রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন আল আমিন। ২০২১ সালে পড়াশোনা শেষ করার পর চাকরির পেছনে ছুটছেন। শুরুর দিকে কেবল প্রথম শ্রেণির চাকরিতেই আবেদন করতেন তিনি। এরপর এখন ২য় শ্রেণির চাকরিতেও আবেদন করছেন। বেশ কয়েকটি লিখিত পরীক্ষায় বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে আল আমিন এখন ভাইভার অপেক্ষায়। একটা ভালো চাকরি হবে এই অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।
দেশ রূপান্তরের সাথে আলাপকালে আল আমিন জানান, ৬ মাস হলো তিনি মিরপুর-১০ এর একটা মেসে থাকছেন। প্রতিটা চাকরির পরীক্ষায় প্রথমে একটা নির্দিষ্ট ফি দিয়ে আবেদন করতে হয়, তারপর প্রিলিমিনারি, লিখিত পেরিয়ে ভাইভা প্রতিটি ধাপে অংশ নিতে রংপুর থেকে তাকে ঢাকা আসতে হতো। এমনও হয়েছে তাকে এক মাসে একাধিক বার ঢাকা আসতে হয়েছে। এর পেছনে বাসে আসা যাওয়ায় তার খরচ হত কমপক্ষে ১৫০০ টাকা আবার ট্রেনে আসলেও ১ হাজার টাকা, সাথে ঢাকার বাস-রিকশা ভাড়া আর থাকা খাওয়ার খরচ মিলিয়ে এ পর্যন্ত অনেক টাকা গুনতে হয়েছে। চাকরি খুঁজতে গিয়ে যে খরচ হয় তার জোগান দিতে দিতে পরিবার ক্লান্ত বলে জানান আল আমিন।
মিরপুর ১০ এর চায়ের টংয়ে কথা হয়, নীলফামারীর জাকির হুসেন নামের এক চাকরি প্রত্যাশীর সাথে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটা সরকারি চাকরির আশায় ঘুরছি। কৃষক বাবা প্রতিবার ঢাকা আসার পথে বলেন, জাকির পরিবারের হাল ধর বাপ, আমি আর পারছি না। বাবার কথা শোনার পর নিজেকে খুব অসহায় লাগে। এলাকায় ৩ টি টিউশনি করিয়ে যে টাকা পান তা দিয়ে চাকরির আবেদন, গাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ জোগাতে হয়।
কেবল আল আমিন কিংবা জাকির নয় প্রায় সব চাকরি প্রত্যাশীর গল্প একই। এ দেশের চাকরি প্রত্যাশীদের একটা বড় অংশ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তারা টিউশনি, ছোট-খাটো পার্ট টাইম চাকরি করে ডিগ্রি, স্নাতক কিংবা অন্যান্য পর্যায়ের পড়াশোনার খরচ চালিয়ে এখন চাকরির পেছনে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত। চাকরি পরীক্ষার ফি আর পরিবহন খরচ জোগানোর চিন্তায় এখন তাদের একেকটি দিন কাটে।
তবে এসব চাকরি প্রত্যাশীদের ঘাড়ে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে যুক্ত হয়েছে মূল্য সংযোজন করের (মূসক/ভ্যাট) বোঝা। এখন থেকে একেকটা চাকরির সরকার নির্ধারিত ফির পাশাপাশি অনলাইনে আবেদন চার্জ ও মূল্য মূল্য সংযোজন কর গুনতে হবে তাদের। যা তাদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
সুনামগঞ্জের ছাতক থেকে চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিতে ঢাকায় এসেছিলেন মানিক মিয়া। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেকারদের কথা কেউ চিন্তা করে না। আমরা দীর্ঘদিন ধরে চাকরির ফি কমানোর দাবি করে আসছি। এর জন্য বিভিন্ন সময় মানববন্ধন ও করেছি। কিন্ত সরকার আমাদের দাবি তো পাত্তাই দিল না উল্টো এখন করের টাকা যুক্ত করে দিয়েছে। এটা অন্যায়, বেকারদের সাথে প্রহসন।
তার কথায় যুক্তি আছে। বেকারদের কথা চিন্তা করে ২০১৬ সালে একটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তারা পরীক্ষার আবেদন ফি তুলে দিয়ে বেকারদের সমস্যা লাঘবের চেষ্টা করে। যা বেশ প্রশংসা পায়। ধারণা করা হয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও এগিয়ে আসবে। কিন্ত হল তার উল্টো।
গত ১৭ ই আগস্ট এক প্রজ্ঞাপনে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ জানায়, অনলাইনে চাকরির আবেদনের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে। এখন সব ধরনের সরকারি চাকরিতে আবেদনের ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের ব্যয় বাড়বে। এতে সরকারের আয় বাড়লেও নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের চাকরি প্রত্যাশী বেকার তরুণ-তরুণীদের দীর্ঘশ্বাস আরও বাড়াবে সে সাথে চাপ গিয়ে পড়বে তাদের পরিবারের ওপর যারা এমনিতেই জীবনযাত্রার ব্যায় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়েমা হক বিদিশা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার এই কর আরোপ করে রাজস্ব আয় করতে চাচ্ছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এটা থেকে সরকারের আয় হবে সরকারের দিক থেকে এটা একটা যুক্তি। অন্যদিকে রাজস্ব আয়ের জন্য তো বিকল্প আরও কিছু জায়গা রয়েছে সরকার সেদিকে না গিয়ে কেন এ সিদ্ধান্ত নিল সেটা একটা প্রশ্ন। সাধারণত যারা চাকরিতে আবেদন করে তারা নিম্ন ও মধ্য আয়ের। সুতরাং চাকরি প্রত্যাশীদের ওপর একটা চাপ তো তৈরি হবেই।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন ও পরীক্ষার ফি নেওয়া হবে। পরীক্ষার ফি বাবদ সংগ্রহ করা অর্থের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ কমিশন হিসেবে টেলিকম বাংলাদেশকে দিতে হবে। ভ্যাট হিসাবে আদায় করা হবে কমিশনের ১৫ শতাংশ।
গত ১৭ আগস্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের সই করা এক প্রজ্ঞাপন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, নতুন এই ফি সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দশম গ্রেডে চাকরিপ্রত্যাশীদের আবেদন ফি ৫০০ টাকা। এর সঙ্গে টেলিকম বাংলাদেশের সার্ভিস চার্জ ১০ শতাংশ বা ৫০ টাকা এই ৫০ টাকার টাকার ওপর ১৫ শতাংশ বা ৭ টাকা ৫০ পয়সা ভ্যাট যোগ হবে। ফলে এই গ্রেডে চাকরিপ্রত্যাশীদের আবেদন করতে লাগবে ৫৫৭ টাকা ৫০ পয়সা। একইভাবে অন্যান্য গ্রেডের চাকরিতেও বাড়তি টাকা গুনতে হবে।
জানা যায়, সরকারি চাকরিতে আবেদনের ক্ষেত্রে ফি ১০০-৬০০ টাকা হয়। তবে বিসিএসের আবেদন ফি ৭০০ টাকা। আবার কিছু কিছু সরকারি ও স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে রকমভেদে চাকরির আবেদন ফি বেশি হয়ে থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ও রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, আর যাইহোক এটা ভালো পদক্ষেপ নয়। সরকার হয়তোবা চিন্তাভাবনা করেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিন্ত নিঃসন্দেহে এ সিদ্ধান্ত বেকারদের ওপর চাপ বাড়াবে। আমার মনে হয় না কোনো চাকরি প্রত্যাশীর পক্ষে এ সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা সম্ভব।