‘মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন এবং মানব পাচার অপরাধের শিকার ব্যক্তিবর্গের সুরক্ষা ও অধিকার বাস্তবায়ন ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণের উদ্দেশ্যে বিধান প্রণয়নকল্পে প্রণীত আইন’ নামে ২০১২ সালে একটি আইন করা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এখন পর্যন্ত এই আইনে মোট কতজনকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে? প্রায়ই জানা যায়, ‘আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের ... সদস্য গ্রেপ্তার’ এদের পরবর্তী সময়ে কোথায় পাচার করা হয়, তা জানা না থাকলেও এমনটি বলাই যায় তারা সবকিছু ম্যানেজ করেই চলে যান লোকচক্ষুর আড়ালে। কয়েকদিন পর আবার শুরু করেন মানব পাচার ব্যবসা। দেশীয় চক্রের সঙ্গে আন্তর্জাতিক চক্র মিলে যে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন, খোঁজ নিলে জানা যাবে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন অনেক রাঘববোয়াল। ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নেটওয়ার্ক ঘুরেফিরে একটি নেটওয়ার্কে চলে আসে। যার নেতৃত্ব দেখা যাবে, ইউরোপ বা আমেরিকা থেকে আসছে। তবে এই মুহূর্তে আমরা যে চক্রের কথা জানতে পেরেছি, তার নেতৃত্ব রয়েছে মিয়ানমারে। মিয়ানমারের দুই রোহিঙ্গা নাগরিকের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে একটি আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র। এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কয়েকজন বাংলাদেশি প্রতারক। এই চক্রের বাংলাদেশের হোতা মো. ইসমাইল ও তার দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। সংস্থাটি বলছে, এই চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন এলাকার তরুণ এবং যুবকদের কোনো অর্থ ও পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রলোভন দেখাত। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে ‘পাসপোর্ট ভিসা টাকা ছাড়াই মালয়েশিয়া পাঠাত চক্রটি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। প্রতিবেদনে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এত অনিশ্চয়তা জেনেও একজন মানুষ কেন এমন ভয়ংকর প্রতারণার ফাঁদে পা দিচ্ছে? এখানে ঠিক কোন ধরনের মনস্তত্ত্ব কাজ করছে, তা বলা খুব একটা কঠিন নয়। সোজা ভাষায় বলতে গেলে পাসপোর্ট, ভিসার বিড়ম্বনা এড়িয়ে সহজেই যদি মালয়েশিয়ার মতো দেশে গিয়ে চাকরি পাওয়া যায়, সমস্যা কী? এমন সরল বিশ্বাসের কারণেই প্রতারণার খপ্পরে পড়ছেন তারা। প্রতিবেদনে সেই প্রতারণার ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রথমে ট্রলারে তারা যাচ্ছেন মিয়ানমার, সেখান থেকে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর হয়ে মালয়েশিয়া। এই দীর্ঘ সমুদ্রপথে রয়েছে মিয়ানমার-থাইল্যান্ডের কোস্টগার্ড। এই চক্রটি গত ১৯ মার্চ ২২ জনকে নিয়ে একটি ট্রলারে যাত্রা শুরু করে মিয়ানমার উপকূলে পৌঁছালে সেখানকার কোস্টগার্ড ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করে। অন্য তিনজনকে চক্রের এক সদস্য কৌশলে ছাড়িয়ে তার ক্যাম্পে নিয়ে যান। সেখানে আটকে রেখে মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন করেন। তার মধ্যে ২২ জনের একজন জহিরুলের পরিবারের কাছে তারা ৬ লাখ টাকা দাবি করেন। তার পরিবার গত ১০ মে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা দেয় এবং ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর দেওয়ার কথা জানায়।
এইভাবে মিয়ানমারে অনেককে নির্যাতন করা হয়। সেই নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা। যাদের কাছ থেকে টাকা পাওয়া যেত, তাদের পাঠানো হতো থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়া। মাঝখানে অবশ্যই কোনো না কোনো চ্যানেলে তারা ম্যানেজ করতেন। কিন্তু মালয়েশিয়াতেও থাকতেন আরেক দালাল। তিনি টাকা পাওয়ার পরই সবকিছু ব্যবস্থা করে দিতেন। আবার নির্যাতন করে কাউকে হত্যাও করা হচ্ছে।
এসবের সুষ্ঠু প্রতিকার করার জন্য অবশ্যই নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ রয়েছে। কীভাবে এসব প্রতারক চক্র দিন দিন ডালপালা বৃদ্ধি করতে পারছে, সে বিষয়ে গভীর সুষ্ঠু তদন্ত দরকার। শুধু তদন্ত করলেই হবে না, তদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী ব্যবস্থা না নিলে এই ধরনের প্রতারণার হাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা দুরূহ। এই চক্রের নেপথ্য শক্তিকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা দরকার। একইসঙ্গে এ বিষয়ে সরকারি উদ্যোগে প্রচারণা চালাতে হবে। কোনোভাবেই যে পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়া মালয়েশিয়ার মতো দেশে যাওয়া যায় না, সেই বিষয়ে জনগণকে সচেতন করা প্রয়োজন। আর প্রতারকদের খপ্পরে পড়ে তাদের পরিণতি হবে নির্মম এবং নৃশংস। তাহলেই একমাত্র সরকারের আন্তরিকতা পরিলক্ষিত হবে। আমরা এটাই দেখতে চাই।