মানসিক সংকীর্ণতা এড়ানোর নির্দেশ

কোনো মানুষ কোনো মানুষের মতো নয়। এটা সৃষ্টিকর্তা আল্লাহতায়ালার সৃষ্টির ব্যাপকতা। এ কারণেই আমরা দেখি, ব্যক্তি থেকে শুরু করে প্রতিটি পরিবারে, অঞ্চলে নানা মানসিকতার ও নানা চিন্তার মুসলিম রয়েছে। তাদের প্রত্যেকেরই নানা ধরনের দায়িত্ব ও করণীয় রয়েছে। যারা ভিন্ন ভিন্নভাবে নানা দায়িত্ব পালন করছেন, বিভিন্ন কাজ করে জীবন নির্বাহ করছেন। ‘ইমাম মালেক (রহ.) হালাল উপার্জনের ক্ষেত্রে কোনো কাজকেই হেয় করতেন না। বরং তিনি বিশ্বাস করতেন, যে যে কাজটি ভালো পারেন, তার সেই কাজটিই করা উচিত।’

পূর্ববর্তী আলেম-উলামা ও পীর-বুজুর্গদের জীবন থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। তাদের শিক্ষার অন্যতম হলো, প্রত্যেকের কাজকে সমীহ করা। সবার অবদানকে জরুরি মনে করা। অন্যের কাজকে সম্মান দেওয়া এবং এটাকে গুরুত্ববহ মনে করার ক্ষেত্রে মানুষের মানসিক সংকীর্ণতা বড় একটা ফ্যাক্টর। কারণ, আমরা কাউকে ভালো পর্যায়ে যেতে দেখলে কিংবা ভালো কোনো কাজ করতে দেখলে এখনো ইতিবাচকভাবে তার প্রশংসা করতে পারি না। এই সংকীর্ণ মানসিকতা থেকে অনতিবিলম্বে বেরিয়ে আসা দরকার।

ইসলামের নির্দেশনা হলো, কাউকে কিছু পেতে বা অর্জন করতে দেখলে মাশাআল্লাহ বলুন। মাশাআল্লাহ অর্থ হলোÑ আল্লাহর ইচ্ছাতেই সব হয়। এই জিকিরের চর্চাটি আপনার অন্তরের মধ্য থেকে হিংসার অনুভূতিকে দূর করবে। ইসলামে হিংসার কোনো স্থান নেই। তাই যে আল্লাহর নেয়ামত পায় তাকে হিংসা করবেন না। তার পেছনে না লেগে বরং যারা অনেক কম সৌভাগ্য পায়, আপনার থেকেও যারা অনগ্রসর তাদের নিয়ে ভাবুন। তাহলে আপনি আল্লাহর প্রতি অনেক বেশি কৃতজ্ঞ হয়ে উঠবেন।

যে মানুষগুলো আমাদের সাহায্য করছে, আমাদের কাজকে সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার জন্য অবদান রাখছে তাদের ধন্যবাদ দিন। আমরা অনেক সময় তাদের সহযোগিতাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেই এবং তাদের ভূমিকাকে অগ্রাহ্য করে থাকি। আমার বাসার যে ছোট সদস্যটি আমাকে এক গ্লাস পানি দিয়ে সাহায্য করল বা বাসার যে ভুয়া প্রতিদিন এসে সংসারের কাজে সাহায্য করছে বা আমাদের মাÑ যিনি আমাদের ঘরটিকে গুছিয়ে রাখছেন তাদের আমরা কয়জনই বা ধন্যবাদ দেই? আমাদের উচিত তাদের এই সুচিন্তাগুলোর জন্য ধন্যবাদ দিয়ে যাওয়া। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে মানুষটি ছোট নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা জানায় না, সে একসময় বড় বিষয়গুলোর জন্যও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভুলে যায়। আর যে তার আশপাশের সহায়ক মানুষগুলোকেই ধন্যবাদ জানাতে পারে না সে আল্লাহর প্রতিও সঠিকভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে না।’

ঘরের ভেতরের মানুষগুলোকে মূল্যায়ন করতে আমাদের ক্রমাগত যে অনীহা, একটা সময়ে তা বাইরের জগতেও প্রতিফলিত হয়। আরেকটি বিষয়ও ইদানীং দেখা যাচ্ছে তা হলো, প্রত্যেকের পছন্দনীয় কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছে। ঘুরে ফিরে তাদের কথাই যেন বলা হয়। এর বাইরে অন্যদের অবদানের কথা সহজে আলোচিত হয় না। যাদের কাজ আপনার নজরে পড়ছে শুধু তারাই কাজ করছে তা কিন্তু নয়। আরও অনেক মানুষ আছেন যারা নীরবে নিভৃতে কাজ করছেন। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় নিজের কর্মকাণ্ডগুলোকে আড়াল করে রাখতে চাইছেন। যাদের কোনো বৈষয়িক বা রাজনৈতিক অভিসন্ধি নেই। এ মানুষগুলোর অবদানও কিন্তু অনেক। ওপরে ইমাম মালেকের (রহ.) কথা বলেছি। সোনালি যুগের এই মানের সব ইমাম এবং ইসলামিক স্কলারদের কথা ভাবুন। তাদের অনেকের নাম আমরা জানি, অনেকের লেখনী ও বক্তব্য আজও এ পৃথিবীতে টিকে আছে। অথচ, সে সময়ে মানুষ যাদের নিয়ে মাতামাতি করত কিংবা তৎকালীন সময়ে কারা শাসক পর্যায়েও ছিলেন তাদের নাম নিশানা বের করতে আমাদের হয়তো ঘাম ছুটে যাবে।

ইসলামকে এগিয়ে নিতে চাইলে ইসলামিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করতে হবে। আর ইসলামিক কর্মকাণ্ডকে অগ্রসর করার জন্য প্রতিটি সেক্টরের মানুষকে সম্মান দিতে হবে। তাদের কাজগুলোকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। এ জন্য সর্বাত্মকভাবে মানসিক সংকীর্ণতা এড়িয়ে চলতে হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে মানসিক সংকীর্ণতা একটি মানবিক দুর্বলতা ও ত্রুটি। যা মানবজীবনে নানাবিধ সংকট তৈরি করে এবং সুষ্ঠু স্বাভাবিক জীবনযাপনে বাধা প্রদান করে; এমনকি মানসিক সংকীর্ণতার কারণে মানুষ সত্যের দিশা থেকেও বঞ্চিত হয়ে যায়। মহান আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। আমিন।