অক্লান্ত এক ইতিহাসবিদ

অধ্যাপক রমেশচন্দ্র মজুমদার এই উপমহাদেশের প্রথম সারির ইতিহাসবিদ। তার গবেষণায় উঠে এসেছে বাঙালির পরিচয়, আদি ভারতের স্বরূপ। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ উপাচার্য। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে গবেষণা তার কাজের অঙ্গ হলেও অধ্যাপনা থেকে অবসর নিলেও জ্ঞানচর্চা থেকে বিরত হননি কখনো। অক্লান্ত এই ইতিহাসবিদ সম্পর্কে লিখেছেন মুমিতুল চৌধুরী

শিক্ষাবিদ ও বাঙালি ঐতিহাসিক অধ্যাপক রমেশচন্দ্র মজুমদার ১৮৮৮ সালের ৪ ডিসেম্বর ফরিদপুরের খন্দরপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আর সি মজুমদার নামেও বিশেষ পরিচিত। তার বাবার নাম হলধর মজুমদার ও মায়ের নাম বিন্দুমুখী দেবী। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন দারুণ মেধাবী। গ্রামের মাইনর স্কুলে রমেশচন্দ্রের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হাতেখড়ি হলেও তা সম্পূর্ণ হয়নি। তিনি ১৯০৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাস করেন এবং র‍্যাভেনশ কলেজে ভর্তি হন। ১৯০৭ সালে রমেশচন্দ্র সুরেন্দ্রনাথ কলেজে স্নাতকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯০৯ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯১১ সালে আর সি মজুমদার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর অধীনে তিনি ইতিহাস বিষয়ক গবেষণা শুরু করেন। এই গবেষণার জন্য ‘প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ’ বৃত্তি লাভ করেন। ১৯১৩ সালে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে তার কর্মজীবন শুরু হয় এবং ১৯১৪ সালের জুলাই মাসে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক নিযুক্ত হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন সময়েই তার বিখ্যাত গবেষণাগ্রন্থ ‘করপোরেট লাইফ ইন অ্যানসিয়েন্ট ইন্ডিয়া’ প্রকাশিত হয়। ১৯২১ সালে পূর্ববঙ্গে পিছিয়ে পড়া মানুষের শিক্ষায় উন্নতির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯২৪ সালে বাংলার আদিপর্বের ইতিহাস বিষয়ে একটি ছোট বই প্রকাশিত হয়, নাম ‘আর্লি হিস্টোরি অব বেঙ্গল’। তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘আউটলাইন অব অ্যানসিয়েন্ট ইন্ডিয়ান হিস্টোরি অ্যান্ড সিভিলাইজেশন’ প্রকাশিত হয় ১৯২৭ সালে। এ সময় তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এ ছাড়াও তিনি ফ্রেঞ্চ ও ডাচ ভাষা শেখেন এবং ভিয়েতনাম অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও

সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ওপর একটি বই প্রকাশ করেন। বইটির নাম ছিল ‘চম্পা’। ১৯২৮ সালে তিনি লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়াম, লেইডেনের কার্ন ইনস্টিটিউটে ও প্যারিসের বিবলিওতেক ন্যাশনালেতে পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি বেলজিয়াম, ইতালি ও জার্মানি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তৃত এলাকা ঘুরে দেখেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ ভ্রমণ পরে তাকে ‘হিন্দু কলোনিস ইন দ্য ফার ইস্ট’ গবেষণাগ্রন্থ লেখার সময় প্রভূত সাহায্য করেছিল।

অধ্যাপক রমেশচন্দ্র মজুমদার ১৯৩৭ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও উপাচার্য থাকাকালীন সময়ে তিনি তিন খ-ে বাংলার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার পরিকল্পনা করেন। এর মধ্যে প্রাচীনকালের ওপর রচিত প্রথম খ- তিনি নিজে সম্পাদনা করেন এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় খ- সম্পাদনার দায়িত্ব অর্পণ করেন ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের ওপর। ১৯৪৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম খ-টি প্রকাশিত হয়। প্রাচীন বাংলার ওপর এটিই ছিল প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস বিষয়ক রচনা। এটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। তিনি ১৯৪২ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন।

ভারতীয় বিদ্যাভবন সিরিজের ১১ খ-ের ‘হিস্টরি অ্যান্ড কালচার অব দ্য ইন্ডিয়ান পিপল’ অধ্যাপক রমেশচন্দ্র মজুমদারের আরেকটি অমর কীর্তি। বিশাল এই কর্মযজ্ঞে ৭৫ জন ইতিহাসবিদ অংশ নেন। বিশাল এই গবেষণা ধারাবাহিকের মোট পৃষ্ঠার অর্ধেকেরও বেশি লিখেছিলেন অধ্যাপক রমেশচন্দ্র মজুমদার নিজেই। শুধু প্রাচীন ইতিহাসবিষয়ক গবেষণার সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন না, তার হাতে সমৃদ্ধ হয়েছে আধুনিক ইতিহাস চর্চাও। তিনি মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের ইতিহাস বিষয়েও গবেষণা করেছেন।

১৯৫০ সালে তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। সেখানে তিনি ‘ইন্দোলজি কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন এই কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ।

সিপাহী বিদ্রোহের ইতিহাস বিষয়ে অধ্যাপক আর সি মজুমদারের গবেষণা বিতর্কের জন্ম দেয়। কিন্তু জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে আপসহীন আর সি মজুমদার মাথা নোয়াননি। তিনি সরকারি সিদ্ধান্ত মেনে না নিয়ে প্রতিবাদ হিসেবে প্রকল্প থেকে অব্যাহতি নেন। ১৯৫৫ সালে মজুমদার নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্দোলজি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৮ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত তিনি শিকাগো ও পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় ইতিহাসের ওপর শিক্ষাদান করেন। ১৯৬৬-৬৮ সাল পর্যন্ত তিনি এশিয়াটিক সোসাইটি এবং ১৯৬৮-৬৯ সাল পর্যন্ত বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি ছিলেন। এইচ সি রায়চৌধুরী ও কালীকিংকর দত্তের সঙ্গে তিনি ‘অ্যাডভান্সড হিস্টোরি অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থ রচনা করেন। একে ভারতীয় ইতিহাসের ওপর স্নাতক পর্যায়ের একটি নির্ভরযোগ্য পাঠ্য হিসেবে মনে করা হয়। অগাধ পান্ডিত্যের জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রিত হয়েছে অতিথি বক্তা ও অতিথি শিক্ষক হিসেবে। ১৯৮০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন এই আজীবন প্রথিতযশা শিক্ষক। জ্ঞানচর্চায় তিনি ছিলেন নিরলস, আদর্শে অটল, শিক্ষক হিসেবে ছাত্রঅন্তপ্রাণ। জ্ঞানচর্চায় ব্রতী সবার জন্য  চিরন্তন অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন এই ইতিহাসবিদ।