পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে যায় গোটা জাতি; শুরু হয় দেশের উল্টো যাত্রা– ষড়যন্ত্রকারী, একাত্তরের পরাজিত শক্তি ও ঘাতকদের আস্ফালন। হত্যা, নির্যাতন, গুম-খুনের আতঙ্কিত জনপদে শুরু হয় সামরিক শাসন। সে সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেছিলেন, ‘সে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি– বঙ্গবন্ধুর সমর্থক, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, প্রগতিশীল রাজনীতিবিদদের ওপর নেমে আসে অত্যাচার-নির্যাতনের খড়গ। শোক প্রকাশের ভাষাকে বন্দুকের নলের নিচে স্তব্ধ করে রাখা হয়েছে! কেউ কথা বলতে পারছে না! বঙ্গবন্ধু তখন দেশে নির্বাসিত নাম– তিনি নিষিদ্ধ– তার নাম উ”চিারণ করা যায় না!’ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর শাসকগোষ্ঠী সচেতনভাবে সমকালীন শিল্পসাহিত্য থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে দিতে চেয়েছিল। ফলে এ সময়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে জীবন বাজি রেখে কবিতা লিখেছিলেন বাংলাদেশের কবিরা।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি কবিতা লেখা কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেছন ‘বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাকে কবিতা লিখতে হয়েছে’। ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’ শিরোনামে সে কবিতা তিনি ১৯৭৭ সালে একুশের ভোরে বাংলা একাডেমির কবিতা পাঠের আসরে পাঠও করেছেন অসীম সাহস নিয়ে। কবিতাটির সাহসী উচ্চারণ : ‘শহীদ মিনার থেকে খসেপড়া একটি রক্তাক্ত ইট/ গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।/ আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।’ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রথম প্রকাশ্যে পঠিত কবিতা এটি।
তবে কবি নির্মলেন্দু গুণ নিজেই ১৯৯০ সালের দিকে একটি লেখায় উল্লেখ করেন, “তবে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর রচনাকালের দিক থেকে প্রথম কবিতার জনক আমি নই, অন্য কেউ। আমার আগে আরবি শিক্ষক, বঙ্গবন্ধুর বাল্যবন্ধু মৌলভী শেখ আবদুল হালিম আরবি ভাষায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা রচনা করেন। আরবি থেকে তিনি নিজে বাংলা করেন এবং আমি সেটি কাগজে লিখে নিই। তিনি বঙ্গবন্ধুর মরদেহ কাফনের কাপড়ে মুড়িয়ে সমাধিস্থ করার পর মনোবেদনা থেকে আরবিতে কবিতাটি লেখেন। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর এটিই প্রথম কবিতা’’।
‘বঙ্গবন্ধু হত্যার দলিল’-এর বরাত দিয়ে লেখক কবিতাটি উদ্ধৃত করেছেন এভাবে‘হে মহান, যাঁর অস্থি-মজ্জা, চর্বি ও মাংস এই কবরে প্রোথিত।/ যাঁর আলোতে সারা হিন্দুস্থান, বিশেষ করে বাংলাদেশ-আলোকিত হয়েছিল।/ আমি তোমার মধ্যে তিনটি গুণের সমাবেশ দেখেছি ক্ষমা, দয়া ও দানশীলতা।/ নিশ্চয়ই তুমি বিশ্বের উৎপীড়িত এবং নিপীড়িতদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলে।/ সেই হেতু অত্যাচারীরা তোমাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে,/ আমি আমরা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কাছে তাদের বিচারের প্রার্থনা জানাই,/ যারা তোমাকে বিনা বিচারে হত্যা করেছে।’
এর পরের কবিতাটি লেখেন বাংলাদেশের উর্দুভাষার কবি নওশাদ নূরী। বাংলাদেশের প্রধানতম উর্দু কবিদের একজন তিনি। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট তিনি ‘উত্থান-উৎস’ কবিতাটি লেখেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলে তাকে নিয়ে লেখা দ্বিতীয় কবিতা এটি। কবিতায় তিনি বলেছেন “... সে আছে, সে আছে-/ সর্বদা হাজির সে যে, অফুরান শক্তি হয়ে/ সে আছে, সে আছে/ সে অমর, মৃত্যুঞ্জয়ী, মৃত্যু নেই তার। [অনুবাদ : আসাদ চৌধুরী]। ৭৫-এর ১৭ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর দাফনের পর তিনি লেখেন ‘নজম টুঙ্গিপাড়া’ শীর্ষক কবিতাটি। এ কবিতায় বলেন তোমরা কি জানো? তোমরা কী জানো?/ পথের শুরুটা হয়েছিল এইখানে,/ পথ খোয়া গেল, হায়, সেও এইখানে।/ [অনুবাদ : আসাদ চৌধুরী]
বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে প্রকাশিত সরাসরি শোক ও প্রতিবাদী কবিতার সন্ধান পাওয়া যায় ১৯৭৭ সাল থেকে। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন প্রকাশ করত ‘জয়ধ্বনি’ পত্রিকা। সে পত্রিকায় ১৯৭৭ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় (১৩৮৩ বঙ্গাব্দের) ‘জাতীয়তাময় জন্মমৃত্যু’ নামে কামাল চৌধুরীর কবিতা প্রকাশিত হয়। এই কবিতার লাইন ‘রক্ত দেখে পালিয়ে গেলে/ বক্ষপুরে ভয়, ভাবলে না কার রক্ত এটা/ স্মৃতিগন্ধময়, দেখলে না কার জন্ম-মৃত্যু জাতীয়তাময়’ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের দেয়ালে পোস্টার সাঁটা হয়েছিল তখন। এ কবিতাটিকে ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত মাসিক সমকাল পত্রিকার বিজয় দিবস সংখ্যা ১৩৮৫-তে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে প্রথম প্রকাশিত কবিতা বলে উল্লেখ করা হয়। ১৯৭৭ সালের ২৬ মার্চ আদমজী জুট মিলের এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কামাল চৌধুরী প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা পাঠ করেন।
অর্থাৎ, প্রাপ্ত রেকর্ড অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম কবিতাটি রচিত হয় আরবিতে এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি উর্দুতে। চতুর্থটি বাংলায়। সেটি লেখেন প্রখ্যাত সাংবাদিক-কবি সন্তোষ গুপ্ত, ১৯৭৫ সালে। রচনার তারিখ নির্দিষ্ট করে জানতে পারিনি। কবিতার নাম ‘রক্তাক্ত প্রচ্ছদের কাহিনী’।
কবি অন্নদাশঙ্কর রায় ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম লিখেছিলেন, যা তার ‘কাঁদো প্রিয় দেশ’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়। তবে অন্নদাশঙ্কর রায় এটিও পরে ১৯৭৮/১৯৭৯ সালের দিকে প্রকাশিত হয়। কাছাকাছি সময়ে ১৯৭৭ সালে সমকাল পত্রিকা ঊনবিংশ বর্ষ প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল মহাদেব সাহার ‘কফিন কাহিনী’। ১৯৭৭ সালের পর ১৯৭৮ সালে বেশ কটি সাহিত্য প্রতিবাদ চোখে পড়ে। এসময় ১৯৭৮ সালে সমকাল পত্রিকায় মোহাম্মদ রফিকের ‘ব্যাঘ্র বিষয়ক’, নির্মলেন্দু গুণের ‘আমি কারো রক্ত চাইতে আসিনি’, ‘রাজদণ্ড’সহ কামাল চৌধুরী, ত্রিদিব দস্তিদার, শাহজাহান চৌধুরীর কয়েকটি প্রতিবাদী কবিতা প্রকাশিত হয়। ১৯৭৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যতরুণ গোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়’ নামে প্রতিবাদী কবিতা সংকলন প্রকাশ করে। এ সংকলনটি বঙ্গবন্ধু-হত্যার পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত প্রথম প্রকাশিত সংকলন। মোট ৩০ জন কবি ও ছড়াকার এ সাহসী সংকলনে লিখেছেন। তার মধ্যে কয়েকজন গল্পকার ও ঔপন্যাসিকও ছিলেন। এ সংকলনে যারা লিখেছেন তারা হলেন : অন্নদাশঙ্কর রায়, দিলওয়ার, হায়াৎ মামুদ, রাহাত খান, মাশুক চৌধুরী, ফরিদুর রহমান বাবুল, সুকুমার বড়–য়া, মোহাম্মদ মোস্তফা, মাহমুদুল হক, আমিনুল ইসলাম বেদু, নির্মলেন্দু গুণ, তুষার কর, আলতাফ আলী হাসু, মোহাম্মদ রফিক, আবদুল আজীজ, শান্তিময় বিশ্বাস, আখতার হুসেন, ভীষ্মদেব চৌধুরী, জিয়াউদ্দীন আহমদ, জাহিদুল হক, ইউসুফ আলী এটম, সিরাজুল ফরিদ, ফজলুল হক সরকার, লুৎফর রহমান রিটন, নূর-উদ্-দীন শেখ, মহাদেব সাহা, জাফর ওয়াজেদ, ওয়াহিদ রেজা, কামাল চৌধুরী ও খালেক বিন জয়েন উদ্দীন।
১৯৭৮ সালের ১৫ আগস্ট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনসুর আলী মিনার (মিনার মনসুর) ও দিলওয়ার চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় এপিটাফ। এখানে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বেশ কটি কবিতা প্রকাশিত হয়। যাদের কবিতা এ সংকলনভুক্ত তারা হলেন : ইউসুফ পাশা, তারাপদ রায়, সানাউল হক খান, ময়ুখ চৌধুরী, মুশফিক হোসাইন, নিতাই সেন, মনসুর আলী মিনার, মৃণাল বড়–য়া, নাজিম উদ্দিন নাজু, শাহাবুদ্দীন নাগরী, দিলওয়ার চৌধুরী, ওমর আলী, আসাদ মান্নান।
১৯৭৮ সালের মার্চ মাসে সাপ্তাহিক মুক্তিবাণী পত্রিকায় বেশ কটি প্রতিবাদী কবিতা প্রকাশিত হয়। ১৯৭৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জে ওয়াহিদ রেজা ও হালিম আজাদের নেপথ্য সম্পাদনায় ‘ড্যাফোডিল এফিউসন গ্রুপ’ প্রকাশ করে ‘পৃথিবী কাছে নোটিশ’। এতে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেকগুলো কবিতা প্রকাশিত হয়। এতে যাদের লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তারা হলেন : অন্নদাশঙ্কর রায়, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, রাহাত খান, ওয়াহিদ রেজা, ইউসুফ পাশা, শিখা চৌধুরী, মোহাম্মদ রফিক, বজলুর রায়হান, বাকী বিল্লাহ, মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, নজরুল ইসলাম মিন্টু, মনীন্দ্র ঘটক, হালিম আজাদ, ইউসুফ আলী এটম, আনিসুর রহমান, শামিমা বেগম, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, গৌতম সরকার, রফিউর রাব্বি, মেহেদী ইকবাল, অশোক গুহ, নাহিদ আজাদ, ফজলুল বারী, মো. আসাদুজ্জামান, নিরঞ্জন রায় নিরু, স্বপন দেব।
সে সময় মিজানুর রহমান মিজান সম্পাদিত খবর পত্রিকাও সাহসী ভূমিকা পালন করে। খবর প্রকাশনী আরামবাগ থেকে ১৯৭৯ সালের ১৫ আগস্ট আবু হাসান শাহরিয়ার ও সৈয়দ আল ফারুকের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ নামে সংকলন। যাদের লেখা কবিতা/ ছড়া অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তারা হলেন : দিলওয়ার, অরুণাভ সরকার, আসাদ চৌধুরী, রাহাত খান, জুলফিকার মতিন, মোহাম্মদ রফিক, ফজল-এ-খোদা, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, ফারুক মাহমুদ, মাহমুদুল হক, আবু হাসান শাহরিয়ার, সৈয়দ আল ফারুক, নাসির আহমেদ, লুৎফর রহমান রিটন, আনোয়ারুল কবীর বুলু, খালেক বিন জয়েন উদ্দীন, মনিরা কায়েস, আমীরুল ইসলাম, মাহমুদ উল্লাহ, মাশুক চৌধুরী, শামসুল ইসলাম, সিরাজুল ফরিদ, লতিফ মোহম্মাদ, তুহীন রহমান, মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম, রোকেয়া বেগম কেয়া, আতাউল করিম, সাইফুল্লাহ্ মাহমুদ দুলাল, আসলাম সানী, আনিসুর রহমান আখন্দ, যৌবন চৌধুরী, মনজুরুর রহমান, রিটন রহমান, ফজলুল হক সরকার।
১৯৭৯ সালের ১৫ আগস্ট এস এম ইউসুফের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সংকলন ‘বঙ্গবন্ধু’। এ সংকলনে যাদের কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তারা হলেন : সুফিয়া কামাল, আসাদ চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, মুহম্মদ নুরুল হুদা, ত্রিদিব দস্তিদার, ফিউরি খোন্দকার, কামাল চৌধুরী, এম কোরবান আলী দৈনিক সংবাদ পত্রিকাও তখন সাহসী ভূমিকা পালন করে। ১৯৭৯ সালে সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত হয় গ্রন্থাকারে মিনার মনসুর ও দিলওয়ার চৌধুরী সম্পাদিত সংকলন গ্রন্থ ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’। এতে যাদের কবিতা রয়েছে তারা হলেন : অন্নদাশঙ্কর রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আসাদ চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, জাহিদুল হক, ওমর আলী, শাহাদাত বুলবুল, ফজলুল হক সরকার, শামসুল আলম সাঈদ, খালিদ আহসান, কামাল চৌধুরী, মিনার মনসুর, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, জাফর ওয়াজেদ, দিলওয়ার চৌধুরী, আলমগীর রেজা চৌধুরী, হারুন রশিদ, নাজিম হাসান, সুজাউদ্দিন কায়সার, বিনতা শাহীন, সনজীব বড়–য়া, রবীন্দ্রনাথ অধিকারী, ইকবাল করিম, স্বপন দত্ত। ১৯৭৯ সালে আসলাম সানী ও ইউসুফ হাসান সম্পাদিত ‘শোক’ প্রকাশিত হয়। মোট ৩টি সংখ্যা প্রকাশিত হয় ‘শোক’ সংকলনে। এতে লিখেছেন : কামাল চৌধুরী, আলমগীর রেজা চৌধুরী, আসলাম সানী, লুৎফর রহমান রিটন, মাশুক চৌধুরী, জাফর ওয়াজেদ, রবীন্দ্রনাথ অধিকারী, ইউসুফ হাসান, মুহম্মদ নুরুল হুদা, সপ্তক ওসমান, ফজলুল হক সরকার, ফারুক মাহমুদ, ত্রিদিব দস্তিদার। কবি শামসুর রাহমান অনূদিত পাবলো নেরুদার কবিতা ‘শোক’ এর ৩য় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। এছাড়াও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সংকলন, ‘মুজিব লোকান্তরে, মুজিব বাংলার ঘরে ঘরে (১৯৭৯)’ ইত্যাদিসহ বেশ কটি সংকলন প্রকাশিত হয়।
বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ভারতের বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা কবি কবিতা লেখেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রতিত্তোরে সম্ভবত সত্তর দশকের শেষদিকে মনিপুরের অন্যতম শীর্ষ কবি এলাংবম নীলকান্ত ‘শেখ মুজিব মহাপ্রয়াণে’ শীর্ষক একটি কবিতা লেখেন যা তার ‘তীর্থযাত্রা’ (১৯৮৫) গ্রন্থে স্থান পায়। ‘শেখ মুজিব মহাপ্রয়াণে’ কবিতায় লিখেছেন: হে বঙ্গবন্ধু/ নিষ্ঠুর বুলেটের আঘাতে নিহত হয়েছো শুনে/ পেরিয়েছি আমি এক অস্থির সময়/ খোলা জানালা দিয়ে সুদূর আকাশের দিকে/ পলকহীন তাকিয়ে থেকেছি/ উত্তরহীন এক প্রশ্ন নিয়ে/ বিন্দু বিন্দু রক্ত দিয়ে গড়ে তুলেছিলে স্বদেশ তোমার/ কিন্তু এ কোন প্রতিদান পেলে তুমি? (অনুবাদ : এ. কে. শেরাম) গান্ধীকে নিয়ে কবি অরুণ মিত্র একটি কবিতা লেখেন ‘আজকের দিন যদি ব্যর্থ হয় তাহলে আছে কাল, একশো গান্ধী যদি মিথ্যে হয় তবুও থাকে সত্য’ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর এই পঙ্ক্তিতে গান্ধীর স্থানে মুজিব বসিয়ে শঙ্খ ঘোষ বলেন ‘আজকের দিন যদি ব্যর্থ হয় তাহলে আছে কাল, একশো মুজিব যদি মিথ্যে হয় তবুও থাকে সত্য।’
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের কবিরা অসংখ্য কবিতা রচনা করেছেন– এ ধরনের কবিতায় শোকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যক্তি চরিত্র, অর্জন ও গৌরবের মহিমা। কোনো কোনো কবিতায় আমরা দেখি তার জীবন-সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ মিলেমিশে একাকার। বিজয়গাথা ও শোকের মিলিত প্রবাহে স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণে কবিতা হয়ে উঠেছে বাঙালির ইতিহাসেরও আকর। বিরুদ্ধ সময়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা কবিতাগুলো আমাদের জাতিসত্তার হাজার বছরেরও দীর্ঘ ইতিহাসের অন্তহীন পরিভ্রমণের রূপক যেসব ছিল বলেই পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুকে আবারও স্বমহিমায় শিল্প সাহিত্যে ও ইতিহাসে পুনরুজ্জীবন দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
তথ্যসূত্র : ১. মুজিবপিডিয়া (প্রধান সম্পাদক কামাল চৌধুরী, সম্পাদক ফরিদ কবির) ২. এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়, ১৯৭৮ ৩. শহীদ বঙ্গবন্ধুর ওপর রচিত প্রথম আরবি কবিতা, মাওলানা এম এ রহমান, দৈনিক কালের কণ্ঠ, ১৭ জুন ২০১১ ৪. রাজু আলাউদ্দিন গৃহীত নির্মলেন্দু গুণের সাক্ষাৎকার, বিডিআর্টস, ১৫ আগস্ট ২০১৫ ৫. নওশাদ নূরী ও তার একটি কবিতা, মফিদুল হক, দৈনিক যুগান্তর, ২৬ জুলাই ২০১৯