গত মাসে ‘পলিটব্যুরো’র এক বৈঠকে চীনের নেতারা এই বছরের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারকে ব্যাখ্যা করেছেন ‘নির্যাতন’ হিসেবে। এতটা খোলামেলা বক্তব্য চীনা কমিউনিস্ট পার্টি থেকে সাধারণত শোনা যায় না। তারা বর্তমান পরিস্থিতির কথাই বলছিলেন। কিন্তু এটা চীনের এমনসব সমস্যার খানিকটা প্রকাশ করে দিয়েছে, যাতে তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যকার পদ্ধতিগত ব্যবধান যে কত প্রকট, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
গত কয়েক দিনে চীনের প্রকাশিত বেশ কিছু পরিসংখ্যান বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। জুলাই মাসে দেখা গেছে চায়নিজ ভোক্তারা গত বছরের তুলনায় আরও কম দামে পণ্য কিনছেন। মানে ব্যাপক মুদ্রা সঙ্কোচন ঘটছে। অর্থনীতির আকার ক্ষীণ হয়ে আসছে এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী চাহিদার ঘাটতি উন্মোচন করে দিচ্ছে। জুলাইতে আরও দেখা যায়, চীনের বৈদেশিক বাণিজ্য ক্রমশ আরও দুর্বল হয়েছে। রপ্তানিতে শুরু হয়েছে তীব্র পতন, বোঝা যায় বৈশ্বিক চাহিদা কমে আসছে। এদিকে আমদানি রেখাও গড়িয়ে নামছে, বোঝা যায় অভ্যন্তরীণ চাহিদাও কমছে। এভাবে উভয় সংকট কেন দেখা দিল? নিশ্চয় বড় কোনো কারণ আছে। কিন্তু কারণগুলো অস্পষ্ট। এই অস্পষ্টতা যে বার্তা দেয়, তা হচ্ছে, চীনে কোথাও আরও গুরুতর কিছু ভুল হয়েছে।
আশা ছিল, মহামারী কাটিয়ে চীন মহাসমারোহে ফিরে আসবে। এ-নিয়ে বছরের গোড়ার দিকে খানিকটা উত্তেজনাও ছিল। অথচ ফলাফল হয়েছে ঠিক উল্টো। বিশেষ করে গাড়ি, বাড়ি, বিমানের মতো বড় বড় টিকিট আইটেম এবং ব্যক্তিগত বিনিয়োগের খাতগুলো যাকে বলা হয় চীনের অর্থনীতির মেরুদণ্ড তাতে বছরের প্রথমার্ধেই ব্যাপক পতন ঘটেছে। এমন ঘটনা চীনের ইতিহাসে খুব একটা ঘটেনি, বরং দীর্ঘ কয়েক দশকের মধ্যে এবার প্রথম।
বেসরকারি সংস্থা এবং উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ কমিয়ে দিয়েছে। লোকবল নিয়োগেও তারা ব্যয় সঙ্কোচন নীতি গ্রহণ করছে। অথচ বেকারত্বের হার তুঙ্গে। তরুণদের মধ্যে শতকরা ২১ ভাগ বেকার যা যুক্তরাজ্যের তুলনায় দ্বিগুণ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। স্নাতক সমাপন হলে প্রতি বছর গ্রীষ্মে ১১ থেকে ১২ মিলিয়ন শিক্ষার্থী বিদ্যায়তন থেকে বেরিয়ে আসে কাজ করার উপযুক্ত হয়ে। কিন্তু কাজ নেই। কাজ খুঁজে পাওয়ার সমস্যা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এটা কঠিন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। চীনের শ্রমবাজারের অবস্থাও এমন দাঁড়িয়েছে যে, বেশিরভাগ কর্মস্থলের পদ শূন্য, তবু কোম্পানির চাহিদা নেই। সিংহভাগ চাকরিগুলোর হালত এককথায় কম দক্ষতা, কম বেতন। উৎপাদন ও নির্মাণের মতো উচ্চমানের প্রতিষ্ঠানের চাকরি এবং বাজারের তুলনায় ছোটখাটো যন্ত্রাংশ তৈরি টাইপ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বাজার এবং কর্মসংস্থান কয়েকগুণ বড়। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষায়ও। সবকিছুই একটা বৃত্তাকারে ঘুরছে।
এটা বলা ভুল হবে যে, এই সবের মূলে রয়েছে মহামারীর আঘাত। না, মোটেও তা নয়। চীনের অর্থনীতিকে ওজনদার করেছে যেসব পণ্য, তার বেশিরভাগ তৈরি হচ্ছে বেশ কয়েক বছর ধরে। এমনকি যখন হুয়াওয়ে, আলিবাবা, টেনসেন্ট ও টিকটকের মতো চীনের গ্লোবাল ব্র্যান্ডগুলো নিয়ে বিশ্বে দাবানলের মতো আতঙ্ক ছড়ানো হয়েছিল, তখনো তাদের আয় কমেনি, বরং লকলক করে ওপরে উঠছিল।
এরই মধ্যে চীন ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগ নিয়েছে, আর সারা বিশ্বে তার পদচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই), একটি বিশ্বব্যাপী অবকাঠামো উন্নয়ন কৌশল যা ২০১৩ সালে ১২৬টি দেশ এবং ২৯টি আন্তর্জাতিক সংস্থা যৌথভাবে বেল্ট অ্যান্ড রোড নির্মাণে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে গৃহীত হয়।
এটিকে শি জিনপিংয়ের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিআরআই শি জিনপিংয়ের ‘মেজর কান্ট্রি ডিপ্লোম্যাসি’ কৌশলের একটি কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা চীনকে তার ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা এবং মর্যাদা অনুসারে বৈশ্বিক বিষয়গুলোর জন্য একটি বৃহত্তর নেতৃত্বের ভূমিকা গ্রহণ করার আহ্বান জানায়। ২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত, ১৪৬টি দেশ বিআরআই-তে স্বাক্ষর করে। পাশাপাশি, এ কথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতো বৈশ্বিক সংস্থাগুলোতেও চীন শুধু প্রভাব নয়, বরং রীতিমতো শাসন চালিয়েছে।
এত সব ঈর্ষণীয় কৃতিত্ব এবং যুগান্তকারী সাফল্য সত্ত্বেও চীন গত এক দশক বা তারও বেশি সময় ধরে রাশি রাশি সংকটের সৃষ্টি করছে এবং ক্রমেই সেগুলো সমস্যার স্তূপ তৈরি করে যাচ্ছে। মন্দঋণের পাহাড় জেগেছে। অলাভজনক ও অবাণিজ্যিক অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে দেদার। ফলে নিষ্ফলা রিয়েল এস্টেট, খালি অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক, স্বল্প-ব্যবহৃত অ্যাপার্টমেন্ট, যাত্রীশূন্য পরিবহন সুবিধা এবং কয়লা, ইস্পাত, সৌর প্যানেল ও বৈদ্যুতিক যানবাহন থেকে সৃষ্ট অতিরিক্ত এনার্জির বোঝা তৈরি হয়েছে। এসব হচ্ছে সব সংকটের প্রধান উদ্দীপক। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার থমকে গেছে। বলা যায়, চীনের দুর্ভাগ্য যে, দেশটি এখন বিশ্বের সর্বোচ্চ স্তরের বৈষম্যের চূড়ায় অবস্থান করছে এবং বিষয়টি শীর্ষস্থান দখলে রাখার মতো গর্বের নয় নিশ্চয়। বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কি নৈতিক, সামাজিক এবং বস্তুগত ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে কাক্সিক্ষত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করার দিকে এগিয়ে যেতে পারবে?
পৃথিবীর অন্য যে-কোনো দেশের তুলনায় চীনের বার্ধক্যের গতি অস্বাভাবিক দ্রুত। কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই শোচনীয়। ২৯০ মিলিয়ন অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকাংশ সামাজিক সুবিধা পায় না বা সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতায় উত্তীর্ণ নয়। চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে সারা দেশের অভিবাসী শ্রমিকের সংখ্যা ২০২০ সালের তুলনায় ২.৪ শতাংশ তথা ৬৯.১ লাখ বৃদ্ধি পেয়ে ২৯ কোটি ২৫ লাখ ১০ হাজার।
উপরন্তু মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়েছে শি জিনপিংয়ের রাজনীতি। তার ব্যর্থ উন্নয়ন মডেলের প্রভাব মোকাবিলা করার জন্য তিনি যে রাজনৈতিক অস্ত্র ব্যবহার করছেন, তা একটি ক্রমশ দমনমূলক, রাষ্ট্রকেন্দ্রিক এবং নিয়ন্ত্রণকারী শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
বলা যায়, সময়টা আসলেই কঠিন। এটা চীনা নাগরিকদের পরীক্ষার সময়। বিশেষত ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত সমাজের জন্য মহাপরীক্ষাযাদের সঞ্চয়ের বেশিরভাগ ফুরিয়ে গেছে কোনো এক রিয়েল এস্টেট সেক্টরে একটি বাড়ি খুঁজে পেতে গিয়ে; অথচ কাঠামোগত পতনের কারণে তা হয়ে উঠছে পিঠ ন্যুব্জ করে দেওয়া বোঝার মতো। বেশিরভাগ হাউজিং স্টক অতিরিক্ত নির্মাণ, লেনদেনে দরপতন এবং মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা হারানোর কারণে বসে যাচ্ছে। কিন্তু এটা ঘটছে ছোট ছোট শতাধিক শহরে। বেইজিং, শেনজেন বা সাংহাইয়ের মতো বড় শহরগুলোতে যেহেতু ঘটছে না, তাই শহরের লোকেরা খবরও পায় না।
চীনের নেতারা এই বছর ভোগ্য চাহিদা বাড়াতে উঠেপড়ে লেগেছেন এবং প্রাইভেট ফার্ম ও উদ্যোক্তাদের ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করার বিষয়ে সোচ্চার হয়েছেন। এমনকি তারা তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থকে পার্টির রাজনৈতিক লক্ষ্যের সঙ্গে একীভূত করে নিতে দলের চাপের মুখে পড়ছেন, কেউ কেউ শাস্তির শিকারও হয়েছেন। আমরা এখনো জানি না, এই ধরনের বাগাড়ম্বর আসলে কতটা ফল বয়ে আনবে।
আগামী সপ্তাহ এবং মাসগুলোতে আমরা হয়তো সর্বোচ্চ আশা করতে পারব যে, কর্র্তৃপক্ষ তাদের আর্থিক ও বাজেট নীতি এবং আবাসন প্রবিধান ও অবকাঠামোতে অর্থায়নের প্রয়োজনে ঋণ পলিসিকে আরও সহজ করবেন। এমন ব্যবস্থাও থাকতে পারে, যা একই সঙ্গে ভোক্তাবান্ধব হবে, আয়ও বাড়াবে, ফলে খরচ বাড়লেও তাতে ভারসাম্য বজায় থাকবে।
তবে এসবে আসন্ন শীতকালে অর্থনীতিকে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারবে বটে। কিন্তু এটা তো স্থায়ী সমাধান নয়। অর্থনীতির অন্তর্নিহিত দুর্বলতা এবং বৃহত্তর কর্র্তৃত্ববাদ এখন চীনের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য এবং বলা যায় একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ বাহ্যত যার পরিবর্তন দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ।
একবিংশ শতকের দুই দশক পেরিয়ে যাওয়ার পরেও চীনের অর্থনীতির এই টালমাটাল পরিস্থিতি বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও একটি বড় হুমকি। হুমকি সংক্রামিত হয়েছে চীনের অভ্যন্তরেও। একসময় যে গণচীন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্ব মঞ্চে অগ্রসর হয়েছে এবং গণতন্ত্রকে একপাশে সরিয়ে রাখলেও উদারপন্থার পথ ধরে চলেছে, নিজের এবং বিশ্বের স্বার্থে তাকে শাসনব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস করতে হবে। নিশ্চয় সে সেটা পারবে। কঠিন সময়ে এর বিকল্প তার সামনে নেই।
দি গার্ডিয়ান অনলাইন থেকে ভাষান্তর : মনযূরুল হক
লেখক: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির চায়না সেন্টার এবং সোস-এর একজন গবেষণা সহযোগী