জি-২০ সম্মেলনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নয়াদিল্লি যাচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে, দেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে হয়তো এটাই হতে পারে শেখ হাসিনার শেষ সফর। বরাবরই বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের আগ্রহ থাকে।
কিন্তু এবার বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচন নিয়ে পশ্চিম দুনিয়া অনেক বেশি সোচ্চার। তাই বিভিন্ন মহলের আলোচনা সমালোচনার মধ্যে জি-২০ সম্মেলনে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর একান্ত বৈঠক গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি। ধারণা করা হচ্ছে এবারের বৈঠকে আসন্ন নির্বাচন এবং রাজনীতি এবং দুই দেশের সংশ্লিষ্ট বিষয় গুরুত্ব পাবে।
এর বাইরেও এই সফরটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সফরে দুই দেশের চলমান বিভিন্ন প্রকল্প ও অভিন্ন বিষয়গুলো আলোচনায় প্রাধান্য পাবে। সাধারণত ঢাকা- দিল্লির মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সফর মানেই কোন না কোন অর্জন আসবেই। এবারও তার ব্যত্যয় হবে না।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের সময় আগামী ৯ সেপ্টেম্বর উদ্বোধন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের রেল যোগাযোগের আরও একটি নতুন পথের। আখাউড়া- আগরতলা ডুয়েলগেজ রেলপথের উদ্বোধনকে ঘিরে চলছে শেষ মুহূর্তের কাজ। ওইদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এই রেলপথটির উদ্বোধনের কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, রেলপথটি চালু হওয়ার পর চট্টগ্রাম বন্দরসহ ঢাকা কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) থেকে সরাসরি পণ্য নিয়মিত কনটেইনারবাহী ট্রেন আগরতলা হয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চল সেভেন সিস্টারে যাবে। তবে যাত্রীবাহী ট্রেন আরও পরে চলবে।
জানা গেছে, এই লাইনটির কাজ শেষ হওয়ার পর গত কয়েকদিন ধরেই আখাউড়া-আগরতলা রেলরুটে ট্র্যাক কার চালানো হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের সবুজ সংকেত বলছে, বাংলাদেশ অংশের পুরোটাতেই সফলভাবে ট্র্যাক কার চালানো হয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের (পূর্ব) প্রধান প্রকৌশলী ও আখাউড়া -আগরতলা রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক আবু জাফর মিঞা বলেন, সীমান্ত পর্যন্ত আখাউড়া -আগরতলা ডুয়েলগেজ রেললাইনের কাজ শেষ । এখন উদ্বোধনের দিনক্ষণ গুনছি। এরমধ্যে ফিটিংস এর কাজ শেষ হয়েছে। এখন বেলাস্টিং চলছে এবং পেকিং দেওয়া হচ্ছে যাতে লেভেল ঠিক থাকে। আর ট্রায়াল চলবে একদিন। জাফর মিঞা বলেন, ' ইমিগ্রেশন ভবনের কিছু কাজ বাকি আছে। যা ৯ সেপ্টেম্বরের আগে শেষ হবে।'
প্রকল্প পরিচালক জানান, মালবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হবে প্রথমে। এ পর্যায়ে শুরুতে চট্রগ্রাম বন্দর থেকে পণ্যবাহী ট্রেন নিয়মিতভাবে ভারতের সেভেন সিস্টারে যাবে। পর্যায়ক্রমে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল শুরু কলবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্প পরিচালক আবু জাফরের নেতৃত্বে গত ২২ আগস্ট দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল গ্যাংকারযোগে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। আখাউড়ার শিবনগর এলাকায় ত্রিপুরা সীমান্তের জিরো লাইনে পৌঁছায় গ্যাংকারে।
প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, আখাউড়া থেকে ভারতের ত্রিপুরার নিশ্চিন্তপুর পর্যন্ত রেলপথের দৈর্ঘ্য সাড়ে দশ কিলোমিটার। এরমধ্যে বাংলাদেশে সাড়ে ছয় কিলোমিটার ও বাকি চার কিলোমিটার আগরতলা অংশে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই রেলপথ যেমন যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটা মাইলফলক তেমনি দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে। এই পথ চালু হলে আখাউড়া থেকে আগরতলা হয়ে কলকাতা পর্যন্ত পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করতে পারবে। এ ছাড়া এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর- পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে রেল যোগাযোগ স্থাপন হবে। কেননা এই রেলপথ স্থাপনের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরাকে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
তাই আশা করা যাচ্ছে এতে দুই দেশের মধ্যে কানেক্টিভিটি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার হবে। আবার এই রেলপথের উদ্বোধনে উচ্ছ্বসিত ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যবাসীরা।
জানা গেছে, এই প্রকল্পের ফলে আখাউড়া-ঢাকা হয়ে আগরতলা এবং কলকাতার মধ্যে ভ্রমণের সময় ও দূরত্ব কমিয়ে দেবে। প্রকল্প চালু হলে ৩১ ঘণ্টার পরিবর্তে সময় লাগবে ১০ ঘণ্টা। কলকাতা -আগরতলার দূরত্ব ১ হাজার ৬৫০ কিলোমিটার থেকে কমে দাঁড়াবে ৫১৩ কিলোমিটার।
প্রকল্প: ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় এই রেলপথ নির্মাণের বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়। আখাউড়া থেকে আগরতলার নিশ্চিতপুর এই ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণের জন্য ২০১৮ সালের ২১ মে ভারতের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টেঙমেকো রেল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি হয়। একই বছরের ২৯ জুলাই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। এর দৈর্ঘ্য ১২ দশমিক ২৪ কিলোমিটার।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৭৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা । এর মধ্যে সরকারি অর্থায়নে ৫৭ কোটি ৫ লাখ টাকা এবং ভারতীয় ঋণ ৪২০ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।
এ বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি গণ ভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় খাতরা। তিনি সাক্ষাতে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের ১৮তম আসরে যোগ দিতে শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানান। শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণ গ্রহন করেন এবং আমন্ত্রণের জন্য ধন্যবাদ জানান।