চুক্তি স্বাক্ষরের পর সংবাদ সম্মেলনে বুধবার এক ক্রীড়া সাংবাদিক সাবিনা খাতুনের কাছে জানতে চাইলেন, "আপনার অনুভূতি কী?" সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের অধিনায়কের জবাব, 'এটা আমার একার কিছু না। আমাদের সবার আবদার পূরণ হয়েছে। এর জন্য বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতিকে সবার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।'
সত্যিকারের নেতার মতোই কথা বলেছেন সাবিনা। তিনি কেবল দলের অধিনায়ক নন, দলের সবচেয়ে সিনিয়র, সবচেয়ে সেরা পারফরমার। শুধু তাই নয়, নারী ফুটবল ইতিহাস লিখতে গেলে সবার আগেই রাখতে হবে তার নাম। বছর কুড়ি বাদে হয়তো তিনিই হবেন নারী ফুটবলের কিংবদন্তি।
অথচ এই সাবিনার সঙ্গে কী ন্যায় বিচার করেছে বাফুফে? প্রশ্নটা উঠে যাচ্ছে ৩১ ফুটবলারের সঙ্গে বাফুফের চুক্তির পরেই। সাবিনার নারী ফুটবলে অবদানটাকে যে আলাদা করে বিবেচনায় নেয়নি বাফুফে।
৩১ ফুটবলারের মধ্যে যে ১৫জন মাসিক ৫০ হাজার টাকা বেতন পাবেন, তাদেরই একজন সাবিনা। অথচ এই চুক্তির আগে অন্যদের দ্বিগুণ অর্থ প্রতি মাসে পেতেন নারী ফুটবলের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন সাবিনা। নতুন চুক্তিতে একটি পয়সাও তাকে বাড়িয়ে দেয়নি বাফুফে। এ নিয়েই উঠে গেছে প্রশ্ন।
বুধবার বাফুফে যে চুক্তিটা মেয়েদের সঙ্গে করেছে, তার জন্য তারা প্রশংসা পেতেই পারে। প্রতি মাসে কেবলমাত্র মেয়েদের বেতন বাবদ বাফুফেকে গুণতে হবে ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এর বাইরে উন্নতমানের খাবার, তাদের জন্য ক্রীড়া সরঞ্জামাদী, কোচ, অফিশিয়ালদের সম্মানী তো আছেই।
আকালের দিনে সাফজয়ী মেয়েদের সব দাবি মেনে নেওয়ায় বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন ধন্যবাদ পেতেই পারেন। বুধবার সংবাদ সম্মেলনে এসে মেয়েদের আরও বেশি দিতে না পারার জন্য আফসোসও করেছেন বাফুফে প্রধান। ভবিষ্যতে এই অঙ্কটা যাতে বহুগুণে মেয়েরা বাড়িয়ে নিতে পারে, তার জন্য তাদের ভালো পারফরম্যান্স করতে অনুরোধও জানিয়েছেন।
সবকিছুই ঠিক ছিল। তবে ৩১জনের তালিকা ও বেতন নিয়ে লুকোচুরির নাটক করে অহেতুক বিতর্ক উসকে দিলেন। এরপর নানামুখী চাপে ঠিকই সেই তালিকা বেতনসহ প্রকাশের পর উঠে গেছে সাবিনার ন্যায় বিচার পাওয়ার প্রশ্ন।
নারী ফুটবল আন্তর্জাতিক মঞ্চে পা রাখার প্রথম দিন থেকেই জাতীয় দলের হয়ে খেলছেন সাবিনা। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ যে আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলো খেলেছে, সাবিনা তার সবগুলোতেই খেলেছেন এবং অনেক ম্যাচে তার গোলেই জয়ের উল্লাসে মেতেছে গোটা দেশ। ৫০ ম্যাচে তার নামের পাশে গোল ৩৩টি।
গত বছর সেপ্টেম্বরে কাঠমান্ডুতে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশকে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল সাবিনার। সর্বোচ্চ গোলদাতার পাশাপাশি সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। অসামান্য সেই অর্জনের পর অনেক ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান দলের পাশাপাশি সাবিনার জন্য রেখেছে বাড়তি স্বীকৃতি। সম্প্রতি শেখ জামাল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ পুরস্কার পেয়েছেন সরকারের কাছ থেকে। বাইরে জগৎ যখন সাবিনাকে আলাদা আসনে বসাচ্ছে, সেখানে ঘরেই বঞ্চিত হলেন দেশের নারী ফুটবলের ইতিহাসের সব পর্যায়ের সর্বোচ্চ গোলদাতা। অথচ এই চুক্তির আগে সবাই যখন পেতেন মাসিক ১০ হাজার টাকা, তখন সাবিনাকে দেওয়া হতো ২০ হাজার টাকা।
মেয়েদের দাবি-দাওয়া, আবদারের সবকিছুই ছিল সাবিনার কাছে। তিনিই সামনে থেকে বাফুফে কর্তাদের কাছে মেয়েদের আবদারগুলো জানিয়ে অনেক সময় তোপের মুখেও পড়েছেন। তারপরও লড়াইটা চালিয়ে গেছেন সবার কথা ভেবে, মেয়েদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে। সেই লড়াইয়ে অবশেষে জয় হয়েছে মেয়েদের, তবে সাবিনা পুরোপুরি জিততে পারেনি।
যে ১৫ জন ফুটবলার ৫০ হাজার টাকা করে বেতন পাবেন, সেই তালিকায় চোখ রাখলেই যে কেউই মেনে নিবে, সাবিনার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে। এই তালিকায় এমন কিছু নাম রয়েছে, যারা সাবিনার চেয়ে বয়সের অনেক ছোট, যোগ্যতায় তো বটেই। অনেকে জাতীয় দলের একাদশে মোটেই নিয়মিত নন। তারপরও তারা পাচ্ছেন সাবিনার সমান বেতন।
এ নিয়ে প্রশ্ন করতেই সাবিনা দেশ রূপান্তরকে প্রথমে বললেন, 'নতুন চুক্তিতে অনুমতি ছাড়া মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলা নিষেধ।' বেতনের বিষয়ে প্রশ্ন করতে সাবিনার বরাবরের মতো হিসেবি উত্তর, 'এ নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। আমি সবার অধিকার আদায়ের চেষ্টা করেছি। নিজের জন্য চাইনি। বাফুফে যেটা ভালো মনে করেছে, সেটাই করেছে। আর সেটা মেনে নেওয়া ছাড়া কোন উপায়ও নেই। ব্যক্তিগতভাবে আমার কোন অভিযোগ নেই।'
অন্য সবার অধিকার আদায়ে লড়াই করেছেন বলেই হয়তো ব্যক্তিগত রোষের শিকার হলেন সাবিনা। এ নিয়ে কথা বলতে ফোন করা হয়েছিল বাফুফের মহিলা ফুটবল কমিটির প্রধান মাহফুজা আক্তার কিরণকে। তবে তার ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। পরে জানা গেছে, মহিলা বিশ্বকাপের ফাইনাল দেখতে তিনি এখন অস্ট্রেলিয়ার বিমানে। যাদের এনে দেওয়া সাফল্য পুঁজি করে আজ তিনি দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছেন, সেই নারী দলের অধিনায়ক সাবিনাকে বঞ্চিত করার দায়টা কী এড়াতে পারবেন কিরণ?