কিছু কিছু ঘটনা, দৃশ্য, মুহূর্ত এমনভাবে মনের মধ্যে গেঁথে যায় যে সারা জীবন অনেক চেষ্টা করেও তা ভোলা যায় না। কাল যখন খবরটা পেলাম, তখন সারা শহরজুড়ে তুলকালাম বৃষ্টি হচ্ছিল, ভয়ংকর গর্জন করে মেঘ ডাকছিল। কালো হয়ে থাকা আকাশে বিদ্যুতের চমকানিতে পৃথিবী আলোকিত হয়ে সাময়িক স্বস্তি দিলেও কোথাও যেন বুকের ভেতরটা চিনচিন করছিল। হতে পারে ভবিষ্যৎ দুর্যোগের আশঙ্কায়। অথবা ভালোবাসার মানুষটার আকস্মিক চলে যাওয়ার খবর শুনে। কবে কে যেন লিখেছিলেন, ‘বর্ষণে আঁধি চমকায়, বাড়ে মেধা’। এমন এক ঘন ঘোর বর্ষার দিনেই তাকে প্রথম দেখেছিলাম। ফোনে দু-একবার কথা হলেও, দেখা সেই প্রথম এবং সেই শেষ।
জীবনে গান, গণসংগীত তো কম শুনলাম না। পিট সিগার, বব ডিলান, জন বায়াস, হ্যারি বেলাফন্টা বাদ দিলাম, ঘরের হেমাঙ্গ বিশ্বাস, নির্মলেন্দু চৌধুরী থেকে বিপুল চক্রবর্তী বা কবীর সুমন... । কিন্তু শহীদ মিনার ময়দানে শোনা গদরকে কখনো ভুলতে পারব না। বেশ কয়েক বছর আগের কথা। স্পষ্ট মনে আছে, ভুল না করলে, তখনো মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি হয়নি। ছিল জনযুদ্ধ বা পিপলস ওয়ার। তাদের ডাকেই এসেছিলেন গুম্মালি ভিট্টল রাও। নকশালপন্থি রাজনীতি করতে এসে যিনি নিজেই নাম নিয়েছিলেন গদর। যার অর্থ বিদ্রোহী। আক্ষরিক অর্থেই গদর ছিলেন মহান বিদ্রোহী। সারা জীবন তিনি মেরুদণ্ড সোজা রেখে প্রতিষ্ঠানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মানুষের গান গেয়ে গেছেন। শত্রুর বুলেট বুকে নিয়েও তিনি অকুতোভয় হৃদয়ে গান গেয়ে জনমনে হয়ে উঠেছিলেন বিপ্লবের আইকন।
সেদিনের নিভু নিভু বিকেলে, বৃষ্টিতে চারপাশ ঝাপসা। তবুও লোকজনের ভিড় কমছে না। স্টেজ লালে লাল। ছাতা কোনো বৃষ্টি মানছে না। সারা শরীর জলময়। এমন সময়, ওই আসে ওই অতি ভৈরব হরষের ছন্দে তিনি মঞ্চে উঠলেন। যেন এক বিদ্যুৎ শিখা। কালবৈশাখী। যেন রঁদা বা হেনরি মুরের ভাস্কর্য। সারা ময়দান প্লাবিত হলো। মুহুর্মুহু তালি আর দৃপ্ত সেøাগানে কলকাতা মুহূর্তে ফিরে গেল ১৯৬৯-এর বাইশে এপ্রিল। যেদিন চারু মজুমদার, কানু সান্ন্যাল ঘোষণা করেছিলেন নতুন এক কমিউনিস্ট পার্টির। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, মার্কসবাদী, লেনিনবাদী। সংক্ষেপে সিপিআইএম-এল। সেদিনের সেই উন্মাদনা, আবেগ নিমেষে ফিরিয়ে আনলেন গদর। গানের একটা কথাও মনে নেই। কিন্তু খালি গায়ে, ঈষৎ স্থূল শরীরের মাদকতা কখনো ভোলার নয়। গলায় গামছা, হাতে লাল পতাকা নিয়ে বৃষ্টি ভেজা গদরকে ভুলিনি। কখনো ভুলতে পারব না।
সেই দিনের পর আর কখনো গদরকে দেখিনি। ফোনে দু-একবার ইন্টারভিউ করেছি। শেষ বার যখন কথা বলি, তখনই কেন জানি না গদরকে খুব ক্লান্ত লেগেছিল। শরীরে নয়, মনে। মনে হয়েছিল ওর মধ্যে কোথাও বোধহয় দ্বন্দ্ব চলছে পার্টি লাইন নিয়ে। মাওবাদীদের স্রেফ জঙ্গলনির্ভর রাজনীতি বোধহয় ঠিক পছন্দ হচ্ছিল না। শিল্পী তো। সংবেদী মন দিয়ে বুঝেছিলেন যে গণআন্দোলন না করলে শুধু গেরিলা যুদ্ধ হতে পারে না। তাছাড়া পার্টির অতি কেন্দ্রিকতা বা নীতিনির্ধারণে উচ্চবর্গের আধিপত্যবাদ মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছিল আদ্যন্ত দলিতদের প্রতি স্নেহশীল গদরের পক্ষে। ভারতের সব কমিউনিস্ট পার্টির মতো মাওবাদী রাজনীতিতেও হিন্দু বর্ণ সিস্টেম বনাম দলিতায়ন হয়তো দুঃখ দিয়েছিল তাকে। তাছাড়া কমিউনিস্ট পার্টিতে শিল্পী সাহিত্যিকদের সঙ্গে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব তো চিরকাল। ঋত্বিক ঘটক তো এই নিয়ে দলিল লিখে কবেই দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। গদর যে দ্বন্দ্বে ছিলেন তা আগেই কিছুটা ইঙ্গিত পেয়েছিলাম, নরেন্দ্র মোদি কথিত আরবান নকশাল খ্যাত গৌতম নভলকরের সঙ্গে কথা বলতে বলতে। গৌতম তখন জেলে যাননি। দিল্লিতে, সিআর পার্কের ফ্ল্যাটে বসে মাওবাদীদের কিছু কিছু সমালোচনা করতে বসে বলেছিলেন যে, দেখুন গদর কী করেন! নভলকারের আশঙ্কা সত্যি প্রমাণ করে গণশিল্পী গদর তারপরে দল ছাড়লেন। তার মৃত্যুতে রহস্য থেকে গেল কেন তিনি মাওবাদীদের সঙ্গ ছাড়লেন! মতভেদ ঠিক কী কী বিষয়ে! চলে যাওয়ার আটচল্লিশ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই ফেসবুক, টুইটারে অনেক আগ মার্কা বিপ্লবী গদরের বিরুদ্ধে গালমন্দ করা শুরু করে দিয়েছেন দেখে বিরক্ত লাগছে।
গদর মাওবাদীদের সঙ্গ ছাড়ার পর নিজেকে বলতেন, আম্বেদকরবাদী। দলিত মনকে বোঝা আমাদের মতো বাবু ভদ্দরলোকদের কাছে খুবই কঠিন। তাই রোহিত ভেমুলারের এসএফআই ত্যাগ বা গদরের মাওবাদীদের সঙ্গ ছাড়াকে নিছক গালমন্দ করে ব্যাখ্যা করা যাবে না। জীবনের দীর্ঘ সময় গদর ভোট বয়কটের রাজনীতি করেছেন। শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালে প্রথম ভোট দেন। শাসকের পক্ষে কখনো গলা মেলাননি গদর। এমন জনপ্রিয় ছিলেন যে তথাকথিত মিডিয়া পাবলিসিটি ছাড়াই তার গান শুনতে, গ্রাম শহরে ছুটে আসতেন আবালবৃদ্ধবনিতা। তিনি ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা। যার সুরে উদ্দীপ্ত হয়ে লাখ লাখ তরুণ নিজেদের জীবনের পরোয়া না করে বিপ্লবের আগুনে ঝাঁপ দিতেন। গদর হয়ে উঠেছিলেন নিজেই এক প্রতিষ্ঠান।
আমি নিজে দেখেছি, বস্তারের গভীর ঘন জঙ্গলে, রাতের অন্ধকারে, মিলিটারি অপারেশনকে তোয়াক্কা না করে মাওবাদীদের গেরিলা স্কোয়াডের সাংস্কৃতিক শাখার অল্প বয়সের ছেলেমেয়েরা কীভাবে, কত দরদ দিয়ে গদরের গান গাইতে গাইতে বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত হচ্ছেন। তাদের পথ ঠিক-ভুল নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। থাকবেও। কিন্তু আজকের চূড়ান্ত ভোগবাদী সমাজে, যেখানে সহজে অনেক একদা বিপ্লবীরাও বিক্রি হয়ে যাচ্ছেন, সেখানে গদরের গান গাইতে গাইতে শহীদ হচ্ছেন আজকের প্রজন্মের তরুণরা তা নিশ্চিত বড় ঘটনা।
গদরের গানে কত কত চিত্রকল্প। ওই উদাত্ত গলায় আমরা যেন দেখতে পেতাম তেলেঙ্গানার কৃষক বিদ্রোহ, গৌতম ঘোষের মা ভূমিতে গদরের গান এখনো কানে বাজে। গদর কোনো নির্দিষ্ট কালের নন। তিনি ছিলেন সর্বকালের কৃষক বিদ্রোহের কণ্ঠ। সিরাজগঞ্জের কৃষক বিদ্রোহ, নুরুল দীন, মজনু শাহ, তিতুমীর কিংবা তেভাগা, নকশালবাড়ী, শিবপুর, নরসিংদীর মুক্তিযুদ্ধ সব সব আবেগ, ইতিহাসের আলোচনায় চিরকাল বেঁচে থাকবেন গুম্মারি ভিট্টল রাও। অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশের তুপরান গ্রামের সাতাত্তর বছরের গদর। গদর চলে গেলেন। কিন্তু গদরের মৃত্যু নেই।
লেখক : প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক
sdastidar27@gmail.com