নিস্তেজ আদ্রিজাকে কোলে নিয়ে আইসিইউ’র অপেক্ষায় মা

এক বছর দুই মাস বয়সের শিশুটির নাম আদ্রিজা। চার দিন ধরে তার প্ল্যাটিলেট কমতে কমতে এখন ৬২ হাজারে নেমেছে। বুধবার রাতে জ্বর সারলেও বৃহস্পতিবার সকাল থেকে নতুন করে হাতে ও পায়ে র‌্যাশ দেখা দিয়েছে। একেবারে নিস্তেজ হয়ে গেছে শিশু অদ্রিজা। কোলের মধ্যে সন্তানকে ধরে রেখে মা হাসি সেন বললেন, ‘দিন দিন বাচ্চাটা নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। দুদিন ধরে কিছু খাচ্ছে না, ঠিকমতো চোখও মেলছে না। অথচ ডাক্তাররা বলছেন ঠিক হয়ে যাবে’!

রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের ডেঙ্গু কর্নার-২ এর ৩৯ নম্বর শয্যায় চিকিৎসাধীন শিশু অদ্রিজা মল্লিককে নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবার। বৃহস্পতিবার দুপুরে এ কর্নারে গিয়ে দেখা যায় অন্যান্য ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের মতো অদ্রিজার পরিবারের সদস্যদের চোখ-মুখে দুশ্চিন্তা।

মশারির নিচে মায়ের কোলে নিস্তেজ শুয়ে আছে অদ্রিজা। পাশেই বসে একটা বাটিতে নরম ভাত চামচে করে খাওয়ানোর চেষ্টা করছে শিশুটির মাসি। মাথার পাশে দাঁড়িয়ে বাবা ও মামা। এরই মধ্যে দুই নারী এসে খবর দিলেন তারা আইসিইউয়ের (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) জন্য সিরিয়াল দিয়ে এলেন। কিন্তু অনেক লম্বা সিরিয়াল, আদৌ সিট পাবে কি না, তার নিশ্চয়তা নেই।

কথা বলে জানা যায়, তারা থাকেন মিরপুর ২ নম্বরে। কয়েক দিন ধরে জ্বরে ভুগছিল অদ্রিজা। গত ৩১ জুলাই তাকে নেয়া হয় রাজধানীর মিরপুরের ডা. এম আর খান শিশু হাসপাতালে। সে হাসপাতালে সিনিয়র স্টাফ নার্স অদ্রিজার মা হাসি সেন। সেখানেই ডেঙ্গু ধরা পড়লে ভর্তি করা হয় অদ্রিজাকে। সেদিন শিশুটির রক্তে প্ল্যাটিলেট ছিল ২ লাখ ১০ হাজার। পরদিন তা কমে নেমে আসে ১ লাখ ৭০ হাজারে। প্ল্যাটিলেট কমতে থাকায় ও পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় সেখানকার চিকিৎসকরা আদ্রিজাকে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দেন।

শিশুটির পরিবার জানায়, গত ২ আগস্ট বুধবার বিকেল ৫টার দিকে অদ্রিজাকে ভর্তি করা হয় এখানে। তখন তার প্ল্যাটিলেট আরো কমে ১ লাখ ৩১ হাজারে নেমে আসে। চিকিৎসকরা ‘অসুবিধা নেই, ভালো হয়ে যাবে’ বললেও আশ্বস্ত হতে পারছেন না মা হাসি সেন। কারণ পরদিন বৃহস্পতিবার প্ল্যাটিলেট আরো কমে ৬২ হাজারে নেমে এসেছে।

অদ্রিজার অবস্থার আরও অবনতির কথা জানিয়ে মা হাসি সেন দেশ রূপান্তরকে জানান, ডা. এম আর খান হাসপাতাল থেকে যখন এ হাসপাতালে আনা হয়, তখন ওর জ্বর ছিল ১০৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট। মাথায় সামান্য র‌্যাশ ছিল। দু’দিন পর গত বুধবার রাত দু’টার পর রাতে জ্বর সেরে যায়। কিন্তু বৃহস্পতিবার সকাল থেকে হাতে ও পায়ে নতুন করে র‌্যাশ দেখা দেয়। আরও নিস্তেজ হয়ে পড়ে শিশুটি। গত দুদিন ধরে কিছুই খাচ্ছে না। স্যালাইন দেওয়া হয়েছে। ছোট হাতটি স্যালাইনের সুচে নীল হয়ে গেছে। চোখ খুলছে না। পাশে বসে অনেক চেষ্টা করেও শিশুটিকে কিছুই খাওয়াতে পারছে না মাসি।

এম আর খান হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলেছিলেন, অদ্রিজাকে আইসিইউতে নিতে হবে। কিন্তু এখানে আনার পর এখানকার চিকিৎসকরা বলেছেন, আইসিইউ বা প্ল্যাটিলেট কিছুই লাগবে না। ভালো হয়ে যাবে।

অদ্রিজার মা আরও বলেন, ডাক্তাররা বলেছেন, পালস (নাড়ির স্পন্দন) ও বিপি (রক্ত চাপ) ঠিক থাকলে প্ল্যাটিলেট ১০ হাজারে নেমে এলেও অসুবিধা নেই। আইসিইউ লাগবে না।

তবে দিন দিন সন্তানের অবস্থার অবনতিতে এখন আর কিছু মাথায় ঢুকছে না মা হাসির। কয়েকজন নার্স সহকর্মীকে দিয়ে আইসিইউতে সিরিয়াল দিয়েছেন। দরকার হলে আইসিইউ পাবেন কি না, এ নিয়ে নতুন উদ্বেগ পেয়ে বসেছে তাদের।

মা হাসি বলেন, জ্বর সেরে যাওয়ার পর দু-তিন দিন ডেঙ্গু রোগীর জন্য খুবই সংকটময় সময়। তখন প্ল্যাটিলেট দ্রুত কমতে থাকে ও অবস্থারও দ্রুত অবনতি হয়। এ সময়টুকু পার করতে পারলে আর চিন্তা নেই।

অদ্রিজার কীভাবে ডেঙ্গু হলো, জানতে চাইলে ওর পরিবারের সদস্যরা জানান, ওদের বাসায় কারো ডেঙ্গু ছিল না। ওর এক মেসোর প্রথম ডেঙ্গু হয় ও তিনি ওদের বাসায় উঠে আসেন। সেখানেই তার চিকিৎসা চলে। পরে মেসো ভালো হয়ে যান। কিন্তু অদ্রিজার ডেঙ্গু দেখা দেয়। তাদের ধারণা, ওর মেসোর থেকেই ওর ডেঙ্গু হয়েছে।

অদ্রিজার পাশের শয্যাটিই রাজশ্রীর। ডেঙ্গু কর্নার-২ এর ৩৮ নম্বর শয্যায় চিকিৎসাধীন ২ বছর ৫ মাস বয়সী এই শিশুর অবস্থাও ভালো না। বৃহস্পতিবার দুপুরে মশারির নিচে শিশুটিকে কোলে নিয়ে বসে ছিলেন বাবা সুদর্শন মিত্র। থাকেন কল্যাণপুরে।

তিনি জানান, কয়েক দিন ধরেই জ্বর ছিল রাজশ্রীর। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডেঙ্গু ধরা পড়ে তার। সেখানে ভর্তিও হয়। সেদিন প্ল্যাটিলেট ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার। পরদিন প্ল্যাটিলেট কমে ২ লাখ ২০ হাজার হয়, তার পরদিন আরো কমে ১ লাখ ৯৪ হাজারে নেমে আসে। সর্বশেষ যখন প্ল্যাটিলেট আরো কমে ১ লাখ ৫৭ হাজারে নেমে আসে, তখন ওই হাসপাতালের চিকিৎসকরা ‘ভালো হয়ে যাবে, বাসায় নিয়ে যান’ বলে রাজশ্রীকে ছুটি দিয়ে দেন।

সুদর্শন মিত্র বলেন, তত দিনে প্ল্যাটিলেট কমার পাশাপাশি রাজশ্রীর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। নিরুপায় বাবা-মা অবশেষে গত ৩১ জুলাই দুপুরে তাকে এ হাসপাতালে ভর্তি করান। কিন্তু সরাসরি ডেঙ্গু ওয়ার্ডে না দিয়ে দুদিন তাকে রাখা হয় ইমার্জেন্সিতে। এখানে প্রতিদিন তার পরিবারকে শয্যার জন্য গুনতে হয়েছে ৮০০ টাকা করে। পরে গত বুধবার তাকে নিয়ে আসা হয় এই ওয়ার্ডে। ততক্ষণে প্ল্যাটিলেট আরো কমে ১ লাখ ৫০ হাজারে নেমে এসেছে।

রাজশ্রীর বাবা সুদর্শন বলেন, এখানে ফ্রি বেড পেয়েছেন। স্যালাইন হাসপাতাল থেকে দেয়। কিন্তু স্যালাইন দেওয়ার সুই ও ক্যানোলাসহ স্যালাইন সেট কিনতে হয়ে নিজেদের। অবশ্য ইমার্জেন্সিতে থাকতে তাকে দুই ধরনের স্যালাইন বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে।

সুদর্শন মিত্র বলেন, এখানে চিকিৎসার মান ভালো। কিন্তু যেভাবে প্ল্যাটিলেট কমছে, তাতে কিছু বুঝতে পারছি না। গত কয়েক দিনে অবস্থার অবনতি হয়েছে। এখনো কোনো উন্নতি দেখছি না।