ফিরে দেখা এশিয়া কাপ

যে টুর্নামেন্ট দিয়ে ক্রিকেটে পরিচয় বাংলাদেশের

আর ক’দিন পরই মাঠে গড়াবে এশিয়া কাপ ক্রিকেট। মহাদেশিয় এই টুর্নামেন্ট বরাবরই ক্রিকেট সমর্থকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকে। তবে এবার সেই মাত্রাটা একটু বেশিই বলা চলে। অক্টোবর-নভেম্বরে ভারতে বসবে ওয়ানডে বিশ্বকাপের আসর। যেখানে অংশ নিতে যাওয়া দশ দলের পাঁচটিই খেলবে এবারের এশিয়া কাপে। বিশ্বকাপের আগে এই দলগুলোর ভালো একটা প্রস্তুতিও হয়ে যাবে বলা চলে।

পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় আগামী ৩০ আগস্ট শুরু হবে এশিয়া কাপ। স্বাগতিক দুই দেশের সঙ্গে খেলবে ভারত, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও নেপাল। ৬ দলের এবারের আসর শুরুর আগে একটু অতীতে ফিরে যাওয়া যাক।

ফিরে দেখা এশিয়া কাপে আজ থাকছে প্রথম ‍তিন আসরের (১৯৮৪, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮) কথা-

১৯৮৪: পথ চলা শুরু

বিশ্ব ক্রিকেটেই এশিয়ান শক্তিগুলোর রয়েছে আলাদা অবস্থান। ওয়ানডে ক্রিকেটে যেমন এখন পর্যন্ত চ্যাম্পিয়নের মুকুট পড়েছে ছয়টি দেশ। এর মধ্যে তিনটি দেশই এশিয়ার। ১৯৮৩ সালে ভারতের প্রথমবার শিরোপা জয়ের মধ্যে দিয়ে উপমহাদেশের আলাদা অবস্থান তৈরির শুরু বলা চলে। এশিয়ার দেশগুলোও নিজেদের ঐক্য সুপ্রতিষ্ঠা করতে ওই বছরই তৈরি করে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল। এক বছরের মাথায় ১৯৮৪ সালে সংস্থাটি আয়োজন করে এশিয়া কাপ ক্রিকেট।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে তিন দেশ নিয়ে আয়োজন করা হয় প্রথম আসর। অংশ নেয় ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। সে বছর ৬ এপ্রিল থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত রাউন্ড রবিন লিগ পদ্ধতিতে খেলাগুলো অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি দল একে অপরের সঙ্গে একটি করে ম্যাচ খেলে। সুনিল গাভাস্কারের নেতৃত্বাধীন তখনকার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ভারত দুই ম্যাচেই জয় জয় লাভ করে চ্যাম্পিয়নের মুকুট পরে।

এশিয়া কাপের প্রথম আসরের চ্যাম্পিয়ন ভারত।

উদ্বোধনী ম্যাচে দুলিপ মেন্ডিসের শ্রীলঙ্কা ৫ উইকেটে হারায় জহির আব্বাসের পাকিস্তানকে। পরের ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে বাজে ভাবে হেরে যায় লঙ্কানরা। গাভাস্কারের ভারত এরপর পাকিস্তানকে হারায় ৫৪ রানে। দুই ম্যাচে দুই জয়ে ৮ পয়েন্ট নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত। ১০৭ রান করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন সুরিন্দর খান্না। ৪ উইকেট নিয়ে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি ছিলেন রবি শাস্ত্রী। টুর্নামেন্ট সেরা হয়েছিলেন সুবিন্দর।

১৯৮৬: বাংলাদেশের অনেক প্রথমের আসর

১৯৮৪ সালে এশিয়া কাপ শুরু হলেও বাংলাদেশ প্রথম অংশ নেওয়ার সুযোগ পায় ১৯৮৬ সালের আসরে। শ্রীলঙ্কার অনুষ্ঠিত এই আসরে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটিই বাংলাদেশের প্রথম স্বীকৃত ওয়ানডে ম্যাচ। গাজী আশরাফ হোসেন লিপুর নেতৃত্বে ওই টুর্নামেন্টে খেলে বাংলাদেশ।

প্রথম আসরের মতো এবারও তিনটি দল অংশ নেয়। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ভারত অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ক্রিকেটীয় সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে তৃতীয় দল হিসেবে সুযোগ মেলে বাংলাদেশের। ১৯৮৪ সালে সাউথ ইস্ট এশিয়া কাপ জিতেছিল বাংলাদেশ। সেই সুবাদেই এশিয়া কাপে কোয়ালিফাই করে তারা।

সেবার প্রতিটি দল একে অপরের ‍মুখোমুখি হয় একবার করে। এরপর টেবিলের শীর্ষ দুই দল খেলে ফাইনাল। যেখানে ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় স্বাগতিক শ্রীলঙ্কা। লিগ পর্বে পাকিস্তান দুই ম্যাচেই জিতেছিল। কিন্তু ফাইনালে দুলিপ মেন্ডিসের শ্রীলঙ্কা প্রতিশোধ নেয় লিগ পর্বে হারের।

১৯৮৬ এশিয়া কাপে টুর্নামেন্ট সেরা হয়েছিলেন অর্জুনা রানাতুঙ্গা।

বাংলাদেশ নিজেদের প্রথম ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে হারে ৭ উইকেটে। টস হেরে প্রথমে ব্যাট করে ৯৪ রান করেছিল বাংলাদেশ। জবাবে পাকিস্তান ৩ উইকেট হারিয়ে ৭৭ বল বাকি থাকতেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। ১৯ রানে ৪ উইকেটে নিয়ে ওয়াসিম আকরাম হয়েছিলেন ম্যাচসেরা। দ্বিতীয় ম্যাচে বাংলাদেশ আগে ব্যাট করে ৮ উইকেটে ১৩১ রান করে। জবাবে শ্রীলঙ্কা ৮১ বল হাতে রেখে ৭ উইকেটের জয় নিশ্চিত করে।

এশিয়া কাপে নিজেদের প্রথম আসরের স্মৃতি নিয়ে গাজী আশরাফ হোসেন লিপু এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘রোমাঞ্চ-উত্তেজনা আমাদের যথেষ্টই ছিল। তার চেয়ে বেশি ছিল ভাবনা, কীভাবে খেলব, এত বড় বড় ক্রিকেটারদের সামলাব। অবশ্যই তখন জয়ের ভাবনা ছিল না। আমাদের চাওয়া ছিল, খুব ভালো লড়াই করা।’

পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের স্মৃতি চারণ করে বলেছিলেন এক মজার ঘটনা, ‘ইমরান যখন টস করতে এলেন, বুঝে উঠতেই পারছিলাম না তিনি তৈরি কিনা। কারণ তার পরনে প্র্যাকটিসের পোশাক! আমি তো ম্যাচের পোশাকেই ছিলাম। তিনি বললেন, টস করার জন্য উইকেট পর্যন্ত এত দূর কষ্ট করে যাওয়ার দরকার নেই। এখানেই করি! মাঠের বাইরেই হয়েছিল টস।’

১৯৮৬ সালের ওই আসরে টুর্নামেন্টে সেরা হয়েছিলেন অর্জুনা রানাতুঙ্গা। ১০৫ রান করে তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। ৯ উইকেট নিয়ে আব্দুল কাদির ছিলেন বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে সফল।

১৯৮৮: প্রথমবার আয়োজক বাংলাদেশ

প্রথমবার অংশ গ্রহণের পরের বারই এশিয়া কাপের আয়োজক হওয়ার মর্যাদা পায় বাংলাদেশ। এবার ভারত ফেরায় প্রথমবার চার দল নিয়ে আয়োজিত হয় প্রতিযোগিতা। শিরোপা পায় ভারত।

এবারও রাউন্ড রবিন লিগ পদ্ধতিতে হয় আসরটি। প্রতিটি দল একে অপরের সঙ্গে তিনটি করে ম্যাচ খেলার সুযোগ পায়। লিগ পর্ব শেষে শীর্ষ দুই দল অংশ নেয় ফাইনালে। যেখানে রানাতুঙ্গার শ্রীলঙ্কাকে ৬ উইকেটে হারায় দিলীপ বেঙ্গসরকারের ভারত।

১৯৮৮ এশিয়া কাপের ট্রফি হাতে ভারত অধিনায়ক দিলীপ বেঙ্গসরকার।

লঙ্কানরা লিগ পর্বে প্রতিটি ম্যাচেই জয়ের দেখা পায়। ভারত লিগ পর্বে দুটিতে জিতে। জাভেদ মিয়াঁদাদের পাকিস্তান শুধু হারাতে পারে বাংলাদেশকেই।

বাংলাদেশের আসর শুরু হয় ভারতের বিপক্ষে ৯ উইকেটে হেরে। এরপর পাকিস্তানের কাছে হারে ১৭৩ রানের বড় ব্যবধানে। তৃতীয় ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে হারে ৯ উইকেটে।

এ আসরে টুর্নামেন্ট সেরা হয়েছিলেন নভজোৎ​ সিং সিধু। আসরে মোট রান করেন তিনি ১৭৯। ৭৬ রানের ইনিংসে ফাইনালেও তিনি ছিলেন ম্যাচসেরা। সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন পাকিস্তানের ইজাজ আহমেদ (১৯২)। আর সর্বাধিক উইকটে শিকারি ভারতের আরশাদ আইয়ুব (৯ উইকেট)।