভাবে বললেন দাদা। ‘কিন্তু মার্কেটে এক নম্বর হতে পারলে, বিজ্ঞাপন দিয়ে সে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাবে।’ কিমাশ্চর্য, মালিকপক্ষও এ পরামর্শ মেনে নিল! আমাদের সবার মধ্যেই বেশ একটা জোশ এসে গেল। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আকারের পত্রিকা করতে যাচ্ছি আমরা।

আমি তখন ফিচার এডিটর, জামিল বিন সিদ্দিক ডেপুটি ফিচার এডিটর। দুজনেই অমিতদার পূর্বপরিচিত। আমাদের পারস্পরিক বোঝাপড়াটা বেশ ভালো। আমার সাংবাদিকতা জীবনের শুরুতে ভোরের কাগজ, তারপর যায়যায়দিন পত্রিকায় অমিতদার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও আছে। যায়যায়দিনেও দেখেছি, বড় করে ভাবার একটা ‘বাতিক’ আছে তার। যাই হোক, অচিরেই এক অপরাহ্ণে আমাদের দিকে তাকিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন তিনি, প্রতিদিন ৮ পৃষ্ঠা ফিচার করতে হবে। কী, পারবেন না?

চ্যালেঞ্জের সুরে এরকম করে বললে খুব লাগে। আরে, আমরা কি আর কারেও ডরাই/ভাঙতে পাড়ি লোহার কড়াই। অমøান বদনে বলে দিলাম, কোনো ব্যাপার না। কিন্তু সাপোর্ট লাগবে দাদা। বললেন, সেটা পাবেন। আপনার দ্রুত প্ল্যান করেন। সময় কম।

ব্যস, আবার নতুন করে সাজানো শুরু হলো ফিচার পাতাগুলো। নতুন নতুন বিষয় যুক্ত হলো, নতুন কর্মীও। যেকোনো নতুন পত্রিকায় নতুন কোনো ফিচার আয়োজন থাকতে হয়। আমরা দিয়েছিলাম মগজ ধোলাই। মগজ ধোলাই প্রথমে ব্রডশিটে এক বা দুই পৃষ্ঠার কথা ভাবা হয়েছিল, সেটাকে আস্ত একটা ম্যাগাজিনের রূপ দেওয়া হলো। আলোকচিত্র নিয়ে পুরো এক পৃষ্ঠার একটা আয়োজন যোগ করা হলো। এভাবে বদল হলো আরও অনেক কিছুর।

সব পরিকল্পনা নিয়ে অমিতদার সঙ্গে বসে চূড়ান্ত করতে গেলাম একদিন। বসার পর দেখা গেল, অন্য বিভাগ থেকেও কিছু ফিচার আয়োজন আছে। সেসবের সঙ্গে ম্যাচ করাতে গিয়ে একটি বাড়তি দিন দরকার হচ্ছে। মানে, মগজ ধোলাই ও ঘোড়ার ডিম নামে দুটি ম্যাগাজিন হবে কিন্তু হাতে দিন থাকছে একটি। কী করা? জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকালেন অমিতদা। বিকল্প কিছু না পেয়ে আমরা একটা অভিনব প্রস্তাব দিলাম, ‘দুটোই ব্যাক-টু-ব্যাক কাভার দিয়ে একদিনেই ছেপে দিলে কেমন হয়?’ বললাম বটে কিন্তু প্রস্তাব পাস হবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। বাংলা মুল্লুকে কেন, পত্রিকার জগতেই এরকমটা আগে দেখেছি বলে মনে পড়ল না। কিন্তু খানিকক্ষণ ভেবে অমিতদা মাথা নেড়ে সায় দিলেন। অবশেষে ১৬ পৃষ্ঠা করে মোট ৩২ পৃষ্ঠার ম্যাগাজিন হলো। একদিকে মগজ ধোলাই, উল্টো দিক দিয়ে পড়লে ঘোড়ার ডিম। পাঠক কীভাবে নেবে তা নিয়ে যেটুকু সংশয় ছিল পত্রিকা বাজারে যাওয়ার পর তা নিমেষেই উবে গেল। দেখা গেল আইডিয়াটা বেশ জমে গেছে। ডাবল কাভারের এই ম্যাগাজিন নিয়ে পাঠকদের মধ্যে যে তুমুল উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল তা স্মরণ করলে এখনো বেশ ভালোই লাগে। আমরা মোটামুটি নিশ্চিত, অমিতদার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে এই প্রস্তাব আদৌ পাস করানো যেত কি না সন্দেহ।

মূলত নিউজের লোক হলেও কী ফিচার কী সাহিত্য, কী সম্পাদকীয় সব বিভাগেই অমিতদার ইনপুট থাকত এবং সেটা হাওয়া থেকে না। বই পড়া, ছবি দেখা, গান শোনা এগুলো তার জীবনচর্যার অংশ ছিল। চিন্তায় মননে তার মতো সমৃদ্ধ সম্পাদক বাংলাদেশে খুব বেশি একটা এখনো দেখতে পাই না। শিল্পকলার যে কোনো মাধ্যম নিয়েই তার সঙ্গে আড্ডা দেওয়া যেত। সব বিষয়ে তুমুল আগ্রহ তার। খেলা পাগল তো ছিলেনই। মার্লোন ব্রান্ডো কেন অস্কার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তার বৃত্তান্তও বিজনেসইনসাইডার থেকে (সম্ভবত ২০১৪ সালে) প্রিন্ট নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে দেখেছি তাকে। তার অন্তরাত্মা জুড়ে ছিল সত্যসন্ধ সাংবাদিকের সেই অমোঘ তৃষ্ণা : জানা ও জানানো।

পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্বটা তিনি এমন আলগোছে পালন করতেন যে টের পাওয়া যেত না, কোথাও কোনো চোট লাগত না। হুকুমদারি কিংবা নিজেকে জাহির করার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। নিজেকে সবরকমভাবে আড়ালে রেখে অন্যদের এগিয়ে দিতেন।

লিখতে পারতেন চমৎকার। অমিতদার লেখকসত্তার কথা হয়তো অনেকেই জানেন না। আমি কিন্তু সাংবাদিকতায় আসার আগে তার লেখা পড়েই মুগ্ধ হয়েছি। সম্ভবত গত শতকের আশির দশকের শুরুর দিকে, অধুনা নামে একটা লিটল ম্যাগাজিন বের হতো। ক্ষীণতনু লিটল ম্যাগটি রচনাসম্পদে ছিল ভরপুর। মাত্র পাঁচটা সংখ্যা বের হয়েই বন্ধ হয়ে যায়। সেখানেই প্রথম অমিতদার লেখা পড়ি এবং সেগুলো শিল্পসাহিত্য বিষয়ক! তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল, অল্প কথায় মূল বক্তব্যটা তুলে ধরা। অর্থঘন শব্দচয়নে ছিলেন অসাধারণ। তির্যক মন্তব্যে অতুলনীয়। তার সঙ্গে যারা আড্ডা দিয়েছেন তারা বুঝবেন, তার লেখার স্টাইল তার কথোপকথনেরই পরিশীলিত রূপ। অথচ এই লোককে পরে আর কখনো লিখতে দেখিনি। আমাকে কখনো লেখার তাগিদ দিলে পাল্টা বলতাম, আপনি লেখেন না কেন? লাজুক হেসে বলতেন, আলস্য। অথচ অন্যকে দিয়ে লিখিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে ছিলেন সদাতৎপর।

২০১৪ সালের কথা। শাহবাগ আন্দোলন তখন তুঙ্গে। নিউজ তো ছাপা হচ্ছেই, ফিচার বিভাগ থেকেও থাকছে বিভিন্ন আয়োজন। এর মধ্যে দাদা বিভিন্ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানদের শাহবাগে ঘুরে এসে প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ টাইপের লেখা দিতে বললেন। নিউজ এডিটর, বিজনেস এডিটর, মফস্বল এডিটর কেউ বাদ গেলেন না। স্পোর্টস এডিটর মোস্তফা মামুন তো জাত লেখক, বসলেই গড়গড়িয়ে লিখতে পারে। কিন্তু আমরা যারা অলেখক তারা মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। আমি চাকরি জীবনের শুরুতে চারটে পয়সা পাওয়ার আশায় এন্তার লিখেছি। এমনও হয়েছে, বেতনের চেয়ে লিখে সম্মানী পেতাম কয়েকগুণ বেশি। কিন্তু সে যুগ হয়েছে বাসি। এখন আর কলম সরে না। কালের কণ্ঠে এসে ঠেকায় পড়ে গীতাঞ্জলির শতবর্ষ উপলক্ষে একটা ঢাউস লেখা লিখতে হয়েছিল। ব্যস, ওই পর্যন্তই। ফলে যখন অমিতদা বললেন, আপনাকে লিখতে হবে। তখন কাষ্ঠ হাসি হেসে বললাম, মাফ করে দেন অমিতদা। অভ্যেস নেই। কিন্তু দাদা নাছোড়। বারবার পিছলে যাওয়ার চেষ্টা করেও কাজ হলো না। গুঁতিয়ে গুঁতিয়ে ঠিকই শেষ পর্যন্ত একটা লেখা বের করে ছাড়লেন। লেখার শুরুটা হালকা চালে ছিল, সম্ভবত মমতাজের কোনো একটা গানের কলি দিয়ে শুরু করেছিলাম। দাদা বললেন, পরামর্শের সুরে, এটা রাখবেন?

এই একটা ব্যাপার, কখনো কোনো লেখা নিজে বদল করতেন না। লেখককে ডেকে, আলাপ করে, তাকে কনভিন্স করে তাকে দিয়েই বদলে নিতেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেটা বেটার হতো। কালের কণ্ঠের অনেক ফিচারের উপস্থাপনা কিংবা শিরোনামের ক্ষেত্রেও এরকমটা হয়েছে। খবরদারি নয়, সহযোগিতা এটাই ছিল তার দায়িত্ব পালনের অন্যতম মূলমন্ত্র।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কথাও বলা যায়। ফি বছর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সময় পত্রিকায় নতুন কিছু ইন্ট্রোডিউস করার একটা তাড়না থাকত। ফিচারের বিভিন্ন পাতায় নতুন কিছু বিভাগ চালু করা হতো। একবার আস্ত দুটি নতুন পাতা করার প্রস্তাব এলো। বিভাগের সবার সঙ্গে পরামর্শ করে দুটো পাতার আইডিয়া ঠিক করলাম। একটা বিজ্ঞাপন বিরতি, অন্যটার নাম মনে পড়ছে না। দাদা বললেন, সাক্ষাৎকারভিত্তিক একটা পাতা করেন। আমরা একটু গাঁইগুঁই করলাম এ ধরনের পাতা আগে অনেক হয়েছে, কেউ মন খুলে কথা বলতে চায় না, সেই একই জিনিস ছাপা হবে ইত্যাদি। দাদা বললেন, ‘তবু করেন। আমার মনে হয় ভালো হবে।’ তা-ই হলো। কালের কণ্ঠের অন্যতম আকর্ষণীয় পাতা ছিল কথায় কথায়। অনেক খ্যাতিমান লোকও পাতার ইনচার্জকে ফোন করে বলতেন, কই মিয়া তোমরা তো আমার সাক্ষাৎকার নিলা না।

আরও একটা হ্যাপা ছিল, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যার আয়োজন করা। বেশ কয়েকবারই ফিচার বিভাগ থেকে এটা করা হয়েছে। আমি আর জামিল একবার পরিকল্পনা করলাম বাংলাদেশের সাংবাদিকতার সেকাল একাল আগামীকাল নিয়ে তিনটা ফোল্ডার করব। দাদাকে বললাম, কোনো এক্সপার্টের মতামত নিতে পারলে ভালো হতো। দাদা বললেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম বিভাগের কারও সঙ্গে পরামর্শ করে করেন, ভালো হবে। শুধু বললেন না, তাৎক্ষণিকভাবে রোবায়েত ফেরদৌসকে ফোন দিয়ে অফিসে দাওয়াত দিলেন। পরে আমাদের পরিকল্পনা নিয়ে রোবায়েতের সঙ্গে বসে তিনটি ফোল্ডারের বিষয় চূড়ান্ত করা হলো। সেই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা বিপুলভাবে সমাদৃত হয়েছিল।

এরকম অনেক পরামর্শ, অনেক সহযোগিতা আর এন্তার স্বাধীনতা দিয়ে আমাদের ফিচার বিভাগের পথ চলাকে সুগম করে দিয়েছিলেন অমিতদা। এজন্য আমরা তার কাছে কৃতজ্ঞ।

লেখক : উপসম্পাদক, কালের কণ্ঠ