কাব্যের ওএসডি নন্দলাল

‘ধন ধান্য পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’ উচ্চারণের কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় যুক্তি তক্কো দিয়ে পোক্ত করে এক সময় বলেই দিলেন, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি’ একেবারে খাঁটি কথা। চাকরি-চাকরি না করেও বেতন-ভাতা ঈদ আর বৈশাখী বোনাস এবং আমৃত্য পেনশন এমন আহাম্মুকি প্রজাতন্ত্র ছাড়া কোনো দেশে মিলবে না।

আপনি কি বাংলাদেশের কথা বলছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে ওএসডিদের বিরাগভাজন হতে পারি যে আশঙ্কা থেকেই আমার জবাব প্রশ্নই আসে না। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জন্ম ১৮৬৩ সালে আর মৃত্যু ১৯১৩ সালের মে মাসের ১৭ তারিখে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল প্রাইজ পাওয়ার প্রায় ছ’মাস আগে (কপাল ভালো তিনি ট্যাগোরকে কনগ্র্যাচুলেশন’ বলার হাত থেকে বেঁচে গেছেন; তাকে ঠিক এই কথাটি বলতে যারা রেলগাড়ি ভাড়া করে শান্তিনিকেতন গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ যাদের শান্তিনিকেতনী গালমন্দ করে বিদেয় করেছেন।) তিনি যখন ওপার যাত্রার আয়োজন করছিলেন ভঙ্গবঙ্গ জোড়া লেগে গিয়েছিল। তিনিও ঢাকাভিত্তিক বাংলাদেশের কথা বলেননি, আমিই বা বলতে যাই কোন দুঃখে।

সেই দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (আমার বাবার প্রজন্মের কাছে তিনি ডিএল রায়) ‘নন্দলাল’ নামক একজন ওএসডি সৃষ্টি করে আমার দেশপ্রেম দর্শন এলোমেলো করে দিয়েছেন। নন্দলাল দেশপ্রেমিক, মানবপ্রেমিক। স্বদেশের চিন্তায় ডুবে থাকেন সারাক্ষণ। এর মধ্যে দেশে কলেরা এলো (আইসিডিডিআরবি তখন যে কোথায় ছিল!), নন্দলালের মায়ের পেটের ভাই যায় যায় অবস্থায়!

নন্দর ভাই কলেরায় মরে দেখিবে তাহারে কেবা

সকলে বলিল, ‘যাও না নন্দ, কর না ভায়ের সেবা!’

নন্দ বলিল, ‘ভায়ের জন্য জীবনটা যদি দিই

হয় দিলাম কিন্তু অভাগা দেশের হইবে কি?

বাঁচাটা আমার অতি দরকার, ভেবে দেখি চারিদিক;

তখন সকলে বলিল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ, তা বটে তা বটে ঠিক।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায় নন্দলালকে ওএসডি মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন এবং এভাবেই বাকি জীবনটা পার করে দিতে পারেন, সে জন্য দোয়া-খায়েরও করেছেন। সেকালেও কাব্যে ও কাহিনিতে দুএকটি নিষ্কর্মা চরিত্র সৃষ্টি হওয়ার নজির অবশ্যই রয়েছে; একালে রাষ্ট্রীয় কারখানাতেই ওএসডি সৃষ্টি হয়।

হালে ‘ওএসডিনামা’ নামের একটি গ্রন্থ আলোচনায় এসেছে। গ্রন্থের একটি ফুটনোটে একদা ওএসডিদের মধ্যে আমার নামটি রয়েছে। আঁৎকে উঠেছি ‘নন্দলাল জীবন’টা তো ভালোই কাটছিল আবার বা কেউ কোথাও কাজে লাগিয়ে দেওয়ার কথা ভেবে বসে! নিজেকে আশ্বস্ত করি ‘ভয় নাই, ওরে ভয় নাই’ বয়স যখন ঊনষাট পেরিয়ে গেছে সরকারের কাজে লাগাবার আর সুযোগ নেই।

সরকারের কাজ না রাষ্ট্রের কাজ? মিলেমিশে সবই তো একাকার।

ওএসডির অফিস নেই, বেতন তো আছে। ওএসডি যেখানে বসবেন সেটাই তার অফিস। কিছুকাল ওএসডি থাকার পর আতঙ্কিত থেকেছি। আবার না প্রজ্ঞাপন জারি করে বড় ছবি দেখিয়ে আমাকে কাজে লাগিয়ে দেয়! ১৯৭০-এর থেকে বারট্রান্ড রাসেলের ‘ইন প্রেইজ অব আইকলনেস’ নামের একটি প্রবন্ধ অনুবাদ করে বুঝতে পেরেছিলাম, কাজের লোক দিয়ে কিছুই হয় না সভ্যতা গড়ে উঠেছে অলস লোকদের আলসেমি দিয়ে! আমি কেন যে চাকরি জীবনের প্রথম দিন থেকেই ওএসডি হলাম না! কাজ করব না, কিন্তু দেশের মানুষের করের টাকায় বেতন নেব এটা কি সমীচীন হবে? অবশ্যই অসমীচীন। তবে চেয়ারে বসে কাজ করে, প্রতিষ্ঠান ও দেশের ক্ষতি যারা করছেন ওএসডিদের অবদান নিশ্চয়ই তাদের চেয়ে বেশি। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় পাস দেওয়ার পরও ওএসডি হয়ে রাষ্ট্রের ক্ষতি না করার কারণে একটা প্যাকেজ তো পেতেই পারেন। কিছুকাল আমিও পেরেছি।

ওএসডি বিচারপতি

১৩ মার্চ ১৯৫২ পূর্ব বাংলার সরকারের আদেশে ঢাকা হাইকোর্টের ব্রিটিশ বিচারক টমাস হার্বার্ট এলিস ওএসডি হলেন। একই আদেশে ওএসডি অবস্থায় সম্পাদনের জন্য দায়িত্বও দেওয়া হলো তিনি ১৯৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণের তদন্ত করবেন। তাকে দুটি বিষয় নিয়ে কাজ করতে হবে :

১. পুলিশের গুলিবর্ষণ জরুরি ছিল কি না?

২. পুলিশের বলপ্রয়োগ যথার্থ হয়েছে কি না?

২৭ মে ১৯৫২ তিনি প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে দাখিল করলেন। প্রতিবেদনে কী ছিল, তার সঙ্গে আমরা একমত পোষণ করি কি না এটা এখানে বিবেচ্য নয়। দায়িত্ব সম্পন্ন করার পর তার ‘অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি’র কার্যকাল সমাপ্ত হলো। তিনি হাইকোর্টের এজলাসে ফিরে গেলেন। পরে তিনি ঢাকা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হয়েছিলেন। তার গভর্নর পদে আসীন থাকার সময়, ব্রিটেনের একজন সাংবাদিক পাকিস্তানের এই পূর্বাঞ্চল ঘুরে গিয়ে রিপোর্ট দিলেন পাকিস্তান স্বাধীন হলেও অর্ধেকের বেশি সংখ্যক মানুষ এখনো একজন ব্রিটিশ কর্তৃক শাসিত।

বিশেষ রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে বিশেষ বিশেষ কাজ করানোর জন্য উপযুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে ওএসডি করার বিষয়টি বেশ পুরনো। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ এবং ১৯৪৩-এর মন্বন্তরের সময় খাদ্য সরবরাহের সময় তা করতে সিভিল সাপ্লাই ডিপার্টমেন্টে ওএসডি নিয়োগ করা হয়েছিল। ব্রিটেনের সবিনয় হোয়াইট হলেও বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রয়েছিল।

ওএসডিতে মন্দজন থাকেন। মুম্বাই সরকারের রাজস্ব মন্ত্রীর ওএসডি উন্মেষ মহাজন দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে মন্ত্রীর পতনই ঘটিয়েছিল (২০১৬)। আবার ২০০৪ সালে পাঞ্জাবের আইএএস অফিসার টি কে এ নারায়ণকে রিটায়ারমেন্ট থেকে ডেকে এনে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ওএসডি করা হয়েছে।

২০২২-এর নভেম্বরে জারি হওয়া ভারতীয় আমলাতন্ত্রে ‘অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি’ হিসেবে নিয়োগ পাওয়া কজনের নাম উল্লেখ করছি :

নেহা ব্যানার্জি এবং সুভম আগারওয়াল, দুজনেই তরুণ আইএএস অফিসার, তাদের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিবের ওএসডি করা হয়েছে। অনন্যা সিং আইএএসকে ওএসডি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ; পাতিল যোগেশ অশোকরাও আইএএস,  ওএসডি স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য অঞ্চল বিভাগ, সৌলভ পান্ডে ও আশিষ কুমার আইএএস, ওএসডি পঞ্চায়েত ও পল্লী উন্নয়ন; উৎকর্ষ সিং, ওএসডি খাদ্য ও সরবরাহ বিভাগ, রওনক আগারওয়াল, আইএএস, ওএসডি অর্থ বিভাগ; সুমিতা মিশ্র আইএএস, ওএসডি কৃষি ও কৃষক কল্যাণ, হরিয়ানা, জগন্নাথ শ্রীনেভাসন, ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস , ওএসডি রাষ্ট্রপতির সচিবালয়; রুদ্র গৌরব শ্রেষ্ঠ, ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিস, ওএসডি প্রধানমন্ত্রীর অফিস।

কিন্তুর কারণে ওএসডি

ওএসডির মন্দটাই আমরা ধরে রেখেছি। সরকারকে অনন্যোপায় হয়েও কর্মকর্তাদের ওএসডি করতে হয়। পাকিস্তান ফেরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যখন পদায়ন করার মতো পদ খালি ছিল না বাধ্য হয়েই ওএসডি করতে হয়, তাদের কাজকর্ম না থাকলেও চাকরির ধারাবাহিকতা রক্ষা পেয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের একজন সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত এ কে ফয়জুল হক শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের পুত্র হওয়ার কারণে আমার আগ্রহের একজন ছিলেন। আমার কক্সবাজার চাকরিকালে ১৯৯৯ সালে বস্ত্রমন্ত্রী হিসেবে তাকে অভ্যর্থনা জানাবার সুযোগ পাই। তিনি এসেই বললেন, সার্কিট হাউজে যাওয়ার পর ভালো লাগে না, পর্যটনের সাগরিকা রেস্তোরাঁর হেড শেফের সঙ্গে অন্তত কুড়ি মিনিট কথা বলে, কী খাবেন ঠিক করলেন। যে বাবা ৪০টা ফজলি আম খান শেরে বাংলার ছেলে খাবেন না তো কে খাবেন? তিনি চাকরির গল্প শোনাতে গিয়ে বললেন, তার পরিচিত বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের উদ্ধারের ব্রত নিয়ে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়কে (এখন লোকপ্রশাসন মন্ত্রণালয়) অনুরোধ করলেন, তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আছে কি না জানতে চাইলেন। সংস্থাপনের জবাব কোনো অভিযোগ নেই, কেন তিনি ওএসডি তাও তাদের জানা নেই। সংস্থাপন থেকেই তাকে পরামর্শ দেওয়া হলো, আসল জায়গায় যোগাযোগ করুন। আসল জায়গা মানে প্রধানমন্ত্রীর অফিস। এমনিতেই মন্ত্রী, তদুপরি শেরে বাংলার ছেলে, তিনি প্রধানমন্ত্রীর অফিসের শরণাপন্ন হলেন। পদ, পদায়ন পদোন্নতির বিষয়গুলোর সঙ্গে যাদের সম্পৃক্ততা তাদেরও, নিজেও করলেন। তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আছে কি না? তারাও বললেন, নেই।

তাহলে তাকে ওএসডি মানতে হচ্ছে কেন? ভালো-মন্দ একটা পোস্টিং দিয়ে দিন। মানে সংস্থাপনকে বলে দিন।

তখন তিনি একটি মৃদু জবাব পেলেন : বেচারা দীর্ঘদিন ধরে ওএসডি, আমি চেষ্টা করেও কিন্তুটা সরিয়ে তার উপকার করতে পারলাম না।

এবার আমার তদবিরটা করলাম। বললাম, স্যার, আপনি বলে যদি আমাকে ওএসডি করাতে পারতেন আমার উপকার হতো। আমি ঢাকায় বাপের বাসায় থাকতে পারতাম।

তিনি বললেন এটা সহজ কাজ, করিয়ে দেব।

কিন্তু সেটাও ওই শালাকে ধর।

মানে হচ্ছে ওই শালাকে ধর।

ঢাকায় তার সঙ্গে দেখা হলে আমার আবেদনটা মনে করিয়ে দিলাম। আমি ওএসডি হতে চাচ্ছি। তিনি বললেন, কেন হচ্ছে না কেন ‘কিন্তু’ আছে নাকি?

লেখালেখি সূত্রে তার সঙ্গে আমার বেশ কয়েকবার ফোনে কথা হয়েছে। কিন্তু ‘কিন্তু’র রহস্য উদঘাটিত হয়নি।

লেখক: সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

momen98765@gmail.com