হঠাৎ করে বিএনপির নেতাকর্মীদের ধড়পাকড়, হামলা ও মামলায় নতুন করে চাপে পড়েছে দলটি। সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। কারণ ছাত্রদলের ছয় নেতাকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়ে পুলিশ দাবি করেছে, নির্বাচনের সময় সহিংসতার জন্য বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের পরামর্শে তারা অস্ত্র সংগ্রহ করছিল।
এ ছাড়া ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিনকে যেভাবে গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে, তাতে দলটির দায়িত্বশীল নেতারা মনে করছেন, রাজপথের কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী তরুণ নেতাদের ওপর সরকারের আক্রমণ বাড়তে পারে। তাদের দাবি, ছাত্রদল নেতাদের তুলে নেওয়ার পর অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার দেখানো আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা।
রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার অনুমতি দেওয়ার দাবিতে বিএনপি শনিবার সারা দেশে পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করে। এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে দলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। এ ঘটনায়ও মামলার মুখোমুখি হচ্ছেন নেতাকর্মীরা। এর আগে শুক্রবার ঢাকাসহ দেশের সব মহানগরে গণমিছিল কর্মসূচি পালন করে বিএনপি। দলটির নেতারা দাবি করেন, ওই দিন রাতে সকালে ছাত্রদলের নিখোঁজ এক নেতাকে খুঁজতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছে সংগঠনের আরও পাঁচ নেতাকে। শনিবার সকালে এ বিষয়ে দলটি বিবৃতি দেয়। এরপর রাতেই এই ছয়জনকে অস্ত্রসহ আটকের কথা জানায় পুলিশ। গতকাল তাদের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানায় পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ।
এ ছাড়া শনিবার রাতে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের নিচ থেকে রবিনসহ আরও ১২ জনকে আটকের তথ্য জানায় পুলিশ।
এ বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হঠাৎ করে ধরপাকড় বৃদ্ধি হয়েছে বলতে চাই না। মূলত ধরপাকড় শুরু হয়েছে গত ২৮ জুলাইয়ের পর থেকে। এরপর দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও উন্নত চিকিৎসার দাবিতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণার পর থেকে গত শনিবার হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুর ও নারায়ণগঞ্জে দলের ঘোষিত পদযাত্রা কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অতীতের মতো যৌথভাবে হামলা, মামলা শুরু করেছে।’
তবে এ ঘটনা নিয়ে তারা চিন্তিত নন জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আন্দোলনের মাত্রা যতই বাড়বে, সরকারের নির্যাতন, হামলা, মামলা ততই বাড়বে। আমরা বিষয়টি আগেই আঁচ করতে পেরেছি। সেভাবেই আগামীর পরিকল্পনা করছি। কর্মসূচিতে সাধারণ জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে।’
গতকাল বিকেলে গুলশানে দলটির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদলের ছয় নেতাকে তুলে নেওয়া এবং অস্ত্র মামলার প্রসঙ্গে কথা বলেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে তারা নিজেরাই কিছু পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। পুরনো কায়দায় তার দায় বিএনপির ওপর চাপাবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলছেন, সন্ত্রাস হবে, আরেকজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তিনি বলেছেন যে সন্ত্রাস করতে দেব না। সন্ত্রাসটা হলো কোথায়? আমরা কোথায় করলাম। যা কিছু সন্ত্রাস তো করছ তোমরা। বন্দুক তোমাদের হাতে, পিস্তল তোমাদের হাতে, আইন তোমাদের হাতে। রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে সন্ত্রাস করছ। এটা পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস করছে।’
ফখরুল অভিযোগ করে বলেন, ‘সরকারপ্রধানের নির্দেশে কিছুসংখ্যক অতিউৎসাহী দলবাজ পুলিশ কর্মকর্তা এহেন বেআইনি কর্মকান্ড চালানোর জন্য মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে। এ ছাড়া বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে গায়েবি মামলায় বিএনপিসহ বিরোধী মতের নেতাকর্মী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে সাজা দিচ্ছে। উচ্চতর আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর নিম্ন আদালতে হাজির হলে জামিন নামঞ্জুর করে তাদের জেলহাজতে পাঠানো হচ্ছে। আবার জামিন লাভের পর নতুন আসামি বানিয়ে জেলগেটেই অনেককে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আটক রাখা হচ্ছে, যা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুস সালাম বলেন, ‘হঠাৎ করে পুলিশের ধরপাকড়, হামলা ও মামলা দেওয়ার ঘটনায় নেতাকর্মীদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। কাকে কখন কোথা থেকে তুলে নিয়ে যাবে, সে বিষয়ে চিন্তিত নেতাকর্মীরা।’
তবে বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে সম্প্রতি নেতাকর্মীরা যেভাবে সাহসী ভূমিকা নিয়ে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত রয়েছেন, তা থামানো যাবে না বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
সালাম বলেন, ‘আরেকটি বিষয় নিয়ে আমরা চিন্তিত সেটা হচ্ছে ছাত্রদলের নেতাদের খালি হাতে বাসা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে বিদেশি অস্ত্র দিয়ে গ্রেপ্তারের ঘটনা সামনের দিনগুলোতে বাড়তে পারে। কারণ সরকার অতীতের মতো সামনের দিনগুলোতে আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে বিতর্কিত করতে অপচেষ্টা চালিয়ে যাবে। আমাদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ জ্যেষ্ঠ নেতাদের পাশাপাশি সারা দেশের তৃণমূলের লাখ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। নতুন করে আরও মামলা হবে। এসব নিয়ে চিন্তা থাকলেও উদ্বিগ্ন নই আমরা।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের পুরনো মামলায় সাজা দিয়ে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার পাশাপাশি রাজপথে সক্রিয় তরুণ নেতাকর্মীদের কারারুদ্ধ করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিনকে গ্রেপ্তার করেছে সাদাপোশাকের পুলিশ। এর আগে দক্ষিণের সদস্য সচিব রফিকুল আলম মজনুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এগুলো সরকারের পুরনো কৌশল।’
এর বিপরীতে বিএনপিরও কৌশল রয়েছে জানিয়ে ওই নেতা বলেন, ‘সম্প্রতি কয়েকজন তরুণ নেতাকে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৫ বছর ধরে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের যৌথ হামলা, মামলা, নির্যাতন সহ্য করে টিকে আছি। এগুলো এখন আর ভয় পাই না। আমাদের নেতাকর্মীরাও ভয় পায় না।’