ওদের আন্দোলন শতভাগ যৌক্তিক

সাত কলেজের ছাত্রদের বিষয়ে খুব ইন্টারেস্টেড কারা, কেন? কী এমন বিষয় রয়েছে সেখানে যে বাড়তি এই চাপ আমাকেই নিতে হবে? আসলে সাত কলেজ বিষয়ে, রাজনৈতিক একটি বিষয় রয়েছে। এখানে অর্থের সংযোগ রয়েছে। সেই অর্থের পরিমাণটা কিন্তু মোটেও কম না। ফলে এদের নিয়ে একটা আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আসলে প্রশাসনিকভাবে, আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। কারণ আমাদের যে সামর্থ্য, সেই সামর্থ্য কি আমরা যাচাই করেছি? না করার ফলেই এই সমস্যার উদ্ভব হয়েছে। যে উপায়ে সাত কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়েছে, তা কি সঠিক ছিল? ১৯৭৩ সালের যে প্রশাসনিক আইন রয়েছে, তার সঙ্গে কি বিষয়টি সংগতিপূর্ণ? এটা একেবারেই সাংঘর্ষিক একটা বিষয়। ওপর থেকে চাপিয়ে দিয়ে একটা নিয়ম চালু করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় যদি কিছু মনে করে, তাহলে সেটি আলোচনা হবে। তারপর এটা সিন্ডিকেটে যাবে। কিন্তু তা তো হয়নি। এই নিয়ম চালু হয়েছে, ওপর থেকে নিচে। কিন্তু নিয়ম হচ্ছে, নিচ থেকে ওপরে যাওয়ার। তা কি হয়েছে! হয়নি বলেই এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। ভাবা দরকার ছিল, আমাদের প্রশাসনিক সামর্থ্য কতটুকু? আদৌ এটা আমরা পারব কি না? বিষয়টি যাচাই করা দরকার ছিল। এমনিতেই আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের রেজাল্টই তো সময়মতো দিতে পারছি না। তার ওপর আবার এটা! কেন? কলেজগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্যই তো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় করা হলো। না হলে, এই বিশ্ববিদ্যালয় করার মানে কি? এটা কেন করা হলো? এর উদ্দেশ্যই ছিল, যে সমস্যাগুলো এখন দেখা দিয়েছে, সেখান থেকে বের হয়ে আসা। এই কলেজগুলো অধিভুক্ত থাকার কারণেই কিন্তু আমরা ঠিকমতো, রেজাল্ট পাবলিশ করতে পারছিলাম না। এই কারণেই তো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করা হলো। এখন কোন প্রেক্ষাপটে, কী ধরনের বাস্তবতায় এটা করা হলো, তা বোধগম্য না। আমরা কেন যে সাত কলেজের দায়িত্ব্ নিলাম, তা কিছুতেই বুঝতে পারছি না। এখন এটাই বড় প্রশ্ন, তাহলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় করা হলো কেন? যদি মানের প্রশ্ন ওঠে, তাহলে তো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব এটার মান কীভাবে নির্ধারণ করা যায়, আরও উন্নত করা যায়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যদি মনে করে, এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাভুক্ত থাকলে ভালো, তাহলে তো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ই অকার্যকর হয়ে যায়।

১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ, যেটা বঙ্গবন্ধু করেছিলেন, সেটাই তো আমরা মানছি না। মানলে, এই সমস্যা দেখা দিত না। এই ধরনের একটা সিদ্ধান্ত একটা একাডেমিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সম্পন্ন করতে হয়। অথচ তা করা হয়নি। কেউ একজন বললেই তো আর এটা করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, এটা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় না। ৪টা বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু আলাদা। ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু একেবারেই আলাদা। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এই চারটিকে মেলানো যাবে না। মৌলিকভাবেই এদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

আমরা পরিচালিত হব, বঙ্গবন্ধুর তৈরি আইন দিয়ে। যা ১৯৭৩ সালে হয়েছিল। সেই পাকিস্তানি খপ্পর থেকে বের করার জন্যই তো এই আইন করা হয়েছে। দেশে আইয়ুব খান বিরোধী যে আন্দোলন গড়ে উঠল, সেই আন্দোলনের ফসলই কিন্তু ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ। সবকিছু মাথায় রেখেই এটি করা হয়েছিল। এখন এইরকম পরিস্থিতি তৈরি করার পেছনে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বিষয় রয়েছে। এটি উপলব্ধি করতে হবে। এখানে কিন্তু বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অতিরিক্ত বোঝা হয়ে যাচ্ছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে হলো ৪০০ খাতা আর এই সাত কলেজে ১২০০ খাতা। আমি বুঝি না, যেখানে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কাজই ঠিকমতো করতে পারছি না, সেখানে  আবার এই সাত কলেজের দায়িত্ব কেন নিচ্ছি, তা আমার মাথায় আসে না। সেমিস্টার সিস্টেমে আসার পরে, আমাদের অনেক কিছু করতে হয়। এখন অ্যাসাইনমেন্ট নিতে হয়, প্রেজেনটেশন নিতে হয়, মিডটার্ম পরীক্ষা নিতে হয় এগুলো তো ভাবতে হবে। সবকিছু মিলিয়ে ৩-৪ মাসের মধ্যে আমাদের পরীক্ষা নিতে হয়। এই চাপের মধ্যে আমি আবার কলেজের দায়িত্ব নিচ্ছি। কেন?

এর পেছনে দৃশ্যমান আসল কারণ হচ্ছে, আমি টাকা পাচ্ছি। আমার কথা হচ্ছে আমি যাই করি, সেটা তো ভেবেচিন্তে করতে হবে নাকি? এখন ওপর থেকে চাপিয়ে দিলে কিছু হবে না। বাস্তবতা তো আমরাই ভালো জানি। ওপর থেকে চাপিয়ে দিলে, সমস্যা দেখা দেবেই। এখন যা হচ্ছে। সবাই কিন্তু এ ব্যাপারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ থেকে উত্তরণের একটাই পথ কলেজগুলোকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দিয়ে দেওয়া। অথবা যদি রাখতেই হয়, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের জন্য আলাদা প্রশাসনিক বিভাগ গড়ে তোলা।

যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন, সেই তারাই আবার সাত কলেজের দায়িত্ব পালন করছেন। এমনও হয়, আমাদের যে হল সাত কলেজের প্রশ্নপত্র চলে আসার কারণে, সেখানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র রাখারই জায়গা পাই না। আমি এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছি, তার ওপর আবার সাত কলেজের দায়িত্ব নিচ্ছি। এটা কেন? এই ‘কেন’র বিষয়ে কোনো উত্তর নেই।

আমি যদি সারা দিন খাতা দেখি, পরীক্ষা নিই তাহলে কখন রিসার্চ করব? অন্যান্য কাজেরই বা কী হবে! ফলে স্বাভাবিকভাবেই সাত কলেজের ছেলেমেয়েরা বিভিন্নভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। যে কারণে ওদের আন্দোলন করতে হচ্ছে। আমি মনে করি, ছাত্ররা যে বিষয়ে মুভমেন্ট করছে তা অত্যন্ত যৌক্তিক। এখন এই সমস্যার তো একটা সমাধানে যেতে হবে। এভাবে চলতে পারে না। সাত কলেজের ছাত্রদের বিষয়টিও ভাবতে হবে। এখন সাত কলেজকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্ত করা ছাড়া, এই সমস্যার সমাধান কীভাবে আসবে আমি জানি না। এত সমস্যা থাকার পরও, সাত কলেজকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার নেপথ্য কারণটা কী? এটার স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা জানি না। এটি করার আগে কোনো ধরনের আলোচনা হয়নি। সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়ে করা হলে, আজকের জটিলতা দেখা দিত না। আমি জোর দিয়েই বলব, ছাত্রদের এই আন্দোলন শতভাগ যৌক্তিক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে, নতুন করে ভাবতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক কিছুরই পরিবর্তন দরকার। সময় বদলেছে, সমস্যার নতুন ধরনের সঙ্গে আমাদের খাপ খাইয়ে চলতে হবে। কোনোভাবেই যেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সর্বাগ্রে তাদের স্বার্থ দেখতে হবে। এখন ১৯৭৩ সালের হিসাব করলে তো হবে না। ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে, প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি। যে যখন ভিসি হন, তিনি মনে করেন তিনিই সঠিক। একদম বিভাগের চেয়ারম্যান পর্যন্ত। তারা কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করেন না। যার যেমন ক্ষমতা, তেমন প্রয়োগ করেন। নিজের মতো করে, প্রশাসনিক কার্যক্রম চালিয়ে যান। এর ফলেই এরকম সমস্যার সৃষ্টি হয়। আসলে আমাদের একটা অধ্যাদেশ রয়েছে, সেটা তো মেনে চলতে হবে নাকি? যখন কোনো সভায় আমরা বলি, এটা তো আমাদের নিয়মের মধ্যে নেই তখন তারা বলেন, এটা আমাদের প্র্যাকটিসের মধ্যে আছে! এইভাবে আইন বহির্ভূত অনেক কাজই হয়েছে। তার একটি হলো, সাত কলেজ নিয়ে বর্তমান জটিলতা।

আমি মনে করি, ছাত্ররা যে বিষয়ে আন্দোলন করছে তা একেবারেই যৌক্তিক। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যদি শিক্ষার্থীদের আকাক্সক্ষা পূরণ করতে না পারে, সেটা আমাদেরই ব্যর্থতা। সমস্ত শিক্ষকের ব্যর্থতা। সেই ব্যর্থতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এর জন্য করতে হবে গণতান্ত্রিক আচরণ। আমাদের আরও সহিষ্ণু হতে হবে। ছাত্রদের সম্যস্যাকে নিজের বলে ভাবতে হবে। যদি আমার মানসিকতাকে এই ধরনের বোধ দিয়ে জাগিয়ে রাখতে পারি, তাহলে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। আসলে দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সামষ্টিকভাবে সমস্যাকে চিহ্নিত করতে পারলে, কোনো অসুবিধা থাকার কথা নয়। শিক্ষার্থীর বাইরে অন্য কোনো চিন্তা যেন আমাদের মাথায় কাজ না করে। যদি তাই হতো, তাহলে কোনো সমস্যার সৃষ্টি হতো না। আমি মনে করি, সব পক্ষকে বসে সমস্যার সমাধান করা উচিত। বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা ঠিক হবে না।

লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়