সিন্ডিকেট সাতকাহন

দেশে এমন কোনো পেশা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যেখানে ছড়াছড়ি নেই ভুয়াগোষ্ঠীর। বিশেষ করে, যে সমস্ত পেশায় সার্টিফিকেটের বিষয় থাকে এবং সমাজে যার চাহিদা বেশি দেখা যায়, সেই সমস্ত পেশায় ভুয়াদের দলবদ্ধ আগ্রাসন প্রবল। এখন আবার পশু চিকিৎসা নিয়েও শুরু হয়েছে! ভুয়া ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পুলিশ বা সেনাবাহিনী পরিচয় দিয়ে প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে হাঁটা বেশ কঠিন। এই ভুয়াচক্রের সদস্য প্রায়ই গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। কিন্তু তারপর?

কী ধরনের শাস্তি হয়, তাদের বিরুদ্ধে? জানা যায় না। এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, যাতে কোনো পেশার ভুয়া পরিচয় নিয়ে কেউ সগর্বে ঘুরতে ভয় পাবে! যে কারণে পশু ডাক্তার না হয়েও, তাদের পরিচয়েই একটি চক্র গড়ে উঠেছে দেশে। তারা যুব উন্নয়ন থেকে পশুপালন কোর্স সম্পন্ন করেন, স্বল্প সময়ে। এরপর নিজেকে পরিচয় দেন, ‘পশুর ডাক্তার’ হিসেবে!

দুটো বিষয় একবারেই আলাদা, একটি ভেটেরিনারি আরেকটি অ্যানিমেল হাজবেন্ড্রি। সেখানে পশুপালন ও পশুচিকিৎসক এই দুই পরিচয়েই ভুয়া দল শুধু পশুপালনের স্বল্পকালীন ট্রেনিং নিয়ে সগর্বে বলেন- আমি একজন ‘পশু ডাক্তার’! এইরকম ভুয়ারা মিলে দেশব্যাপী গড়ে তুলেছে সিন্ডিকেট। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তির উদাহরণ নেই। কঠোর কোনো শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেই আজ তারা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সর্বত্র। এ বিষয়ে রবিবার দেশ রূপান্তরে ‘ভুয়া পশুচিকিৎসক সিন্ডিকেট’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বলাা হচ্ছে পাবনায় ভুয়া পশুচিকিৎসকদের প্রতারণায় সর্বস্ব হারাচ্ছেন প্রান্তিক গো-খামারিরা। কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই পশুপালনের জন্য যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে কয়েক দিনের প্রশিক্ষণ নিয়েই লিখছেন ব্যবস্থাপত্র, পুশ করছেন অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশনও।

সম্প্রতি পাবনার চাটমোহর উপজেলার হান্ডিয়াল ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্ত এক খামারি মামলা করলে প্রতারণার এ চিত্র উঠে আসে। এসব সিন্ডিকেটের সঙ্গে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের কর্মকর্তাদের যোগসাজশের প্রমাণও মিলেছে। স্থানীয়রা জানান, গো-খামার অধ্যুষিত চাটমোহরে প্রশাসনের নাকের ডগায় দিনের পর দিন প্রকাশ্যে চিকিৎসার নামে প্রতারণা করে আসছে ভেটেরিনারি ওষুধ ব্যবসায়ীদের একাধিক সিন্ডিকেট। ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের দাপটে মুখ খোলার সাহস নেই খামারিদের। এ বিষয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আল মামুন হোসেন মন্ডল বলেন, রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের স্বল্পতায় যুব উন্নয়নের প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেকেই চিকিৎসা দেন, এটি গুরুতর অপরাধ। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এসব ভুয়া চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই যে ‘ব্যবস্থা নেওয়া হবে’, এমন গা-ছাড়া গতানুগতিক কথাই তাদের স্পর্ধার কারণ। সিন্ডিকেট চক্র জানে, তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে! তারা এও জানে, এইসব কথাবার্তা বলতে হয়। না হলে কি হতে পারে? লোকলজ্জা বলেও তো একটা কথা আছে! কিন্তু তারপর অদৃশ্য কারসাজিতে সবকিছু ম্যানেজ হয়ে যায়। যে কারণে ভুয়াচক্র কোনোভাবেই তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে না। যথাযথ আইনের প্রয়োগ না হওয়াতেই, এই দুষ্টচক্রকে সম্ভব হচ্ছে না বিনাশ করা।

সেই যে প্রচলিত প্রবাদ ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা?’ চারদিকে যখন ‘ভুয়াতন্ত্রের’ বিস্তার এবং প্রভাব, তখন একমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষেই সম্ভব তা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। কোনো খামারি বা একজন কৃষকের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না। চাষের একমাত্র সহায়-সম্বল যখন গবাদি পশু, তখন এইসব ভুয়া পশুচিকিৎসকদের ফাঁদে পড়ে ভুল চিকিৎসায় সেই পশুর মৃত্যুতে নিঃস্ব হচ্ছেন খামারি বা কৃষক। সেখান থেকে পরিত্রাণের পথ কে সন্ধান করবে?

অন্তত দেশের ডেইরি শিল্প-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো এইসব প্রতারক পশুচিকিৎসকের হাত থেকে রক্ষা করা একান্ত জরুরি। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত। ভুয়া পশুচিকিৎসক সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে যা করা দরকার, তাই করা হবেÑ এমনই প্রত্যাশা। আমরা শুধু প্রত্যাশা করেই যাই, কর্তৃপক্ষ হয়তো কোনো উদ্যোগ না নিয়ে তারাও প্রত্যাশা (!) করেই যান- যে কারণে কোনো সিন্ডিকেটেরই পতন হয় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের শুধু উত্থানই হয়!