৫৪ বছর আগের ফিঙ্গারপ্রিন্টে বিরোধের সমাধান

৫৪ বছর আগে বিক্রি হওয়া জমি নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে চাচা-ভাতিজা। এ নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ লেগেই থাকে। সামান্য কথা থেকে মারামারি পর্যন্ত বেধে যায়। এভাবে কৃষক পরিবার দুটি বিভিন্ন সময় মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়েও সমাধান খুঁজে পায়নি। ভাতিজার অভিযোগ জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে পিতার জমি আত্মসাৎ করেছেন চাচা। অন্যদিকে চাচা ওই জমি কিনে নেওয়ার প্রমাণ হিসেবে একটি দলিল উপস্থাপন করে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এ ঘটনায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট যাচাইয়ের মাধ্যমে তাদের সমাধান দিয়েছে।

সিআইডির মুখপাত্র অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আজাদ রহমান মামলাটি তদন্তের কথা জানিয়েছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আদালত সিআইডিকে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার পর যাবতীয় তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। তদন্তে বিবাদীর দলিল ও দলিলে থাকা ফিঙ্গারপ্রিন্ট যাচাইয়ের পর দেখা যায় জমিটি আগেই তার কাছে বিক্রি করা হয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, গাজীপুরের সদর এলাকার লাবিব উদ্দিন ও ইনাম উদ্দিন দুই ভাই। লাবিব উদ্দিনের মৃত্যুর পর তার ছেলে ছেলে মো. নজরুল ইসলাম (৫০) অভিযোগ করেন তার বাবার পৈতৃক সম্পত্তি হিসাবে পাওয়া ৯ শতাংশ জমি তার চাচা ইনাম উদ্দিন হস্তান্তর করেনি। লাবিব উদ্দিনের মৃত্যুর পর ইনাম উদ্দিন অন্য লোককে লাবিব উদ্দিন সাজিয়ে নিজে দলিল গ্রহীতা হিসাবে একটি দলিল তৈরি করে ওই ৯ শতাংশ জমি আত্মসাৎ করে।

নজরুল ইসলাম এই অভিযোগ নিয়ে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা করেন। মামলায় তার চাচা ইনাম উদ্দিন চাচাতো ভাই মো. জহিরুল ইসলাম ছাড়াও মো. আবু বকর (৪৫) নামে এক ব্যক্তিকে আসামি করেন।

মামলাটি আদালত সিআইডিকে তদন্তে দায়িত্ব দেওয়ার পর বাদীর পিতা লাবিব উদ্দিনের টিপসই পরীক্ষার জন্য আদালতে প্রেরণ করে। পরবর্তীতে ওই দলিল ও টিপসই পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক শাখায় পাঠায়। সিআইডির হস্তরেখা বিশেষজ্ঞ পরীক্ষা করে দেখতে পায় আলোচিত ৯ শতাংশ জমির দাতা হিসাবে দেওয়া আঙুলের ছাপ বাদীর পিতা লাবিব উদ্দিনেরই।

সিআইডির তদন্তে আরও জানা যায়, লাবিব উদ্দিন সাংসারিক প্রয়োজনে নগদ টাকার প্রয়োজন হওয়ায় তিনি ওই জমিটি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর সাব রেজিস্ট্রি অফিসে স্ব-শরীরে উপস্থিত হয়ে বাদীপক্ষের সকলের জ্ঞাতসারে জমি বিক্রি করে বিবাদী পক্ষের নিকট জমির মালিকানা ও দখল বুঝিয়ে দিয়েছিল। তৎকালীন সময়ে জমির বাজার মূল্য কমছিল বর্তমানে জমির বাজার মূল্য বহু গুনে বেড়েছে। ফলে স্থানীয় কিছু ব্যক্তির কুপরামর্শে এবং বাদী পক্ষ কৌশল অবলম্বন করে বিবাদী পক্ষের জমির বৈধ মালিকানা থাকা সত্ত্বেও তাদের বিভিন্নভাবে অযথা হয়রানি করতে এই মামলা করে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই হারুনুর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১৯৬৯ সালে বাদীর বাবা এই জমি তার আর্থিক প্রয়োজনে চাচার কাছে বিক্রি করেন। ২০২০ সালে তিনি মারা যাওয়ার পর তার দখলে থাকা ওই জমিটির দলিল দেখিয়ে মালিকানা দাবি করেন বিবাদী। নয় শতাংশের ওই জায়গাটির বর্তমান দাম প্রায় ২৭ লাখ টাকা। ওই এলাকায় ক্রমশ জমির দাম বাড়তে থাকায় বাদী পক্ষ ছাড়তে নারাজ ছিল। ফলে তাদের মধ্যে বিবাদ থেকে একাধিক মামলাও হয়।

বাদী মো. নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সিআইডির করা এই তদন্ত সঠিকভাবে হয়নি। জায়গাটি প্রকৃতপক্ষে আমাদেরই। এই মামলার তদন্ত আবার করার জন্য আদালতে নারাজি দেব।

তিনি বলেন, বাবা বেঁচে থাকার সময়ে এই জমি বিক্রি করেছে এমন কোনো কথা আমাদের বলেনি। এই জায়গা আমার দীর্ঘদিন ধরে ভোগ করে আসছি। কিন্তু চাচা প্রভাব খাটিয়ে আমাদের এই জমি নেওয়ার জন্য ভুয়া দলিল দেখাচ্ছেন। এখন এই ঘটনায় মামলা দেওয়ার পরও সে নানাভাবে রায় তার পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে।