মানুষের মুক্ত চলাচলের বিশ্বায়ন হয়নি

সারা পৃথিবীতে অভিবাসন নিয়ে নানা ধরনের বিতর্ক হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে ধনী দেশগুলোতে অভিবাসনে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জনগণের আগ্রহ আছে। মূলত ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে অভিবাসন প্রত্যাশীরা ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াকে তাদের গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করে। এসব দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি তাদের সমৃদ্ধ জীবনের স্বপ্ন দেখায় এবং অভিবাসনের প্রত্যাশায় সমুদ্র ও জঙ্গল, মরুভূমি অতিক্রম করতে গিয়ে কত-শত মানুষ জীবন দিয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

ভূমধ্যসাগরে অভিবাসন প্রত্যাশীদের বহন করা নৌকা দিগ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াতে বাধ্য হওয়া, অগত্যা ভূমধ্যসাগরেই অঝোরে জীবন বিসর্জন দেওয়া যেন হাজার হাজার মানুষের ভাগ্যের লিখন। এসব জীবনের নেই কোনো মূল্য, পৃথিবীর কোনো সরকারি খাতায় এসব নিহতের নাম নিবন্ধন করা হয় কি না তা অনুমান করা দুষ্কর। তবে জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর পরিসংখ্যান বলছে এ বছর ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টায় ভূমধ্যসাগরে ২ হাজার ৩৮৭ জন নিহত হয়েছে। এরা অতি সাম্প্রতিক উদাহরণ, ৯ আগস্টের সংবাদপত্রের তথ্য অনুযায়ী ইতালির লেম্পেদুসা দ্বীপের কাছে সাগরে ডুবে ৪১ জন অভিবাসীপ্রত্যাশী নিহত হয়, যার মধ্যে তিন শিশুও রয়েছে।

ওদিকে অভিবাসন একটি রাজনৈতিক ইস্যু পুরো ইউরোপ ও আমেরিকা জুড়ে। অনেক ক্ষেত্রে এই অভিবাসন ইস্যুই এসব দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার গতিপথ নির্ধারণ করে দিচ্ছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকাকে আবার মহান করতে চেয়েছিলেন যার অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল আমেরিকায় অভিবাসন বন্ধ করে দেওয়া। আর এজন্য তিনি মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে অভিবাসন ও চাকরি ইস্যুতে যুক্তরাজ্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে বের হয়ে ব্রেক্সিট পর্যন্ত করল।

একই ইস্যুতে ইউরোপে একের পর এক ডানপন্থি সরকার বিভিন্ন দেশের ক্ষমতায় বসছে। যার উদাহরণ হিসেবে ইতালিতে নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে গত বছর যারা চরমভাবে অভিবাসনবিরোধী। একই অবস্থা সুইডেনের ক্ষেত্রেও, যাদের অভিবাসনবান্ধব দেশ হিসেবে আগে পরিচিতি ছিল। অন্যদিকে জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, পোল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরিতে অভিবাসনবিরোধী হাওয়া থেকে জাতীয়তাবাদী ডানপন্থিদের উত্থান ঘটছে একে একে।

অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য আরও একধাপ এগিয়ে যা তাদের সাম্প্রতিক উদ্যোগ ও উদ্বেগ থেকেই বোঝা যায়। গত মে মাসে পাস হওয়া এক আইনে যুক্তরাজ্যে অভিবাসনকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তারা এমন নীতি গ্রহণ করছে যেখানে অভিবাসীদের আটক করে তৃতীয় দেশ রুয়ান্ডায় আশ্রয় কেন্দ্রে পাঠানো হবে।

এর বাইরে এশিয়ার ধনী দেশগুলোর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিবাসনের কোনো সুযোগ নেই, এসব দেশ অভিবাসীদের শুধু শ্রমিক হিসেবে দেখতে পছন্দ করে। একই কথা প্রযোজ্য ইউরোপের কোনো কোনো দেশের ক্ষেত্রেও। যারা অভিবাসনবিরোধী কিন্তু অভিবাসীদের শ্রমিক হিসেবে দেখতে চায়। অভিবাসী শ্রমিক ছাড়া তাদের অর্থনীতি যেন অচল। আমাদের দুর্ভাগ্য গত কয়েক দশক ধরে শুধু পুঁজির চলাচলের বিশ্বায়ন হয়েছে কিন্তু মানুষের মুক্ত চলাচলের বিশ্বায়ন হয়নি। কারণ পুঁজি নিয়ে যাদের কায়-কারবার তারা আবার পৃথিবীতে প্রভূত ক্ষমতাশালী তাদের আটকানো সাধ্য কার? অভিবাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য হওয়া পৃথিবীর সমস্ত ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীর মুক্ত চলাচলের দাবি বাস্তবায়নে তাদের যে সেই রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই তা বলাই বাহুল্য।

নিজ দেশে খেয়ে-পরে ভালো থাকলে কেই-বা বিপদসংকুল অভিবাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে চায়। বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক কাঠামোই অভিবাসন প্রক্রিয়াকে অনিবার্য করেছে। পৃথিবীব্যাপী যদি অর্থনৈতিক ন্যায্যতা তৈরি করা না যায় তাহলে অভিবাসন প্রক্রিয়াকে ঠেকানো যাবে না। পৃথিবীর একপ্রান্তে অর্থনৈতিক বঞ্চনা অন্যপ্রান্তে সম্পদের প্রাচুর্যেই অভিবাসন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে নিঃসন্দেহে।

পশ্চিমা বিশ্ব পৃথিবীব্যাপী অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না করে অভিবাসন বন্ধের যে উদ্যোগ নিচ্ছে তা শুধু অভিবাসন প্রত্যাশীদের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে যার ফলাফল হচ্ছে একের পর এক দুর্ঘটনায় ভূমধ্যসাগর বা ইংলিশ চ্যানেল অসহায় মানুষের প্রাণহানি। পশ্চিমারা অভিবাসনকে যেভাবে অবৈধ কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করছে পৃথিবীর দরিদ্র মানুষের প্রতি অর্থনৈতিক অবিচারকে ও পৃথিবীর সম্পদ কুক্ষিগত করার প্রক্রিয়াকে তারা অবৈধ কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করে না।

অভিবাসনের পেছনে শুধু অর্থনৈতিক কারণই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যে জলবায়ু উদ্বাস্তু তৈরি হচ্ছে তাদের একটা বড় অংশ অভিবাসনে বাধ্য হচ্ছে। পৃথিবীব্যাপী জলবায়ু উদ্বাস্তুরা নানা ধরনের দুর্যোগের কারণে তাদের বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ হচ্ছে।

এসব উদ্বাস্তুদের একটা বড় অংশ প্রাথমিকভাবে দেশের সীমানার মধ্যে নিজেদের আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা করে, তবে অনেকেই দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশে পাড়ি জমায়। অভিবাসনের পেছনে যদি অর্থনৈতিক সংকট হয় অন্যতম কারণ সেই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে অনেক বেশি ভঙ্গুর করে দিচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সংঘটিত বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ। বিশ্বব্যাংকের এক হিসাব মতে ২০৫০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলের ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ তাদের বাস্তুভিটা হারাবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০২২ সালে ৭১ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অন্যদিকে ইউএনএইচসিআর বলছে ২০০৮ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর গড়ে ২১.৫ মিলিয়ন জনগোষ্ঠী আবহাওয়াগত বিভিন্ন কারণ যেমন বন্যা, ঝড়, দাবানল ও অত্যধিক তাপমাত্রার কারণে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছে।

আবার ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক্স অ্যান্ড পিস বলছে ২০৫০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিশ্বব্যাপী ১.২ বিলিয়ন জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হতে পারে। গ্লোবাল ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট ডাটাবেইস-এর তথ্য মতে এক ২০২০ সালেই মূলত জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে ৩০.৭ মিলিয়ন জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হয়। আবার ২০২২ সালে ইউএনএইচসিআর-এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০-এ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন ধরনের দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের কারণে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হওয়া জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯৫ শতাংশই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ বা অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ।

জাতিসংঘের আইন অনুযায়ী একজন উদ্বাস্তুর অন্য দেশে আশ্রয় গ্রহণের অধিকার আছে। কিন্তু জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দেওয়ার বেলায় এই আইনের স্বীকৃতি নেই। ২০১৮ সালের জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের ব্যাখ্যা অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীকে ‘উদ্বাস্তু’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার কথা। কিন্তু আদতে জাতিসংঘের সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন যেমন হচ্ছে না পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত সব জনগোষ্ঠী সব ধরনের মানবাধিকারের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

আশার কথা ২০২২ সালে মিসরের শারম আল শেখ-এ অনুষ্ঠিত ২৭তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় ক্ষয়ক্ষতি তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তবে এই তহবিল কীভাবে গঠন করা হবে এ নিয়ে আলোচনা বিস্তর হলেও, আসছে সম্মেলনে কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ হবে তাই এখন দেখার বিষয়। পাশাপাশি এই তহবিলের মাধ্যমে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের কীভাবে পুনর্বাসন করা হবে এবং কীভাবে সহযোগিতা করা হবে তা বড় আলোচনার দাবি রাখে।

জলবায়ু পরিবর্তনে উন্নত ও ধনী দেশগুলোর দায়ের জায়গা থেকে অভিবাসীদের প্রতি উন্নত ও ধনী দেশগুলোর সহনশীল আচরণই অভিবাসন প্রত্যাশীদের জীবন রক্ষা করতে পারে, পারে তাদের মানবাধিকার রক্ষা করতে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীকে উদ্বাস্তু হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে তাদের জন্য যেমন নিরাপদ আবাসনসহ অন্যান্য অধিকার নিশ্চিত করাতে হবে এবং একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিরাপদ অভিবাসনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হবে, অভিবাসীদের অপরাধী হিসেবে নয় তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আর এজন্য জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে আরও বেশি সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে হবে। আর তাহলেই এই অভিবাসীরা ভূমধ্যসাগরে ডুবে অঘোরে প্রাণ বিসর্জনের হাত থেকে রক্ষা পাবে।

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

psmiraz@yahoo.com