ক্রেতার সামনেই সরিষার তেল তৈরি বারদী বাজারে

প্রিজারভেটিভ, কেমিকেল, রং আর ভেজালের দুনিয়ায় ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের বারদীতে সরিষার তেল ব্যবসায়ীরা। সয়াবিন তেলের কদর কমে যাওয়ার সরিষার তেলের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে ভালো ও খাটি তেল উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে উঠছে তেল কারখানার মালিকরা। ব্যবসায়ীরা ক্রেতার চোখের সামনে সরিষা থেকে তেল তৈরি করে দিচ্ছেন। সাড়াও পাচ্ছেন বেশ।

জানা গেছে, সোনারগাঁ উপজেলা বারদী এলাকায় মহাসাধক শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর মন্দিরের পশ্চিম পাশে বারদী বাজারে প্রায় ৩৫ বছর আগে সহিদ মিয়া নামে এক ব্যক্তি সরিষার তেলের কারখানা স্থাপন করেন। পরে সরিষার তেলের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে ১৫টির অধিক সরিষার তেলের কারখানা গড়ে উঠেছে এই বারদী বাজারে।

পুষ্টিগুণের কারণে সরিষার তেল হয়ে উঠেছে বিখ্যাত। তাই শুধু বারদীতে নয়, ভক্তরা এটি এখন দেশ-বিদেশেও নিয়ে যায়। বারদীতে যারাই আসেন, তারা সরিষার তেল সঙ্গে করে নিয়ে যেতে কখনও ভুল করেন না।

ইদানীং সয়াবিন বা সানফ্লাওয়ার অয়েলের ব্যবহার বেশি হলেও সরিষার তেলের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। স্পেশাল রান্না, বাঙালির প্রিয় ভর্তা, চাটনি তৈরি থেকে শুরু করে শিশুদের শরীরে মাখা পর্যন্ত অনেক কাজেই সরিষার তেল অদ্বিতীয় বিবেচিত। ফলে বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সরিষার তেলের পাশাপাশি নকল ও ভেজাল তেলের রমরমা। ক্রেতার সামনেই তেল তৈরি করে দেওয়ার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে বেশ জনপ্রিয়।

শাহা পরাণ কারখানার মালিক জানান, সরিষার তেলের মেশিনটি ক্রয় করতে প্রায় ৩ লাখ টাকা (পুরনো ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ), সরিষার তেলের ফিল্টার মেশিন প্রায় ১ লাখসহ অন্যন্ন সরঞ্জাম মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ হয়। কারখানার সরঞ্জাম বলতে কয়েক বস্তা সরিষা, কিছু ড্রাম, মগ, গামলা, বালতি, কাবা (কাক), ওজন মাপার যন্ত্র, খালি প্লাস্টিক বোতল, খৈল (খলদি) রাখার বস্তা ইত্যাদি। একেকটি কারখানায় তিন থেকে চারজন শ্রমিক থাকে। তাদের কেউ সরিষা ঢেলে তেল তৈরি করেন, কেউ তেল ভরেন প্লাস্টিক বোতলে, কেউ টাকা নেন।

সহিদ মিয়া বলেন, প্রথম বারদী বাজারে ৩৫ বছর আগে আমি ইলেকট্রিক মোটর দ্বারা সরিষার তেল ভাঙানোর লোহার মেশিন দিয়ে তেল উৎপাদন করে বাজার বিক্রি করতাম। বর্তমানে যুগের পরিবর্তনের এ পেশায় তেমন আর লাভ না হওয়ায় এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশা বেছে নিয়েছি।

বর্তমানে বংশপরস্পরা কারখানার স্বত্বাধিকারী আব্দুল মতিন দেশ রূপান্তরকে জানান, উপজেলা আলগীরচর গ্রামে আমার বাবা/দাদার মূল ব্যবসাই ছিল কাঠের ঘানিতে সরিষার তেল উৎপাদন করা। এখন কাঠের ও লোহার ঘানির পরিবর্তে বারদী বাজারে প্রযুক্তির আশীর্বাদে ইলেকট্রিক মোটর দ্বারা সরিষার তেল ভাঙানোর লোহার মেশিনে কেবল সরিষায় নয় তিল, তিশিও ভাঙা হয়। ভাঙা হচ্ছে সরিষার সাথে বিভিন্ন দ্রব্যাদি। তাই তেলের সাথেই থাকতে হয়।

তেল কতদিন সংরক্ষণ করা যাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা যে বোতলে তেল বিক্রি করি কমপক্ষে এক বছর ভালো থাকবে। যদি কয়েক মাস পরপর একটু রোদে দেওয়া যায় তাহলে আরও বেশি সময় টিকবে।

গুনবতী ফুড প্রডাক্টস লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী মো. শাহজাহান সরকার বলেন, আমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে (টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, রংপুর, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, জামালপুর, ভূইমরী, নরসিংদী, কুমিল্লা, মানিকগজ্ঞ ও ফরিদপুর) উন্নতমানের দেশীয় সরিষা ও ফ্রান্স, কানাডা, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ইউক্রেন থেকে আমদানিকৃত সরিষার নিয়ে আসি। প্রতিকেজি সরিষা ক্রয় করি ৭৫ টাকায়। তিন কেজি সরিষা থেকে প্রায় এক কেজি তেল বের হয়। প্রতি লিটার তেল আমরা দেশি ২২০, দেশ-বিদেশ মিশ্রিত ২০০ ও বিদেশি ১৮০ টাকা করে বিক্রি করছি। সরিষার নির্যাস মেশিন চেপে তেল করে দেওয়ার পর বাকি মণ্ড খৈলে পরিণত হয়। মেশিনের তাপেই খৈল শুকিয়ে যায়। যা মাছ, মুরগি ও গরুর উৎকৃষ্ট খাদ্য। এক কেজি খৈল পাইকারিতে ৩৬-৩৭ টাকা, খুচরায় ৪০-৪২ টাকা বিক্রি হয়।

তিনি আরও বলেন, সরিষার মানের ওপর নির্ভর করে তেলের পরিমাণ। মোটামুটি সরিষার তিন ভাগের এক ভাগ তেল পাওয়া যায়। ক্রেতার সামনেই সরিষার তেল তৈরি করা হয়। আমি কৃত্রিম ঝাঁজ, রং, কেমিক্যাল ও প্রিজারভেটিভযুক্ত তেলের ভিড়ে আসল সরিষার তেলের স্বাদ মানুষকে দিয়ে সেবা করতে চাই।

উপজেলা জ্যেষ্ঠ কৃষি কর্মকর্তা আফরোজা সুলতানা জানান, অনাবৃষ্টি থাকলেও আমাদের উপজেলা সরিষার উৎপাদন ভালো। সেই জন্যে দেশের চাহিদা পূরণের সরিষার তেল বিশেষ ভুমিকা রাখছে।