গ্যাসে বাড়তি খরচ ১৫০ কোটি

বেসরকারি খাতের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১১৪০ টাকা ঠিক করে দিয়েছে সরকার। কিন্তু বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৩০০ থেকে ১৪০০ টাকায়। ফলে সারা দেশে এলপি গ্যাস ব্যবহারকারীদের মাসে ১৩০ থেকে ১৫০ কোটি টাকা বাড়তি ব্যয় হচ্ছে।

গ্রাহকের পকেট কেটে এ টাকা নিচ্ছে অপারেটর, খুচরা বিক্রেতা সবাই। এর প্রায় ১০০ কোটি টাকা যাচ্ছে অল্পসংখ্যক অপারেটরের হাতে। বাকি টাকা নিচ্ছে ডিস্ট্রিবিউটর ও খুচরা বিক্রেতারা।

অপারেটর, ডিস্ট্রিবিউটর ও খুচরা বিক্রেতারা বাড়তি টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছে এবং একে অন্যের ঘাড়ে দায় চাপাচ্ছে। আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়ার হুঙ্কার দিয়ে প্রতি মাসে নিয়মরক্ষার দর ঘোষণা করে যাচ্ছে। অন্য কারও ক্ষতি না হলেও মাস শেষে বাড়তি দামে এলপিজি কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন ভোক্তারা। বাংলাদেশে বছরে গড়ে ১২ লাখ টন এলপি গ্যাস বিক্রি হয়।

যেসব প্রতিষ্ঠান এলপিজি বোতলজাত করে বিক্রি করে তাদের বলা হয় অপারেটর। বর্তমানে অপারেটর হিসেবে ২৮টি কোম্পানি রয়েছে। পরের ধাপে রয়েছে ডিস্ট্রিবিউটর, যারা অপারেটরদের কারখানা থেকে এলপিজি কিনে বিক্রি করে খুচরা বিক্রেতার কাছে। খুচরা বিক্রেতারা সাধারণ ব্যবহারকারী তথা ভোক্তার কাছে বিক্রি করে এলপিজি।

গত মাসে ভোক্তা পর্যায়ে ১২ কেজি এলপিজির দাম ছিল ৯৯৯ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিল রেখে চলতি মাসে ১২ কেজির দাম ১১৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই হারে অন্যান্য ওজনের এলপিজির দামও বাড়িয়েছে কমিশন। মূল্যবৃদ্ধির পরও নির্ধারিত দামে বাজারে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না।

দেশ রূপান্তরের হাতে ওমেরার একটি কর চালানপত্র এসেছে। তাতে দেখা যায়, গত ২২ আগস্ট এক ডিস্ট্রিবিউটরের কাছে বিক্রি করা ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম উল্লেখ করা হয়েছে ১১৮০ টাকা, অথচ এ মাসের জন্য কমিশন নির্ধারিত দর (পাইকারি) ১০৪৫ টাকা। সিলিন্ডারপ্রতি ১৩৫ টাকা বেশি নিয়েছে অপারেটর প্রতিষ্ঠানটি। একইভাবে ইউনাইটেড এলপিজি লিমিটেড, টোটাল গ্যাস প্রভৃতি অপারেটরের বিরুদ্ধে বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এবং ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের অন্যতম পরিচালক আজম জে চৌধুরী বাড়তি দাম নেওয়ার কথা অস্বীকার করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করা অন্যায়। কমিশন প্রতি মাসে যে দাম নির্ধারণ করে দেয়, সে দামেই অপারেটররা এলপিজি বিক্রি করে। বেশি দাম নেওয়ার সুযোগ নেই। এরপরও কোনো অপারেটর বেশি দাম নিলে সে দায় তার। মূলত ডিস্ট্রিবিউটররা ও খুচরা বিক্রেতারা ভোক্তার কাছ থেকে বাড়তি দাম নিয়ে থাকে।’

তিনি বলেন, ‘ডলার সংকটের কারণে অপারেটররা চাহিদামতো এলসি খুলতে না পারায় এলপিজি আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। আগে কোনো অপারেটর মাসে তিন-চারটি চালান আনতে পারলে এখন আনতে পারছে দুটি চালান। এলসি-জটিলতার কারণে চাহিদামতো এলপিজি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এ সুযোগে অনেকে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে ডিস্ট্রিবিউটররা ও খুচরা বিক্রেতারা ক্রাইসিসের সময় ইচ্ছেমতো দাম বাড়ায়। সরবরাহ কম থাকলে দাম এমনিতেই কিছু বাড়ে। তবে অন্যান্য পণ্যের দাম যেভাবে অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে, সেভাবে এলপিজির দাম বাড়ছে না।’

কমিশন ডিস্ট্রিবিউটর থেকে খুচরা বিক্রেতার কাছে এলপিজি বিক্রির দাম ১০৯৫ টাকা ঠিক করে দিলেও বিক্রি করা হচ্ছে ১২৩০ থেকে ১২৪০ টাকায়। আর খুচরা দর ১১৪০ টাকা হলেও বিক্রেতারা বিক্রি করছেন ১৩০০ থেকে ১৪০০ টাকায়।

বাংলাদেশ এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির অর্থ সম্পাদক তাহের এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আবু তাহের কোরাইশী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চলতি মাসে কমিশন দাম নির্ধারণ করার পরও অপারেটররা দুই দফায় এলপিজির দাম বাড়িয়েছে। কমিশন খুচরা যে দর নির্ধারণ করে দিয়েছে তার চেয়ে বেশি দামে আমাদের কিনতে হচ্ছে। এভাবেই চলছে। আমরা বিভিন্ন সময়ে কমিশনকে অভিযোগ জানিয়েও প্রতিকার পাইনি।’

মিরপুর-১ নম্বর এলাকার বাসিন্দা শাহ আলম বাবুল জানান, চলতি মাসে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে তাকে গুনতে হয়েছে ১৪০০ টাকা।

মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকার বাসিন্দা মাহফুজুর রহমান জানান, গত ১১ আগস্ট ১৩০০ টাকা দিয়ে ১২ কেজির এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার কিনেছেন তিনি।

বিইআরসি চেয়ারম্যান মো. নূরুল আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক দরের সঙ্গে অপারেটর, ডিস্ট্রিবিউটর ও খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফা যোগ করেই প্রতি মাসে খুচরা দর নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম রাখা আইনত অপরাধ। আমরা মনিটরিং করছি। অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

উচ্চ আদালতের নির্দেশে ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। এলপিজি তৈরির মূল উপাদান প্রোপেন ও বিউটেন আমদানি করা হয়। প্রতি মাসে এলপিজির এ দুই উপাদানের মূল্য প্রকাশ করে সৌদি প্রতিষ্ঠান আরামকো। এ মূল্য বিবেচনায় নিয়ে দেশে এলপিজির দাম সমন্বয় করে বিইআরসি। যদিও কমিশন নির্ধারিত দামে বাজারে এলপিজি মিলে না। দাম বৃদ্ধি-হ্রাস যাই হোক না কেন, বিক্রেতারা ইচ্ছেমতো দাম রাখেন ক্রেতার কাছ থেকে। দীর্ঘদিন ধরে আবাসিকে প্রাকৃতিক গ্যাস-সংযোগ বন্ধ থাকায় রাজধানীর পাশাপাশি বিভিন্ন শহর ও গ্রামে বিপুলসংখ্যক মানুষ এলপিজির ওপর নির্ভরশীল।