আলেক্সান্দার দ্যুমার লেখা ‘কাউন্ট অব মন্টি ক্রিস্টো’টা পড়েছেন তো! ফরাসি সাহিত্যিকের সেই উপন্যাসের নায়ক এডমান্ড দান্তেজ। মিথ্যে অভিযোগে ফাসিয়ে যাকে পাঠানো হয়েছিল ‘শেটো ডিফ’ নামক কারাগারে। যেখানে একবার গেলে কেউ আর ফিরে আসে না। একমাত্র মৃত্যুই তাকে বাইরে আনতে পারে। কিন্তু এডমান্ড ১৪ বছর পর কৌশলে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন। সমুদ্রে তাকে ফেলে দেওয়ার পর যখন ভেসে উঠেছিলেন, তখন মনে হয়েছিল কত জন্ম পর পৃথিবীর বাতাস তার গায়ে এসে লাগল। সে রাতে মার্সেইয়ের আকাশ চাঁদের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছিল, এডমান্ড যেন সেই আলো দেখার অপেক্ষায় ছিলেন অনন্তকাল ধরে। তারপর ধীরে ধীরে হয়ে উঠেন পৃথিবীর ধনাঢ্যদের একজন। অপূর্ণতার প্রায় কিছুই বাকি রাখেননি তিনি।
লিওনেল মেসিকে কাউন্ট অব মন্টি ক্রিস্টোর এডমান্ড দান্তেজের আসনে বসানোই যায়। একটি ট্রফির জন্য আর্জেন্টিনার হাহাকার ছিল ২৮ বছরের। একটি বিশ্বকাপের জন্য অপেক্ষা ৩৬ বছরের। যেগুলোর খুব কাছে গিয়েও ছুঁতে পারছিলেন না ফুটবল জাদুকর। বারবার হোঁচট খাচ্ছিলেন। কখনও মহাদেশে, কখনও বা বিশ্বমঞ্চে। চোখের জলই যেন বারবার সঙ্গী হচ্ছিল তার। অভিমানে তো অবসরটাই নিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। তবে সেটা ভেঙে আবার ফিরেছেন ফুটবলে। বিশ্বকে মাতিয়ে শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছেন কাতার বিশ্বকাপে। বছর তিনেক আগেও যে মেসির অর্জনের ঝুলিতে ছিল না কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা। সেই তিনিই কিনা এখন আর্জেন্টিনার মহাতারকা। যার আর কিছু নেই পাওয়ার। সম্ভাব্য সব শিরোপাই জেতা হয়ে গেছে তার।
ক্যারিয়ারের সব জেতা মেসি ফুটবলকে আরও রঙিনভাবে উপভোগ করতে চান। তাই পাড়ি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে। যোগ দিলেন মেজর লিগ সকারের দল ইন্টার মায়ামিতে। তবে সেখানে গিয়ে শুধু উপভোগই করছেন না, রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়েছেন। সঙ্গে আমুল পরিবর্তন আর অবিশ্বাস্য সাফল্য এনে দিয়েছেন ডেভিড বেকহ্যামের মালিকানাধীন ক্লাবটিকে।
ইন্টার মায়ামি ফুটবল ক্লাব ২০১৮ সালের ২৯ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে মেজর লিগ সকারে প্রথমবার অংশ নেয় ২০২০ সালে। অভিষেক আসরে তারা ৭ জয়, ৩ ড্র্ আর ১৩ হারে পয়েন্ট তালিকার দশম স্থানে ছিল। সে বছর ম্যাচ খেলেছিল ২৩টি। তবে পরের বছর ম্যাচ বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪টিতে। জয়ও এসেছিল ১২টিতে। কিন্তু তলিয়েছে পয়েন্ট তালিকায়। একধাপ পিছিয়ে ২০২১ মৌসুমে ১১তম স্থান দখল করে তারা। ২০২২ মৌসুমে তারা দেখায় চমক। সেবার ষষ্ঠ স্থান অর্জন করে নিশ্চিত করে পরের পর্ব।
মেজর লিগ সকার ফ্র্যাঞ্চাইজি ভিত্তিক একটা টুর্নামেন্ট। বলা হয়ে থাকে, আইপিএলের ধারণা এই এমএলএস থেকেই নেয়া। ইস্টার্ন ও ওয়েস্টার্ন কনফারেন্স নামে আলাদা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে বর্তমানে খেলে ২৯টি দল। দুই গ্রুপ থেকে সেরা ছয় দল যায় পরের পর্বে। সেখানে প্লে অফ খেলে। হারলেই নিশ্চিত হয় বিদায়। এমএলএসের গত মৌসুমে প্লে অফে গিয়েছিল মায়ামি। কিন্তু নিউ ইয়র্ক সিটির কাছে ৩-০ গোলে পরাজিত হয়ে তারা বিদায় নেয়।
গত আসরে চমক দেখালেও এই আসরে যেন খেই হারিয়ে ফেলেছে মায়ামি। এখন পর্যন্ত ২২ ম্যাচ খেলে জয় পাঁচটি ড্র তিনটি। বাকি ১৪টিতেই হার। তাতে মাত্র ১৮ পয়েন্ট নিয়ে তারা আছে পয়েন্ট তালিকার তলানীতে। হারের বৃত্তেই বন্দী ছিল দলটি। ড্র পাওয়াটাই যেন তাদের সৌভাগ্যের ছিল। জয়গুলোও আসত কষ্টে সৃষ্টে।
এমনই যখন পরিস্থিতি, তখনই শুরু হলো লিগস কাপ। যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ক্লাবগেুলোও অংশ নেয়। নিজ দেশের ক্লাবের সঙ্গেই যাদের বেহাল দশা, তারা মহাদেশের টুর্নামেন্টে তো দেবে শুধুই হতাশা! এর বেশি ছিল না কারোরই প্রত্যাশা। টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তেই দলে যোগ দিলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা মেসি। আর ফুটবল জাদুকরের স্পর্শ পেয়েই কিনা বদলে গেল মায়ামি।
যে দলটার কাছে জয় ছিল একসময় ঝড়ে বক মরার মতো, সেই দলটাই এখন লড়াই করছে প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে। লিগস কাপের গ্রুপ পর্ব থেকে সেমিফাইনাল। সবগুলো ম্যাচেই গোল পেয়েছেন তিনি। সঙ্গে করিয়েছেন সতীর্থদের দিয়েও। কোয়ার্টার ফাইনালে তো মায়ামি পেয়েছে নাটকীয় জয়। তারপর বুধবার ভোরে সেমিফাইনালে দাপুটে জয় নিয়ে গেছেন ফাইনালে। আগামী ২০ আগস্ট ফাইনালে মুখোমুখি হবে তারা এমএলএসেরই আরেক ক্লাব নাশভিলের। এই টুর্নামেন্টের ফাইনাল দিয়েই প্রথমবার কোনো শিরোপা নির্ধারণী খেলতে নামবে মায়ামি।
অথচ লিগস কাপ শুরুর আগের ১০ ম্যাচে মাত্র ১ জয় ছিল দলটির। বিপরীতে হার ৬, ড্র ৩। সুপার ফ্লপ সেই দলটাই কিনা মাসখানেকের ব্যবধানে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। মহাদেশীয় টুর্নামেন্টের টানা ৭ ম্যাচ জিতে নাম লিখিয়েছে ফাইনালে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে অর্জন এসেছে ফুটবলের মহাতারকা, আর্জেন্টাইন জাদুকর লিওনেল মেসির পায়ের জাদুতে। যে জাদুর ছোঁয়ায় মায়ামি নিশ্চিত করেছে কনকাক্যাফের টিকিটও। ঠিক যেভাবে মরুভূমির বুকে তারার আলোয় ফুটবলের কালপুরুষ হাতে তুলে নিয়েছিলেন আরাধ্য সোনালি স্মারক। আর তাতেই তিনি হয়ে উঠছেন ফুটবলের এডমান্ড দান্তেজ।