নীরব ঘাতকের নীরব বিদায়!

বাংলাদেশে ক্রিকেটারদের বিদায়টা নীরবেই হয়। সে যত বড় তারকাই হোক। মাঠ থেকে গ্যালারি ভর্তি দর্শকের অভিবাদন নিয়ে অবসরে যাওয়া সবার ভাগ্যে জুটে না। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে নিশ্চয় এখন আর কেউ অবাক হবেন না। ‘নীরব ঘাতক’ তকমা পেয়ে যাওয়া মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ভাগ্যেও জুটল নীরবে বিদায় নেওয়ার পরিণতি। ঠিক যেমনটা ঘটেছিল টেস্ট ক্রিকেটে।

শনিবার মিরপুরের সংবাদ সম্মেলন কক্ষে এশিয়া কাপের দল ঘোষণা করে যেন ওয়ানডের সদর দরজাটাও তার মুখের ওপর বন্ধ করে দিলেন তিন নির্বাচক। ১২ আগস্ট ২০২৩ দিনটা হয়তো আলাদা করেই লেখা হবে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে। মাশরাফীর পর বাংলাদেশ ক্রিকেটে আকাশ থেকে আরেকটি নক্ষত্রের পতন ঘটল এমনটা বলাই যায় এশিয়া কাপের দলে মাহমুদুল্লাহর নাম না থাকায়।

২০০৭ থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে এগিয়ে নেওয়ার পথে পাঁচ ক্রিকেটারের ছিল সবচেয়ে বড় অবদান। মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার নেতৃত্বে তামিম-সাকিব-মাহমুদউল্লাহ-মুশফিকরা মিলে সেরা সাফল্য এনে দিয়েছেন এদেশের ক্রিকেটে। তাই তারা পাঁচে মিলে বনে গিয়েছিলেন পঞ্চপাণ্ডব।

সময়ের সঙ্গে তাদের অধিনায়ক মাশরাফী জায়গা হারিয়েছেন সবার আগে। আনুষ্ঠানিক বিদায় না বললেও ফেরার সুযোগটা আর হয়নি দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল এই অধিনায়কের।

এরপর বিভিন্ন ফরম্যাট থেকে একে একে নাম সরিয়ে নিয়েছেন মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ-তামিমরা।

এবার মাশরাফীর পর সব ফরম্যাট থেকে নামটা মুছে যাচ্ছে মাহমুদউল্লাহর। আসছে বিশ্বকাপে দলে ফেরার পথটা সংকুচিত হয়ে গেছে তার। এবারই শেষবারের বিশ্বকাপে খেলার লক্ষ্য স্থির করেছিলেন মাহমুদুল্লাহ। বড় মঞ্চে হয়তো নিজে থেকেই ক্রিকেট ছাড়ার ঘোষণাটা দিতেন। তবে সেই সুযোগ তিনি পাবেন বলে মনে হচ্ছে না। এশিয়া কাপের স্কোয়াডে থাকলেও একটা সম্ভাবনা ছিল। সেটা যখন হলো না, তখন বিদায় রাগিনীটা হয়তো এখন থেকেই শুনতে পাচ্ছেন মাহমুদুল্লাহ।

তার বিশ্বকাপ দলে থাকা না থাকা নিয়ে কয়েক মাস ধরেই আলোচনা চলছিল দেশের ক্রিকেটে। বাংলাদেশের হয়ে ৬ মার্চ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সবশেষ ম্যাচ খেলার পর থেকেই বিশ্রামের নামে জাতীয় দলে ব্রাত্য হয়ে যান এই অলরাউন্ডার।

বিশ্বকাপে টানা দুটি এবং আইসিসি টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ তিনটি সেঞ্চুরির কীর্তি গড়া মাহমুদুল্লাহ অবশ্য দলে ফেরা-না ফেরা নিয়ে সেভাবে কখনই মুখ খোলেননি। নিজেকে সন্তর্পণে সংবাদমাধ্যম থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন, করেছিলেন শেষ চেষ্টা। প্রাথমিক স্কোয়াডে ডাক পাওয়ার পর তার মধ্যে ফেরার প্রবল ইচ্ছেটা খুব বোঝা গেছে। তবে শেষটা নিজের মতো লিখতে পারলেন না।

মাহমুদউল্লাহ বিশ্বকাপ দলে থাকবেন কি না তার একটা ইঙ্গিত মিলেছে কাল। ইংল্যান্ডের পর আয়ারল্যান্ড ও আফগানিস্তান সিরিজে জায়গা হয়নি।

বিসিবি প্রধান নাজমুল হাসান পাপন, প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদিন নান্নুদের কথায় বারবার তাকে বিশ্রাম দেওয়ার কথা এসেছে। বিশ্বকাপ দলে ফেরানোর একটা ইঙ্গিতও মিলেছিল তাদের কথায়। আবার বোর্ড প্রধান এ কথাও বলেছিলেন যে এশিয়া কাপের দলটাই হবে বিশ্বকাপের দল। তাই যদি হয়, তবে মাহমুদউল্লাহর ফেরার সম্ভাবনা একেবারে নেই বললেই চলে।

কারণ ১৭ সদস্যের এশিয়া কাপ দল থেকে বিশ্বকাপের জন্য বেছে নিতে হবে সেরা ১৫ জনকে। সেক্ষেত্রে মাহমুদউল্লাহর বাইরে থেকে দলে ফেরার সুযোগটাই থাকছে কোথায়?

বাইরে থেকে বলার কারণ নান্নু কাল সংবাদ সম্মেলনে এশিয়া কাপের দলে মাহমুদউল্লাহর না থাকার কারণ হিসেবে টেনে এনেছেন অনেকদিন ক্রিকেটের বাইরে থাকার বিষয়টা।

এবার এই ক্রিকেটার এশিয়া কাপেও খেলছেন না। তাহলে ক্রিকেট থেকে আরও দূরে সরে যাবেন মাহমুদউল্লাহ। এশিয়া কাপের দুই ম্যাচ শেষে বিশ্বকাপ দল ঘোষণার কথা বলেছেন নান্নু। সেক্ষেত্রে দলে ফিরতে নিজেকে প্রমাণের সুযোগটাও থাকছে না মাহমুদউল্লাহর।

নান্নুর কথায় এটাও পরিষ্কার যে টিম ম্যানেজমেন্ট মানে কোচ চ-িকা হাথুরুসিংহে ও অধিনায়ক সাকিবের চাওয়াতেই এশিয়া কাপের দলে নেই মাহমুদুল্লাহ।

শনিবার দল ঘোষণার সময় প্রধান নির্বাচক নান্নু বলেন, ‘মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে নিয়ে অনেক লম্বা আলোচনা হয়েছে প্রথম দিকে। অনেক আলোচনার পর টিম ম্যানেজমেন্ট আমাদের একটা পরিকল্পনা দেয়। সামনে কীভাবে কোন দেশের সঙ্গে খেলবে, কী পরিকল্পনা। ওসব চিন্তাভাবনা করেই রিয়াদকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ম্যানেজমেন্টের পরিকল্পনাকে আমরা মনে করেছি অবশ্যই ভালো। যেহেতু হেড কোচের একটা পরিকল্পনা আছে, টিম কীভাবে পরিচালনা করা হবে। এসব কিছু নিয়েই আলোচনা হয়েছে। আমাদের অধিনায়কের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে।’

বিশ্বকাপের বন্দরে নোঙর ফেলার চেষ্টাটা মাশরাফী বাদে ছিল বাকি চার পা-বের। তবে এখন মনে হচ্ছে মাহমুদুল্লাহর জন্য কাজটা প্রায় অসম্ভবের পর্যায়ে চলে গেল। ৫০ টেস্টে ২ হাজার ৯১৪, ২১৮ ওয়ানডেতে ৪ হাজার ৯৫০ ও ১২১ টি-টোয়েন্টিতে ২ হাজার ১২২ রান আছে তার নামের পাশে।

মূলত ব্যাটিং অলরাউন্ডার হলেও তিন ফরম্যাটে তার শিকার সংখ্যাও নেহাত কম নয়। টেস্টে নিয়েছেন ৪৩, ওয়ানডেতে ৮২ ও টি-টোয়েন্টিতে নিয়েছেন ৩৮ উইকেট।

মাহমুদুল্লাহর মতো বলতে গেলে নিশ্চিত হয়ে গেলেও তামিম ইকবালও বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে আছেন সংশয়ে। সদ্যই ওয়ানডে অধিনায়কত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া তামিমকে সবার আগে হারাতে হবে চোটকে। বিশ্বকাপের দৌড়ে এখন পর্যন্ত তরুণদের সঙ্গে লড়াইয়ে টিকে আছেন অধিনায়ক সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিম।

নান্নু শেষে একটু আশার আলো রাখলেও তা যে ঝড়ের রাতে মোমবাতির মতো দুর্বল- তা বুঝতে বাকি রইল না, ‘এটা বিশ্বকাপের দল না। এশিয়া কাপের দল। এখন এশিয়া কাপ নিয়ে আলোচনা করছি। এশিয়া কাপে টিম ম্যানেজমেন্ট আমাদের একটা পরিকল্পনা দিয়েছে, অতিরিক্ত স্পিনার বা পেসার নিয়ে খেলা এ ধরনের ব্যাপার নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই সিদ্ধান্তটা (মাহমুদউল্লাহর বাদ পড়) নেওয়া।’

১১ জুলাই হারারেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্টে মাহমুদউল্লাহ গার্ড অব অনার পেয়েছিলেন সতীর্থদের কাছ থেকে। এরপর তার টেস্টের বিদায়ের বিষয়টি পরিষ্কার করেননি মাহমুদউল্লাহ নিজে বা বিসিবি। সেই নীরবতা এবার আরও বেশিভাবেই থাকল।

দলে না থাকায় প্রিয় ওয়ানডে ফরম্যাট থেকে অবসরের ঘোষণাটাও যে মাঠ থেকে দিতে পারবেন না। তাই ধরে নেওয়াই যায় ‘নীরব ঘাতকের’ ওয়ানডের বিদায়টাও হচ্ছে নীরবে!