ইউরোপিয়ান ফুটবলের স্বর্ণ যুগের সমাপ্তি!

বিরতি শেষে ফের ইউরোপিয়ান ক্লাব প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যাচ্ছে একে একে। আগামীকাল থেকেই যেমন শীর্ষ পাঁচ লিগের মধ্যে ইংল্যান্ড, স্পেন ও ফ্রান্সে শুরু হয়ে যাচ্ছে লিগ। আর সপ্তাহ খানেক পর মাঠে গড়াবে জার্মান ও ইতালিয়ান লিগ।

তবে এবারের ইউরোপিয়ান লিগ ফুটবল প্রেমীদের জন্য একটু অন্য রকম। গেল এক ‍যুগ ধরে সময়ের সেরা হয়ে আছেন লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। এই দুজনের কেউই এবার নেই ইউরোপের লিগে। স্প্যানিশ লিগে এক সময় যাদের দ্বৈরথ ইউরোপিয়ান ফুটবলকেই অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।

শুধু কি এই দুজন! ইউরোপিয়ান ফুটবলের সেরা তারকাদের অন্যতম করিম বেনজেমা, সাদিও মানে, রবের্তো ফিরমিনোরাও ইউরোপ ছেড়ে অন্যত্র নীড় গড়েছেন। এতো এতো তারকার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ইউরোপিয়ান ফুটবলের স্বর্ণ যুগের সমাপ্তি হলো কী না সেই আলোচনাও শুরু হয়ে গেছে।

অনেক ঘটনার পর গত বছরের নভেম্বরে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন রোনালদো। এ বছরের জানুয়ারিতে তিনি যোগ দিন সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসরে। তখনও আসলে কেউ ভাবতে পারেনি সৌদি লিগের অন্য দলগুলোও সামনে কি চমক দিতে যাচ্ছে! সাত-আট মাসের ব্যবধানে সৌদি লিগ এখন নক্ষত্রে ঠাসা লিগে পরিণত হয়েছে। আর এর প্রভাবটা সবচেয়ে বেশি পড়েছে ইউরোপের দলগুলোতে।

স্প্যানিশ লিগের প্রসঙ্গে আসা যাক। ২০১৮ সালে রোনালদো রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে জুভেন্তাতে যোগ দেন। ২০২১ সালে লিওনেল মেসি বার্সেলোনা ছেড়ে পিএসজিতে পাড়ি জমান। রোনালদো চলে যাওয়ার পর থেকেই রিয়ালের প্রাণভোমরা হয়ে ওঠেন করিম বেনজেমা। আর মেসি বার্সা ছাড়ার পর স্প্যানিশ ফুটবলেরই মুখ হয়ে ওঠেন এই ফরাসি ফরোর্ড। কিন্তু এই ৩৫ বছর বয়সীকে এবার কোনোভাবেই ধরে রাখতে পারেনি লস ব্লাঙ্কোসরা। সৌদি আরবের ক্লাব আল ইত্তিহাদে নাম লিখিয়েছে তিনি।

আল ইত্তিহাদ সৌদি প্রো লিগের ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে নিয়েও গত মৌসুমে তাদের টেক্কা দিতে পারেনি আল নাসর। তবে চাপে ফেলতে পেরেছিল ঠিকই। এ জন্যই বুঝি বেনজেমা, এনগোলো কন্তেদের দলে নেওয়া তাদের। কন্তে চেলসি ছেড়ে ইত্তিহাদে যোগ দিয়েছেন।

আল নাসরও কম যায়নি। রোনালদোর সঙ্গে সেখানে জুটি বেঁধেছেন সাদিও মানে।

গত বছরই লিভারপুল ছেড়ে বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দিয়েছিলেন মানে। জার্মান লিগে সুবিধা করতে না পেরে সৌদি লিগকে নতুন ঠিকানা হিসেবে বেছে নিলেন। লিভারপুরের হয়ে ইংলিশ ফুটবলে যিনি নিজের প্রভাব রেখেছিলেন দারুণভাবে।

এদিকে লিভারপুলের আরও দুই শীর্ষ ফুটবলার জর্ডান হেন্ডারসন ও রবের্তো ফিরমিনোও যোগ দিয়েছেন সৌদি লিগে। ফিরমিনো খেলবেন আল আহলিতে। যে দলে আরও যোগ দিয়েছেন রিয়াদ মাহরেজ, এদুয়াঁ মঁদি, ফঁক কেসিয়ের মতো তারকা। হেন্ডারসন খেলবেন আল ইত্তিফাকে। সব মিলিয়ে সৌদি লিগের একাধিক দলে এবার ইউরোপের সেরা খেলোয়াড়দের দেখা মিলবে।

লিওনেল মেসিরও সৌদি লিগে যোগ দেওয়া নিয়ে আলোচনা ছিল। তাকে খুব করে চেয়েছিল আল হিলাল। কিন্তু তাদের লোভনীয় প্রস্তাব মেসিকে আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়। তবে সৌদি আরবে পাড়ি না দিলেও ইউরোপ ছেড়েছেন মেসি। যোগ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে।

দুই বছরের চুক্তি শেষে মেসিকে ধরে রাখতে ব্যর্থ হয় ফরাসি ক্লাব পিএসজি। বার্সেলোনা ফের নিজেদের তাঁবুতে টানতে চেয়েছিল আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ককে। কিন্তু তাদের চেষ্টাও সফল হয়নি।

মেসি এমন এক লিগে নাম লিখিয়েছেন, এই কিছুদিন আগ পর্যন্ত যে লিগকে বুড়িয়ে যাওয়া খেলোয়াড়দের লিগ বলা হতো! ক্যারিয়ারের শেষ লগ্নে ডেভিড বেকমান, ওয়েন রুনি, গ্যারেথ বেলরা খেলেছেন সেখানে। কিন্তু মেসি যেন চিত্রটা বলতে দিলেন।

মেসিও ক্যারিয়ারের শেষ দিকে হয়তো। তবে তার আগমনের পর এমএলএস আরও বড় তারকাদের টানতে সক্ষম হচ্ছে। ইন্টার মায়ামিতেই যেমন মেসি সাবেক দুই বার্সেলোনা সতীর্থকে পেয়েছেন। সার্জিও বুসকেতস ও জর্দি আলবা যোগ দিয়েছেন মায়ামিতে।

এসব থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার, ইউরোপ এখন ফুটবলারদের কাছে স্বপ্নের ঠিকানা নয়। অথচ একটা সময় ধারণাটা এমন ছিল- বিশ্ব ফুটবলে প্রভাব রাখতে ইউরোপে খেলা চাই। মেসি-রোনালদোর ক্ষেত্রেও যেমনটা হয়েছে। নিকট ভবিষ্যতে সেই চিত্র কী পুরোপুরিই বদলে যাবে?