বঙ্গবন্ধু জন্ম না নিলে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টি অধরা রয়ে যেত। বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ এবং স্বাধীনতা একই সূত্রে গাঁথা তিনটি শব্দ। এই তিনটি শব্দ অবিচ্ছেদ্য এমন এক সত্তা, যা বাঙালি জাতির অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে। স্কুলজীবন থেকেই রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছাত্রজীবনেই তার কর্মকা-, বিচক্ষণতা ও ভাষণ শুনে সবাই আকৃষ্ট হতো। ১৯৩৯ সালে মিশনারি স্কুলে পড়ার সময় থেকে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনের শুরু হয়েছিল। তদানীন্তন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক এবং খাদ্যমন্ত্রী ও পরবর্তীকালে বাংলা ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী ওই বছরই বিদ্যালয় পরিদর্শনে আসেন। শেখ মুজিবের নেতৃত্ব ওই সময় বিদ্যালয়ের ছাদ সংস্কারের দাবি নিয়ে একটি দল তাদের কাছে যায়। নেতৃত্বগুণ, সাহসিকতা সে সময়েই তার চরিত্রে দেখা গিয়েছিল। তিনি ১৯৩৯ সালে গোপালগঞ্জ মহকুমা মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি এবং মহকুমা মুসলিম লীগের ডিফেন্স কমিটির সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। ১৯৪০ সালে নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। ১৯৪১ সালে বঙ্গবন্ধু সদ্য এসএসসি পাস করে সম্মুখে থেকে সক্রিয় হন ছাত্ররাজনীতিতে। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতেই হবে এ চিন্তা থেকে তিনি বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ শুরু করেন। মাদারীপুরে তিনি মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করেন।
ছাত্রজীবনে উচ্চশিক্ষার জন্য অবিভক্ত বাংলায় (অবিভক্ত ভারতে) তরুণ মুজিব গিয়েছিলেন তৎকালীন অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে। ছিলেন বেকার হোস্টেলে। কলকাতার তালতলা থানার বেকার হোস্টেলটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১০ সালে। ৮ স্মিথ লেনের এই হোস্টেলে বাস করেই বন্ধবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেন। ইসলামিয়া কলেজে পড়াকালীন বঙ্গবন্ধু ছাত্রনেতা হিসেবে খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে এই সাধারণ সম্পাদক হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি সেখানে লিখেছেন, ‘এই সময় আমি বাধ্য হয়ে কিছুদিনের জন্য ইসলামিয়া কলেজের স্টুডেন্ট ইউনিয়নের (ছাত্র সংসদের) সাধারণ সম্পাদক পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হই।’ শেখ মুজিবুর রহমান তার তারুণ্যের স্মৃতিচারণা করে নিজের জীবনীতে লিখেছেন, ‘বেকার হোস্টেলের কতগুলো রুম ফ্রি ছিল, গরিব ছাত্রদের জন্য। তখনকার দিনে যার প্রয়োজন তাকেই তা দেওয়া হতো। আজকালকার মতো টেলিফোনে দলীয় ছাত্রদের রুম দেওয়ার জন্য অনুরোধ আসত না।’ ১৯৪৬ সালে কলকাতায় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যকার সেই ভয়াবহ দাঙ্গার সময় একজন মুসলমান ছাত্রনেতা হয়েও তিনি সমানভাবে মুসলমান ও হিন্দুদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। মুসলমান অঞ্চলে আটকে পড়া হিন্দুদের পৌঁছে দেন নিরাপদ এলাকায়। ঠেলাগাড়ি ঠেলে নিয়ে খাবার পৌঁছে দিয়েছেন হিন্দু এবং মুসলমানদের কাছে। এটা তার অসাম্প্রদায়িক চেতনারই বহির্প্রকাশ।
তরুণ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে কলকাতায়। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচিহ্নগুলো এখনো স্বগৌরবে টিকে আছে সেখানে। দেশভাগের আগেই নীতি, ন্যায্যতা, কঠোর পরিশ্রম, মানুষের জন্য ভালোবাসাই বঙ্গবন্ধুকে আঞ্চলিকতার প্রতিবন্ধকতা ছিন্ন করে বাংলার তরুণ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। যার ফলস্বরূপ তিনি বাংলার আপামর মানুষের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। বঙ্গবন্ধুর ছাত্ররাজনীতি জীবনের ঘটনাবলিতে রয়েছে আজকের নতুন প্রজন্ম ও ছাত্রনেতাদের জন্য বিভিন্ন নিদর্শন, জীবন অভীক্ষা। তাই তার ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে জানলে আজকের প্রজন্মের পক্ষে সম্ভব হবে বঙ্গবন্ধুর গঠনমূলক ছাত্ররাজনীতি ও অসাম্প্রদায়িক আদর্শ ধারণ করা।
লেখক : কথাশিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক