গত বছরের আলোচিত সিনেমা হাওয়ায় গুলতি চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকমনে ঠাঁই করে নিয়েছেন নাজিফা তুষি। কিন্তু এরপর আর কোনো কাজে দেখা যায়নি তাকে। এই অভিনেত্রীর বর্তমান ব্যস্ততা জানতেই তার সঙ্গে যোগাযোগ করা। একান্ত সাক্ষাৎকারে মন খুলে কথা বললেন তিনি। যেখানে অভিনয় নিয়ে তার দর্শনের সঙ্গে উঠে এলো আরও অনেককিছুই-
এই মুহূর্তের ব্যস্ততার কথা জানতে চাই…
আপকামিং কাজগুলোর পূর্বপ্রস্তুতি চলছে। হাওয়ার পর এন্ডোর্সমেন্ট-ফটোশুট ছাড়া ওই অর্থে আসলে এখন পর্যন্ত কোনো কাজ করিনি। কারণ হচ্ছে যে কাজগুলো করব সেগুলো ডেভেলপমেন্ট স্টেজে আছে। শীঘ্রই হয়তো শুটে যেতে পারি। এরই মধ্যে রিহার্সেলও করছি। এর বেশি আসলে বলতে পারব না। আমার প্রোডাকশন বা টিম থেকে নিষেধ আছে। তাছাড়া আমি কাজের ব্যাপারে শুটিং শেষ হওয়ার পর বলতে পছন্দ করি। তবে এতটুকু বলতে পারি আমার সব কাজই ওটিটি ও সিনেমা বেজড।
রিহার্সেল কেমন চলছে?
এ নিয়েও খুব বেশি বলব না। বললে তো চরিত্রগুলো ফাঁস হয়ে যাবে (হেসে)। আপকামিং কাজের জন্য আমাকে অনেক কিছু শিখতে হচ্ছে। যেটা স্কুটি বা হাওয়ার ক্ষেত্রেও হয়েছে। আমি ওই পিরিয়ডটাই এখন পার করছি।
আপনার ভাবনা তাহলে সিনেমা ও ওটিটি কেন্দ্রিকই?
ক্যারিয়ারের প্রথম থেকেই আমি নাটক করিনি। হুটহাট কাজ করে ফেলার দক্ষতা আমার নেই। আমি এটা পছন্দও করি না। প্রস্তুতি ছাড়া শতভাগ মনোযোগ দিয়ে কোনো কাজ করতে পারি না। এ কারণে ওটিটি ও সিনেমাকে বেছে নেওয়া। এখানে প্রস্তুতির জন্য সময় নেওয়া যায়। একটু ভেবে কিছু করা যায়, মনোযোগটা সম্পূর্নভাবে দেওয়া যায়। আমার প্রসেসটা এরকম।
কিন্তু দর্শক তো হওয়ার পর আপনাকে নতুন কাজে দেখতে মুখিয়ে আছেন...
হাওয়া’র আগে আমাকে চিনতেন এই সংখ্যাটা হয়তো কম ছিল। দর্শকদের কাছে হাওয়া যেহেতু অনেক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, এ কারণে আমাকে মানুষ চিনেছে বেশি। হয়তো আমার গ্রহণযোগ্যতাও বেড়েছে। এটা ভালো লাগে, আবার চাপও লাগে। ভালো লাগে যে দর্শক ভালো কাজ দেখতে চায়। তবে কাজের ক্ষেত্রে আমি সব সময় সচেতন থাকতে চাই।
একটু ব্যাখ্যা করবেন?
আমি আসলে অভিনয়টা করতে চাই। ছোটবেলা থেকেই এটা করতে চেয়েছি। আমার কাছে এটাই ধ্যান-জ্ঞান। এজন্য শুধু সিনেমা না, আমি ক্যামেরার পেছনের কাজও শিখছি বা করার চেষ্টা করি। আইডিয়া ডেভেলপমেন্ট থেকে শুরু করে স্ক্রিপ্ট রাইটিং, এসবের সঙ্গে যুক্ত থাকলে আমার ভালো লাগে। তাই গোড়া থেকে কাজে ইনভলব হতে চেষ্টা করি। সিনেমা বা এই আর্ট ফর্মটা একদমই থিয়েটারের মতো মনে হয় আমার কাছে। থিয়েটারে কোনো একটা কাজ করার ক্ষেত্রে পুরো টিম একসঙ্গে রিহার্সেল করে। আমার কাছে ফিল্মটাও সেরকমই। আগে থেকে যত ইনভলবমেন্ট থাকতে পারি, কাজের পুরো পিকচারটা আমি তত ক্লিয়ার দেখতে পাই। চাই একটা কাজের চেয়ে যেন আরেকটা কাজ ভালো হয়। একটা কাজে যদি কোনো গ্যাপ থেকে যায়, পরেরটায় যেন সেটা আর না থাকে। টিম এবং আমি নিজে যেন আরও পরিণত হতে পারি।
থিয়েটারের কথা বলছিলেন। এ নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতার কথা যদি বলতেন…
আমি থিয়েটারে খুব কাজ করেছি, তা না। কিছু ওয়ার্কশপ করেছি। নতুন নতুন জিনিস শিখতে আমার ভালো লাগে। ফ্রি থাকলে আমি সেটাই করি। সেটা যে কোনো কিছু হতে পারে। আগেও এই তাড়নাটা ছিল। তবে আগে হয়তো অনেক কিছু এমনিতেই শিখতাম, এখন কাজের জন্য শিখতে হচ্ছে বা জানতে হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত হাওয়াই কি আপনার সেরা কাজ?
এভাবে আসলে বলতে চাই না বা বলতে পারবোও না (হেসে)। আমার তো কেবল শুরু হলো আসলে। আমার মনে হয় মাত্র আমি ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হয়েছি। অনেক দূর হাঁটতে হবে, গ্র্যাজুয়েশন করতে হবে। এরপর না সেরা কাজ বেছে নিতে পারব।
২০১৪ সাল থেকে তো আপনার শুরু। এখন পর্যন্ত জার্নিটাকে কেমন বলবেন?
আমি আসলে ২০১৪ সাল থেকে জার্নিটা ধরবো না। প্রথম একটা সিনেমা করার পর আমি আসলে কোনো কাজই করিনি। আমি বলবো ২০১৯ সাল থেকে হাওয়ার কাজটার মাধ্যমে আমার পথচলা শুরু। এর আগে একটা সিনেমা করেছি কিন্তু তখন বুঝতাম না কিছুই। মাঝে অনেকদিন কাজও করিনি। ২০১৯ থেকে আমি নিয়মিত কাজ করছি। তাই এখান থেকেই আমার পথচলা ধরতে চাই। বলবো সবে শুরু হলো আমার।
জার্নিটা এর আগে থেকে ধরতে চান না কেন?
২০১৪ সালে আমি একটা বিউটি কম্পিটিশনে অংশ নিয়েছিলাম। সেটার প্রথম রানারআপ হয়েছিলাম। এরপর প্রথম কাজ একটা সিনেমা- আইসক্রিম। এর আগে আমি কোনো বিজ্ঞপন বা ফটোশুট কিছুই করিনি। কিছু বুঝতামও না। শুধু এতটুকু জানতাম আমি অভিনয় করতে চাই। আর হ্যাঁ, বড় পর্দার প্রতি আগ্রহ তো ছিলই। এখনকার মতো কাজের পরিধি তখন বিস্তৃত ছিল না। অল্প কাজ হতো। যেহেতু আমি শুরু থেকেই নাটক করতে চাইনি, তাই ওই কাজটা কোনো কিছু না ভেবেই, না বুঝে, না শিখেই করে ফেলেছি। ওই সিনেমাটা করার পর আমি অনুধাবন করেছি আসলে আমি সিনেমার জন্য তৈরি না। এরপর আমি যেটা করলাম- পড়াশোনাটা শেষ করলাম। একই সঙ্গে নিজেকে খোঁজা ও বোঝার দিকে হাঁটতে থাকা। একটা সময় হাওয়া সিনেমার পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। যখন আমাকে হাওয়ার জন্য অডিশন দিতে বলা হলো এবং গল্পটা শোনানো হলো, তখন থেকেই মনে প্রাণে চেয়েছি কাজটা করার জন্য।
এখানেই নিজেকে নতুন করে আবিস্কার করা?
আমার কাজটা করা হোক বা না হোক, আমি যদি ওদের কাছ থেকে কিছু শেখে রিহার্সেল করি তাহলে আমার জীবনে সেটা কাজে লাগবে। এমন ভাবনা ছিল আমার। তাই আমি একদম জোকের মতো লেগেছিলাম। আমার এই ইচ্ছা বা চেষ্টার করণেই হয়তো তাদেরও মনে হয়েছিল আমি পারবো। আমি আসলে খুব বেশি মেধাবি না। তবে আমি আমার কাজ নিয়ে খুব প্যাশনেট, ডেডিকেটেট ও পরিশ্রমি। পরিশ্রমকে যদি শক্তি হিসেবে নেই তাহলে কিছু একটা অর্জন করতে পারবো, এটা আমার মনে হয়েছে। এভাবেই আমার কাজটা করা। শুটিংয়ে যাওয়ার আগে ওই রিহার্সেল পর্বে দীর্ঘ ৭-৮ মাসের যে জার্নি ছিল, তখন আমি অনুধাবন করি অভিনেতা বা অভিনেত্রীর জার্নিটা আসলে কী।
আমার কাছে মনে হয়, অভিনয় শেখার কিছু নেই। আপনি যত জীবন দেখবেন, যত জীবনের বোধ তৈরি হবে, ছয়টা ইন্দ্রিয়কে যত ঝালাই করবেন, যত ভালো জিনিস দেখবেন বা পড়বেন, ভালো পরিবেশের মধ্যে থাকবেন, ভালো জিনিস চর্চা করবেন, তখন আপনার অনুভূতি শার্প হয়, বোধ আরও সূক্ষ হয়। অভিনেতা-অভিনেত্রী যত তার বিষয়গুলো চর্চা করবে, ততই তার ওই দক্ষতা পরিপূর্ণতার দিকে পরিণত হয়। আমিও এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে এগোতে চাই।