লোকসানে বন্ধ লঞ্চ চলাচল

যাত্রী সংকট ও লোকসানের কারণ দেখিয়ে বরগুনা-ঢাকা নৌরুটের লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে এমকে শিপিং লাইনস। গত সোমবার থেকে এ রুটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ করা হয়। পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই লঞ্চ চলাচল বন্ধ করায় দুর্ভোগে পড়েছেন ঘাটে আসা যাত্রীরা।

এমকে শিপিং লাইনসের বরগুনা নৌবন্দরের ব্যবস্থাপক মো. এনায়েত হোসেন বলেন, সোমবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঢাকা-বরগুনা এই রুটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে মালিক কর্তৃপক্ষ। ‌গত কয়েক মাস থেকেই যাত্রী সংকট দেখা দেয়। এতে লোকসান গুনতে হচ্ছে মালিক কর্তৃপক্ষকে।

যাত্রীরা বলছেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর বরগুনা থেকে ঢাকায় কম সময়ের মধ্যে কম ভাড়ায় যাওয়া যায়। ‌ঢাকা-বরগুনা রুটে স্থলপথে বাসভাড়ার চেয়ে লঞ্চে ভাড়া অনেক বেশি। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও মানহীন সার্ভিসের কারণে লঞ্চে যাত্রী সংকট দেখা দিয়েছে। বালিয়াতুল ইউনিয়নের মনসাতলী গ্রামের হাফিজা বেগম নামে এক বৃদ্ধ নারী বলেন, ‘আমি বাসে চড়তে পারি না। যে কারণে লঞ্চে ঢাকা যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু লঞ্চ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খুবই অসুবিধায় পড়েছি।’

বরগুনার ঢলুয়া ইউনিয়নের বড়ইতলা এলাকা থেকে লঞ্চযোগে ঢাকা যেতে এসেছিলেন আবদুল মোমেন মিয়া। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করেই লঞ্চ কর্তৃপক্ষ এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আমি দুর্ভোগে পড়েছি। আমি আমার অসুস্থ মাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় লঞ্চে করে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। এখন সড়কপথে যেতে আমার খুবই কষ্ট হবে।’

সচেতন নাগরিক কমিটির সনাকের বরগুনা জেলার সভাপতি মনির হোসেন কামাল বলেন, ‘মানুষের সময়ের এখন অনেক মূল্য। ঢাকা থেকে বরগুনা স্থলপথে মাত্র পাঁচ ঘণ্টায় ৭০০ টাকা ভাড়ায় যাওয়া যায়। লঞ্চে ডেকে বা ভাড়া নেওয়া হয় ৬০০ টাকা এবং কেবিনের সর্বোচ্চ তিন হাজার থেকে ১৫০০ টাকা। বেশি ভাড়া দিয়ে বেশি সময় নষ্ট করে এখন আর মানুষ লঞ্চে যেতে চাইছে না। ফলে এ সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। তবে এখনো ভালো সার্ভিস নিশ্চিত করলে লঞ্চের যাত্রী হবে এবং ব্যবসায় লোকসান হবে না।

জানা যায়, ২০১৫ সালের দিকে বরগুনা-ঢাকা নৌপথে চারটি লঞ্চ চলাচল করত। এগুলো ছিল এমভি যুবরাজ-২, যুবরাজ-৪, কিং সম্রাট ও মৌসুমী-২। এর মধ্যে যুবরাজ-২, ৪ ও কিং সম্রাট লঞ্চের মালিক ছিলেন ঢাকার আওলাদ হোসেন। এমভি টিপু-৩-এর মালিকানা ছিল সাংসদ গোলাম কিবরিয়ার। ২০১৫ সালের শেষ দিকে এমভি টিপু-৩ লঞ্চটি কিনে নেন এমকে শিপিং কোম্পানির মালিক মাসুম খান। পরে সেটির নাম বদলে হয় মৌসুমী-২। ওই লঞ্চ দিয়েই এমকে শিপিং বরগুনা নৌপথে লঞ্চ ব্যবসায় নামে। পরে আওলাদ হোসেন তার মালিকানাধীন যুবরাজ-২ ও ৪ বিক্রি করে দেন। লঞ্চ দুটি কিনে নেন এমকে শিপিংয়ের মাসুম খান। সুন্দরবন-২ নামের একটি লঞ্চের মালিক প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ২০১৮ সালে এমকে শিপিংয়ের মাসুম খানের কাছে লঞ্চটি বিক্রি করে দেন। এরপর এ নৌপথের লঞ্চ ব্যবসায় এমকে শিপিংয়ের এককভাবে লঞ্চ চালায়। তারা দুটির বদলে প্রতিদিন একটি লঞ্চ চালাতে শুরু করে। সবশেষ বরগুনা-ঢাকা নৌপথে রাজারহাট-বি, পূবালী-১, রাজহংস-৮ ও শাহরুখ-২ এই চারটি লঞ্চ চলাচল করত। এর মধ্যে রাজহংস ও শাহরুখ এ দুটি লঞ্চ মাসিক চুক্তিতে ভাড়ায় চালাত এমকে শিপিং কোম্পানি।

এমকে শিপিং লাইনসের বরগুনা ঘাটের ব্যবস্থাপক মো. এনায়েত হোসেন আরও বলেন, প্রথমে ঢাকা-বরগুনা রুটে প্রতিদিন বরগুনা এবং ঢাকা থেকে দুটি লঞ্চ চলাচল করত‌। যাত্রী সংকটের কারণে পরে আমরা একটি লঞ্চ চালানোর সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু এখন আর সেটিও চালানো সম্ভব হচ্ছে না। কারণ কোম্পানি কিছুতেই লোকসান দিয়ে ব্যবসা করবে না।

এমকে শিপিং লাইনসের মালিক মাসুম খান বলেন, ‘মূলত এ রুট আমরা জনপ্রিয় করেছি। আমরা সেবা ও লঞ্চের মান ভালো করেছিলাম। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর আমাদের নৌরুট চ্যালেঞ্জে পড়ে যায়। তাও টিকে থাকার অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু লস এত বেশি যে সার্ভিস বন্ধ করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। তবে যাত্রী হলে আমরা আবার সার্ভিস চালু করব।’