ভয়ংকর বিপদে মন্ত্রী বেচারা!

রং করা সরকারি কর্মচারী

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দু ধরনের কর্মচারীর দেখা মেলে। যাদের একদল, ‘দিন আনি দিন খাই’ পদ্ধতিতে অফিস করে। তারা কোনো ‘সাতে-পাঁচে’ নেই। সরকারি দায়িত্বটুকু পালন করে ঘরে ফেরে। কর্তৃপক্ষ কৌশলে বা চাপ দিয়ে তাদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নেয়।

আরেক ধরনের কর্মচারীরা ‘বর্ণচোরা’। অর্থাৎ তাদের ভেতরে এক বাইরে আরেক। মুহূর্তে রং বদলে ফেলতে পারে। তারা অনায়াসে দোষ চাপিয়ে দেয় নির্বাচিত প্রতিনিধির ওপর। কারণ কর্মচারীদের জনগণের ভোট পাওয়ার দরকার দরকার হয় না। তাই নেই জনপ্রিয়তা ধরে রাখার বালাই। যার সুযোগ এসব রং বদলকারীরা নেয়।

‘দিন আনি দিন খাই’ যারা, তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে কাজে লাগানো যায়। কিন্তু রং বদল করা কর্মচারীরা সাংঘাতিক। তারা ডুবিয়ে দেয় সরকারকে। সরকার ডুবে গেলে তখন দাঁড়িয়ে শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করে নিজেদের চৌকস বা কৌশলী হিসেবে। তারা প্রয়োজনে মন্ত্রী যেমন চায় তেমন রং ধারণ করতে পারে। মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী মাত্র একজন। শত শত কর্মচারীর কেউ মন্ত্রীর লোক না। যে কারণে বিপদে থাকেন মন্ত্রী বেচারা!

অধিকাংশ উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশে একজন মন্ত্রীর সঙ্গে তার পছন্দের ১০ থেকে ১৫ জন বিশেষ সহকারী দেওয়া হয়। যাকে যুক্তরাষ্ট্রে ‘স্পয়েল সিস্টেম’ বলে। মন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বা স্পেশাল অফিসার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিষয়ে মন্ত্রীকে পরামর্শ দেয়। এদের সঙ্গে সচিবালয়ের যোগ খুব কম থাকে। কর্মচারীরা যা জানায় বা জনগণ থেকে যেসব দাবি আসে– সেগুলো নিয়ে তাদের মাধ্যমে পর্যালোচনার সুযোগ থাকে মন্ত্রীর। তারা পরামর্শ দেন যেন মন্ত্রী ‘মিস গাইডেড’ না হন, জনবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত না নেন।

আমাদের দেশে মন্ত্রীর জন্য এমন কেউ নেই। তাই মন্ত্রী রং বদল করা কর্মচারীর দ্বারা প্রভাবিত হন এবং তাদের ওপর নির্ভর করতে হয় বেশি। যারা কৌশলে মন্ত্রীকে খুশি করে নিজেদের দলে ভিড়িয়ে নেয়। দিন শেষে মন্ত্রী বিপদে পড়েন, সরকারি দলের ক্ষতি হয় এবং নির্বাচনেও ভরাডুবি হয়। আর খুশিতে রং বদল করা করা কর্মচারীরা বগল বাজায়!

আমাদের দেশে কর্মচারীরা সরকারের সবচেয়ে বড় উপদেষ্টা। কারণ, তারা যেমন কোনো গৃহীত সিদ্ধান্তের অতীত জানে তেমনি বুঝতে পারে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎও। প্রতিটা কর্মচারী যেন জীবন্ত লাইব্রেরি বা তথ্য ভান্ডার। যা তাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে দারুণ উপকারে আসে।

এসব কর্মচারী তথ্য টুইস্ট করে দিতে পারে, মিথ্যা আশ্বাসে মন্ত্রীকে আকাশে উড়তে দিতে পারে। আবার বাস্তবের মাটিতে নামিয়েও আনতে পারে। মন্ত্রী ভুল রাস্তায় হাঁটলে তারাই আগে সেটা বুঝতে পেরে তাকে থামিয়েও দিতে পারে। এ জন্য ‘ব্যুরোক্রেসির’ এত দোষ ধরা হয়; সমালোচনা, কটাক্ষ করা হয়। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছিলেন, ‘ব্যুরোক্রেসি ইজ এ ইনক্রেডিবল মেশিন!’ এরা চাইলে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে।

সংসদীয় ব্যবস্থায় এসব রং বদল করা কর্মচারীদের দৌরাত্ম্য থামানোর মেকানিজম যেমন আছে তেমনি ‘দিন আনি দিন খাই’ কর্মচারীদের সক্রিয় করার মেকানিজমও আছে।

আইন প্রণয়নে বা মন্ত্রণালয়ের কোনো কাজ সম্পর্কে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে ব্যাপক আলাপ-আলোচনার সুযোগ থাকে, জবাবদিহির সুযোগ থাকে। বিভিন্ন অংশীজন বা পক্ষ থেকেও মতামত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের ব্যাপক চর্চা না থাকায়, গণতন্ত্রে জবাবদিহির সুন্দর চর্চায় এমপি, মন্ত্রী বা আমলা কেউ অভ্যস্ত নয়।

কর্মচারীদের থামতে জানা খুব দরকার। কোনো বিষয়ে যদি মত দেওয়ার থাকে সেটি হওয়া উচিত শুধু বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত বিষয়ে। বাস্তবায়নে আর্থিক, জনবল, কাঠামো-সংক্রান্ত বিষয়েও তারা বলতে পারেন নির্মোহে। তাদের কাজ দেশ ও বিদেশের তথ্য-উপাত্ত মন্ত্রীর হাতে কোনো মতামত ছাড়াই তুলে দেওয়া। যখন সব মতামত একত্রে আসবে, সেগুলো নিয়ে কর্মচারীরা কর্মশালা বা সেমিনার আয়োজন করবে। এরপর যেটি দেশের জন্য সবচেয়ে ভালো তা গ্রহণ করবে রাজনীতিকরা। তাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলতে সহযোগিতা করবে আমলারা। তাহলেই উত্তম আইন বা সিদ্ধান্ত হবে, নইলে হবে না। দোষ রয়েই যাবে। ভুল থাকতে পারে, কিন্তু দোষ থাকলে তা হয়ে উঠতে পারে ভয়ংকর।

আমাদের দেশে রং বদল করা কর্মচারীরা নিজের মত চাপিয়ে দেয়। এটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর ওপরও নির্ভর করে, তিনি কীভাবে নিচ্ছেন? ‘বায়াস’ শব্দটি প্রশাসনে ব্যাপক প্রচলিত। অনেক সময় মন্ত্রী কখন ‘বায়াস’ হয়ে পড়েছেন তা বুঝতে পারেন না! ‘দিন আনি দিন খাই’ কর্মচারীরা এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না।

তাই মন্ত্রীকে আগেই তার কাজের পদ্ধতির মান বা ‘স্ট্যান্ডার্ড অব প্রসিডিউর’ ঠিক করে দিতে হবে। যেমন আইন প্রণয়নের আগে মতামত সংগ্রহ করতে হবে। ‘ওপেন সোর্স’ বা ওয়েবসাইটে দেওয়ার পর যে কেউ মতামত দিতে পারবে, তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষজ্ঞ মতামত নিতে হবে। স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক সংস্থার মতামতও প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আদালতের কোনো নির্দেশনা বা রায় আছে কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে। আগের আইন, বিধি, সার্কুলার ইত্যাদি দেখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় বা কোনো সংস্থার কোনো গবেষণা আছে কি না তা আমলে নিতে হবে।

এরপর প্রস্তুত খসড়া চুলচেরা বিশ্লেষণ করে মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব কমিটি, বিধি প্রণয়ন কমিটি, প্রশাসনিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটি, মন্ত্রিসভা, প্রয়োজনে পাবলিক সার্ভিস কমিশন বা অন্য কোনো কমিশনের সঙ্গে পরামর্শ, অর্থ বিভাগের মত এবং আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের পর সংসদে পাঠাতে হবে। সংসদে আলোচনা, সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে আলোচনার পর সংসদ সিদ্ধান্ত নেবে।

এ প্রক্রিয়া ঠিকমতো চলছে কি না, কাজের স্ট্যান্ডার্ড বা কোয়ালিটি কী রকম–এসব দেখার জন্য মন্ত্রীর নিজস্ব লোকবল দরকার। এভাবে কাজ করিয়ে নেয়ার জন্যই মন্ত্রী। সচিবের সঙ্গে টক্কর দেওয়ার জন্য মন্ত্রী না। রং বদল করা কর্মচারীদের দ্বারা ‘বায়াস’ হওয়ার জন্য মন্ত্রী না।

বাজেট প্রণয়নের মতো সব প্রস্তুত করে কোনো বিষয়ে একেবারে শেষ সময়ে নামকাওয়াস্তে মতামত নিলে ভালো কিছু হয় না। আমাদের দেশে দেখা যায়, বাজেটে সব মোটামুটি চূড়ান্ত করার পর এর-ওর সঙ্গে দু-চারটে সভা করে বলা হয় প্রাক বাজেট আলোচনা। এতে কোনো মতই কাজে লাগে না। এসব প্রাক বাজেট পরামর্শ সভা যদি জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারিতে করা হয়, তাহলে তা বাজেট প্রণয়নে কাজে লাগতে পারে।

রং বদল করা কর্মচারীরা ‘ডিজিটাল’ করার নামে সরকারকে খুশি করতে অনেক কিছু এনেছে। যেগুলো পরবর্তীতে দেখা গেছে অস্থায়ী বা অনিরাপদ! যেমন প্রধানমন্ত্রী বারবার সতর্ক করে দিয়েছিলেন, যা আমলে না নেয়ার নমুনা সম্প্রতি দেখা গেছে দেশের নাগরিকের তথ্য ফাঁস হওয়ার মাধ্যমে। অথচ সরকার প্রয়োজনীয় সুযোগ, অর্থ সবই দিয়েছে।

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য মহানগরীতে এডিস মশা (ডেঙ্গু) নিয়ে যে সংকট সেখানেও রং বদল করা কর্মচারীদের কীর্তি প্রকাশ পায়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কেনা মশক নিধন ‘বিটিআই’নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এ কাজের সঙ্গেও কর্মচারীরা আছে। কারণ এতে টেন্ডার আছে, আমদানি করার আগে সবকিছু যাচাই-বাছাইয়ের বিষয় আছে। ল্যাব টেস্ট আছে। এসব কিছু করেছে কর্মচারী, কিন্তু দোষ দেওয়া হবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির! অর্থাৎ কর্মচারীরা সব সময় সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল, আছে এবং থাকবে। এটা প্রমাণিত যে, তারা সুবিধা নেবে, দায় নেবে না!

গত কয়েক বছরে সবচেয়ে বেশি আর্থিক ও অন্যান্য সুবিধা নেয়া আমলারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে একটু দূরে দূরে থাকছেন। এর কারণ হচ্ছে আমেরিকার ভিসা নীতি। এ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তারা কোনো দায়িত্বে থাকতে চান না। দূরে থাকার পাঁয়তারাকারীরাও সেই রং বদল করা কর্মচারী। তারা নিজেদের সেফ জোনে রাখার দারুণ মওকা পেয়ে গেছে। মার্কিন ভিসা নীতির ক্ষেত্রে নিজে সামনে না থেকে ঠেলে দেবে জনপ্রতিনিধিদের। দোষ হলে হবে সরকারের, ক্ষতি হলে হবে দেশের। এসব কর্মচারীরা নিরাপদে ঘাপটি মেরে অপেক্ষায় থাকবে নতুন সুযোগের।

দেশে ও বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে সরকার ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনকে সহজ করে সাইবার নিরাপত্তা আইন করার পথে হাঁটছে। এ আইনও রং বদল করা কর্মচারীদের প্রভাবে এমনভাবে করা হয়েছে যা সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। এতে এসব কর্মচারীর কিছুই যায় আসে না।

এখনো সেসব কর্মচারী নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহিরের চেষ্টা করছে। রাজনীতিকদের যেনতেন বুঝ দিয়ে আইনের বাজে দিকগুলো বহাল রাখছে। কারণ এসব কর্মচারী ক্ষমতা পছন্দ করে। আর রাজনীতিক বা মন্ত্রী যদি রং বদল করা কর্মচারীর মতো চরিত্র ধারণ করেন তাহলে জনগণের জীবনে সর্বনাশ নেমে আসে।

রং বদল করা কর্মচারীরা সাফাই গেয়ে বলেন, আমাদের প্রশাসন ব্রিটিশজাত। কিন্তু তারা বুঝতে চেষ্টা করেন না যে, বর্তমান প্রশাসন সেই ফেলে আসা ব্রিটিশ প্রশাসন না। এখনকার ‘ব্রিটিশ কর্মচারীদের’ রাজনীতিকের মতো কাজের দায় নিতে হচ্ছে।

তুরস্কের কথা মনে পড়ে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে হটানোর ঘোষণা দিয়েছিল সেনাবাহিনী। তারা প্রেসিডেন্টকে গ্রেপ্তার করবে। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান তা জানতে পেরে দেশবাসীকে ঘটনা জানিয়ে প্রতিরোধের আহ্বান জানান। ব্যাস, ফেটে পড়ে জনতা। পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় জনতার হাতে। রক্ষা পায় জনগণের সরকার, টিকে যান এরদোয়ান। এ ঘটনা দিয়ে বোঝা যায় রাজনীতিকরা কেন জনগণ জনগণ করেন। জনগণই তাদের শক্তির উৎস। ব্যাপক জনসমর্থন ছাড়া বড় কোনো পরিবর্তন সম্ভব না।

কিন্তু রং বদল করা কর্মচারীরা মনে করে জনগণ কী, আমরা যা বলব তাই! এদের কাছে জনতুষ্টির কোনো দাম নেই, যা রাজনীতিকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনীতিকের একদিকে জনগণ অন্যদিকে সরকারি কর্মচারী থাকে। তিনিই সফল রাজনীতিক যিনি এ দুটোকে একত্রে কাজে লাগাতে পারেন। দক্ষ রাজনীতিক ‘দিন আনি দিন খাওয়া’ এবং রং বদল করা কর্মচারীকে দিয়ে আসল কাজটি করিয়ে নেন। আর সাবধান থাকেন রং বদল করা অর্থাৎ ‘পেইন্টার’ কর্মচারী থেকে!